প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব চলচ্চিত্রের আঙিনায় বর্তমানে ফুটবল নিয়ে তৈরি সিনেমাগুলোর জয়জয়কার চলছে। একদিকে মাঠের লড়াইয়ে মেতে আছেন খেলোয়াড়রা, অন্যদিকে প্রেক্ষাগৃহে দর্শকদের আনন্দ দিচ্ছে মার্শাল আর্ট আর ফুটবলের রোমাঞ্চকর সংমিশ্রণে নির্মিত সিনেমা ‘কুংফু সকার’। কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা স্টিফেন চৌ পরিচালিত এই সিনেমাটি মুক্তির মাত্র ৯ দিনের মাথায় বক্স অফিসে যে বিস্ময়কর সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছে, তা সিনেমা সংশ্লিষ্টদেরও অবাক করেছে। এখন পর্যন্ত ছবিটি প্রায় ২১ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা আয় করেছে। এই আকাশচুম্বী সাফল্য কেবল একটি বাণিজ্যিক অর্জন নয়, বরং বিশ্বজুড়ে ফুটবল মৌসুমের আবহে এটি এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
সাধারণত চীনের মতো বিশাল বাজারে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাগুলোর আয়ের গতি দ্বিতীয় সপ্তাহে এসে কিছুটা মন্থর হয়ে যায়। কিন্তু স্টিফেন চৌয়ের এই ম্যাজিক সিনেমার ক্ষেত্রে দেখা গেছে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। প্রথম সপ্তাহের সাফল্যের রেশ কাটতে না কাটতেই দ্বিতীয় সপ্তাহে এটি দর্শকদের মধ্যে আরও বেশি উন্মাদনা ছড়িয়েছে। বক্স অফিস বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান আর্টিজান গেটওয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রথম সাত দিনে ১০০ কোটি ইউয়ানের মাইলফলক স্পর্শ করার পর দ্বিতীয় সপ্তাহেও আয়ের ধারা একই রকম শক্তিশালী রয়েছে। সিনেমার এই অনবদ্য জনপ্রিয়তার কারণে চীনের অন্যতম প্রধান টিকিটিং প্ল্যাটফর্ম মাওইয়া ছবিটির মোট আয়ের পূর্বাভাস ২৫০ কোটি ইউয়ান থেকে বাড়িয়ে ৩০০ কোটি ইউয়ানে উন্নীত করেছে, যা প্রায় ৪৪ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলারের সমান। স্টিফেন চৌয়ের আগের কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘দ্য মারমেইড’-এর রেকর্ড স্পর্শ করা কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হলেও, যেভাবে দর্শক হলমুখী হচ্ছেন তাতে নতুন ইতিহাস রচনার প্রবল সম্ভাবনা দেখছেন বিশ্লেষকরা।
সিনেমাটির সাফল্যের পেছনে রয়েছে প্রায় ২৫ বছরের এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার ইতিহাস। স্টিফেন চৌয়ের ১৯৯০-এর দশকের কালজয়ী ‘শাওলিন সকার’-এর নতুন অধ্যায় হিসেবে ‘কুংফু সকার’ দর্শকদের উপহার দিয়েছেন তিনি। ৬৪ বছর বয়সী এই নির্মাতার দীর্ঘ বিরতির পর এমন প্রাণবন্ত প্রত্যাবর্তন চলচ্চিত্র প্রেমীদের দারুণভাবে আপ্লুত করেছে। এই সিনেমার গল্পের মূল কাঠামো গড়ে উঠেছে একদল অবহেলিত ও প্রান্তিক নারী ফুটবলারকে ঘিরে। মার্শাল আর্টের জাদুকরী কৌশল ব্যবহার করে ‘সুপ্রিম ইনভিন্সিবল কাপ’ নামক একটি টুর্নামেন্টে তাদের অংশগ্রহণের অদম্য প্রচেষ্টা এবং সফলতার গল্পই সিনেমার মূল আকর্ষণ। এই নারী কেন্দ্রিক গল্পের প্রতিটি মোড়ে রয়েছে লড়াই, আবেগ এবং হাস্যরসের চমৎকার সমন্বয়, যা দর্শকদের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
কুংফু সকার-এর অভিনয়শিল্পী নির্বাচনও এর সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন ঝ্যাং শিয়াওফেই, যিনি তার অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন। তার পাশাপাশি তারকা স্ট্রাইকারের চরিত্রে জনপ্রিয় অভিনেত্রী দিলরাবা দিলমুরাত এবং কুংফু কোচের ভূমিকায় লে ঝ্যাংয়ের শক্তিশালী অভিনয় সিনেমাটির মানকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এছাড়া হংকংয়ের কিংবদন্তি অভিনেত্রী ক্যারিনা লাউসহ আন্তর্জাতিক তারকাদের উপস্থিতি সিনেমাটিকে এক বিশ্বজনীন রূপ দিয়েছে। স্টিফেন চৌয়ের নিজস্ব ঘরানার অ্যাকশন দৃশ্যগুলো এবার যেন আরও বেশি শৈল্পিক ও মার্জিত হয়েছে, যা মার্শাল আর্ট প্রেমী ও ফুটবল ভক্ত—উভয় শ্রেণির দর্শকের কাছেই সমানভাবে আদরণীয় হয়েছে।
সিনেমার বিপণনকৌশল নিয়েও চলচ্চিত্র সমালোচকদের মাঝে ব্যাপক আলোচনার জন্ম হয়েছে। গতানুগতিক বড় মাপের প্রচারণা এড়িয়ে স্টিফেন চৌ বেছে নিয়েছিলেন একান্ত নিজস্ব ও সহজ এক কৌশল। নিজের জন্মদিনকে উপলক্ষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ছোট্ট ভিডিও বার্তার মাধ্যমে সিনেমাটির মুক্তির তারিখ ঘোষণা করা ছিল এক ধরনের মাস্টারস্ট্রোক। কোনো প্রকার অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন বা প্রি-রিলিজ প্রচারণা ছাড়াই মানুষ সিনেমাটির প্রতি যেভাবে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে, তা সিনেমার কনটেন্টের গুণগত মানকেই প্রমাণ করে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক এনকোর ফিল্মস সিনেমাটির আন্তর্জাতিক পরিবেশনার দায়িত্ব নিয়ে এটিকে বিশ্বের অন্যান্য বাজারে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করছে। উত্তর আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সিনেমাটির মুক্তি পাওয়া এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা মাত্র।
চলতি বছরের প্রথমার্ধে চীনের বক্স অফিসে কিছুটা মন্দা দেখা গেলেও স্টিফেন চৌয়ের এই সিনেমা গ্রীষ্মকালীন চলচ্চিত্র মৌসুমে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। পাশাপাশি অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী সিনেমার উপস্থিতিও বাজারে বেশ প্রতিযোগিতা তৈরি করেছে। পার্ল স্টুডিওর ‘অল উইশেস কাম ট্রু’ বা নারীর বন্ধুত্বের গল্প নিয়ে তৈরি ‘আ পার্ট অব মি’ ভালো ব্যবসা করলেও ‘কুংফু সকার’ সব কিছুকে ছাড়িয়ে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে এগিয়ে চলছে। বক্স অফিসে হলিউড ও স্থানীয় চলচ্চিত্রের এই লড়াই দর্শকদের জন্য বিনোদনের এক চমৎকার খোরাক যোগাচ্ছে। আগামী সপ্তাহগুলোতে হলিউডের হরর ছবি ‘অবসেশন’-এর মুক্তির পর বক্স অফিসের সমীকরণ আরও বদলে যেতে পারে, তবে আপাতত ‘কুংফু সকার’ দর্শকদের মন জয় করে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলছে।
পরিশেষে বলা যায়, চলচ্চিত্র শিল্পের সাফল্য কেবল অর্থের অঙ্কে মাপা সম্ভব নয়, বরং দর্শক হৃদয়ে যে গভীর ছাপ সিনেমাটি ফেলতে পেরেছে, সেটাই তার আসল সার্থকতা। স্টিফেন চৌ আবারও প্রমাণ করলেন যে, শিল্পের সাথে বিনোদনের মিশেল ঘটাতে পারলে দর্শক তা সানন্দে গ্রহণ করে। ‘কুংফু সকার’ কেবল চীনের সিনেমার রেকর্ড ভাঙছে না, বরং এটি বিশ্ব সিনেমার বাজারে নতুন এক আলোচনার জন্ম দিচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে, আগামী দিনগুলোতে সিনেমাটি আন্তর্জাতিক বাজারে মুক্তি পাওয়ার পর আরও নতুন নতুন সাফল্যের রেকর্ড গড়বে। চলচ্চিত্রপ্রেমীরা এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন এই ফুটবল জাদুকরদের মার্শাল আর্টের লড়াই বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলার মুহূর্তটির জন্য। এক কথায়, ‘কুংফু সকার’ শুধু সিনেমা নয়, এটি যেন ফুটবল উৎসবের মাঝে এক নতুন উদ্দীপনার নাম।