ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ: চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় মোজতবা খামেনি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬
  • ৪৩ বার
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ: চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় মোজতবা খামেনি

প্রকাশ: ২০ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি আবারও এক ভয়াবহ অস্থিরতার আবর্তে পড়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হয়েছে। গত নয় দিন ধরে চলমান এই সংঘাত এক চরম অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে। একদিকে ইরানের সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের অবিরাম বিমান হামলা, অন্যদিকে পাল্টা জবাব হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ইরানের মুহুর্মুহু আঘাত—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই সংকটময় মুহূর্তে দাঁড়িয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, যুদ্ধের চূড়ান্ত পথ বেছে নেওয়া কিংবা ফের সংলাপে ফিরে আসার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের একচ্ছত্র ক্ষমতা শুধুমাত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির।

ইরানি সংবাদমাধ্যম তেহরান টাইমসের সাথে এক সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরেন। তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থা ‘সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল’-এর দীর্ঘ ছয় ঘণ্টার বৈঠকে ইসলামাবাদ সমঝোতা চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আরাগচির ভাষ্যমতে, ইরান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পূর্ণ মাত্রায় যুদ্ধ ঘোষণা করেনি। বর্তমানে ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনী যে পাল্টা আক্রমণ চালাচ্ছে, তা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের উসকানিমূলক হামলার একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া মাত্র। তবে বৃহত্তর যুদ্ধের পথে ইরান পা বাড়াবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাবিকাঠি এখন সর্বোচ্চ নেতার হাতে। মোজতবা খামেনি এখনো এই বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেননি, যার ফলে পুরো দেশ এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সময় পার করছে।

এই নতুন দফার উত্তেজনার প্রেক্ষাপটটি অত্যন্ত জটিল। চলতি বছরের শুরুতে ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া দীর্ঘ ৪০ দিনের সংঘাতের পর ৭ এপ্রিল যে যুদ্ধবিরতি এসেছিল, তা বিশ্ববাসীকে কিছুটা আশ্বস্ত করেছিল। পরবর্তীতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ১৭ জুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ১৪টি শর্ত সম্বলিত সেই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য ছিল হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিনিময়ে ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা। কিন্তু ৫ জুলাই হরমুজ প্রণালিতে আমিরাতের দুটি ট্যাংকারে আইআরজিসির ড্রোন হামলার মধ্য দিয়ে সেই চুক্তির ভিত্তি ভেঙে পড়ে। এরপরই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং ৭ জুলাই থেকে মার্কিন সেন্টকম ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় টানা বোমা বর্ষণ শুরু করে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কঠোর প্রতিক্রিয়াও এই সংঘাতকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ১৩ জুলাই মার্কিন প্রশাসন ইরানের বন্দরগুলোতে পুনরায় অবরোধ জারির ঘোষণা দিলে তেহরানের নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে সমঝোতা চুক্তির বিষয়ে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়। বিশেষ করে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজিম ঘরিবাবাদি গত সপ্তাহে যে ধরনের কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তা মূলত শনিবারের নিরাপত্তা বৈঠকের মাধ্যমেই চূড়ান্ত রূপ পায়। বর্তমানে ইরানের সামরিক নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক মহল চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি জানিয়েছেন, সর্বোচ্চ নেতার সাথে দেখা করার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত এবং হাতেগোনা কয়েকজন কর্মকর্তা ছাড়া কারো পক্ষেই তার সাথে সরাসরি যোগাযোগ করা সম্ভব নয়। ফলে পুরো জাতি এখন তাকিয়ে আছে আয়তুল্লাহ মোজতবা খামেনির পরবর্তী বার্তার দিকে।

যুদ্ধ কিংবা শান্তির এই দোলাচল কেবল ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়, বরং গোটা বিশ্বের অর্থনীতির জন্য এক বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন যুদ্ধবিমানের গর্জনে মুখর। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও সরবরাহ নিয়ে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা বিশ্বের প্রতিটি দেশের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। সাধারণ মানুষের জীবনে যুদ্ধের পদধ্বনি সবসময়ই ধ্বংস ও আতঙ্কের বার্তা নিয়ে আসে। যারা যুদ্ধের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করছেন, তারা প্রতিটি মুহূর্ত পার করছেন চরম উদ্বেগের মধ্যে। সাধারণ ইরানের মানুষের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—তাদের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাচ্ছে? তারা কি আবার কোনো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কবলে পড়তে যাচ্ছে, নাকি কূটনীতির কোনো শেষ সুযোগ এখনো অবশিষ্ট আছে?

ইসলামাবাদ সমঝোতা চুক্তিটি যদি সত্যিই স্থায়ীভাবে অকার্যকর হয়ে পড়ে, তবে তা এই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার পথ প্রশস্ত করবে। একদিকে সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের মরিয়া চেষ্টা, অন্যদিকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই—এই দ্বৈরথে সংঘাতের আগুন কতটা ছড়িয়ে পড়বে, তা কেউ জানে না। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য পরোক্ষভাবে এটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইরানের নীতি-নির্ধারকরা একটি চূড়ান্ত পরিণতির জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছেন। তবে আয়তুল্লাহ মোজতবা খামেনি যদি কোনোভাবে আলোচনার দুয়ার খুলে দেন, তবেই হয়তো এই ধ্বংসলীলা থামানো সম্ভব। ইতিহাসে দেখা গেছে, যুদ্ধের চেয়ে শান্তির আলোচনার পথ সবসময়ই দীর্ঘ এবং কঠিন, কিন্তু সেই কঠিন পথই সভ্যতাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে।

পরিশেষে, বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্বনেতাদের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। যুদ্ধ কোনো সমস্যার সমাধান হতে পারে না, এটি কেবলমাত্র আরও বড় সংকটের জন্ম দেয়। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সিদ্ধান্ত কেবল তার দেশের ভাগ্যই নির্ধারণ করবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে তেহরানের দিকে, যেখানে একটি সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য প্রাণ। যুদ্ধের দামামা স্তব্ধ হয়ে শান্তির বার্তা আসবে কি না, তা এখন শুধুই সময়ের অপেক্ষা। এই সংঘাত যেন মানবিক বিপর্যয় না ডেকে আনে, সেটাই এখন বিশ্ব নাগরিক সমাজের একমাত্র কামনা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত