প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সরকারি চাকরিতে শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতা একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। সরকারি অফিসের প্রতিটি স্তরে যারা কর্মরত থাকেন, তাদের ওপর অর্পিত থাকে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা বিনা অনুমতিতে কর্মস্থল ত্যাগ করা কেবল শৃঙ্খলাভঙ্গই নয়, বরং তা জনসেবার প্রতি এক ধরনের বড় অবজ্ঞা। সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর বরখাস্তের ঘটনাটি সরকারি কর্মক্ষেত্রে এই নিয়মানুবর্তিতার প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা এবং কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই উধাও হয়ে যাওয়ার দায়ে তাকে চূড়ান্তভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এটি কেবল একজন কর্মকর্তার বরখাস্তের ঘটনা নয়, বরং সরকারি দায়িত্ববোধের কঠোর অনুসরণের এক দৃষ্টান্তমূলক বার্তা।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালের ৬ আগস্ট। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাধারণ সেবা-১ অধিশাখার প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ দায়িত্বরত ছিলেন। কোনো ধরনের পূর্বানুমতি বা কারণ দর্শানো ছাড়াই ওই দিন থেকে তিনি কর্মস্থলে যাওয়া বন্ধ করে দেন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তা যদি দীর্ঘ সময় বিনানুমতিতে অফিসে অনুপস্থিত থাকেন, তবে তা সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর পরিপন্থী হিসেবে গণ্য হয়। আব্দুল্লাহর এই আচরণের কারণে অফিসের স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং সাধারণ সেবা প্রদানের গতি ব্যাহত হয়েছিল। দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরও যখন তার কোনো হদিস বা যৌক্তিক কারণ পাওয়া যায়নি, তখন বিভাগটি তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেয়।
প্রাথমিক পর্যায়ে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করা হয়, যাতে তিনি তার অনুপস্থিতির সপক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে পারেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, তার দেওয়া জবাব যথাযথ বা সন্তোষজনক ছিল না। একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তার এই স্বেচ্ছাচারী আচরণ কর্তৃপক্ষের কাছে তার পেশাদারিত্বের অভাবকেই নির্দেশ করে। ফলে, বিধিমালা অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ‘পলায়ন’ বা ‘অননুমোদিত অনুপস্থিতি’-এর অভিযোগে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। ঘটনার গভীরতা ও প্রশাসনিক গুরুত্ব বিবেচনা করে চলতি বছরের শুরুতে একজন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। দীর্ঘ তদন্ত ও অনুসন্ধানের পর ফেব্রুয়ারি মাসে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়।
তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রক্রিয়া অনুযায়ী তাকে দ্বিতীয়বার কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। কিন্তু দ্বিতীয়বারও তিনি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হন। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালার ৪(৩)(ঘ) বিধি অনুযায়ী তাকে কঠোর গুরুদণ্ড অর্থাৎ ‘চাকরি থেকে বরখাস্তকরণ’-এর প্রাথমিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। যেকোনো বড় ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আগে সরকারি কর্ম কমিশনের (বিপিএসসি) মতামত গ্রহণ একটি আবশ্যিক প্রক্রিয়া। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পক্ষ থেকে তার বরখাস্তের প্রস্তাব পাঠানো হলে পিএসসি তা পর্যালোচনা করে এবং এই গুরুদণ্ড আরোপের পক্ষে সম্মতি প্রদান করে। ফলে আইনি ও প্রশাসনিক সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে তাকে চাকরি থেকে চূড়ান্তভাবে অব্যাহতি দেয়।
এই ঘটনাটি সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্বের প্রতি কতটুকু দায়বদ্ধ থাকা প্রয়োজন, তা নতুন করে মনে করিয়ে দেয়। দেশের প্রশাসনিক হৃদপিণ্ড হিসেবে পরিচিত মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে কর্মরত থাকা অবস্থায় এ ধরনের ঘটনা কেবল একজন কর্মকর্তার ক্যারিয়ারের সমাপ্তিই ঘটায় না, বরং বিভাগের সুনাম ও কাজের পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একজন কর্মকর্তা যখন কোনো কারণ ছাড়াই দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন, তখন তিনি পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রের একজন করদাতার সেবাপ্রাপ্তির অধিকারকেও ক্ষুণ্ণ করেন। মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর এই পলায়ন কেবল ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার অভাব নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রতি তার অঙ্গীকারের বিচ্যুতি হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বরখাস্তের এই প্রজ্ঞাপনটি কার্যকর করা হয়েছে সেই দিন থেকেই, যেদিন তিনি প্রথম কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। অর্থাৎ ২০২৫ সালের ৬ আগস্ট থেকেই তার বরখাস্তকাল কার্যকর ধরা হয়েছে। এর মাধ্যমে এটি নিশ্চিত করা হয়েছে যে, দীর্ঘ এই সময়কাল তার জন্য কোনো ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধা কিংবা দাপ্তরিক দায়মুক্তির সুযোগ তৈরি করবে না। প্রশাসন বিভাগ স্পষ্টভাবে এটি জানিয়ে দিয়েছে যে, সরকারি চাকরির নিয়মশৃঙ্খলার তোয়াক্কা না করার কোনো সুযোগ নেই। যে কোনো পর্যায়েই হোক না কেন, যদি কেউ তার দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হয়, তবে কঠোর আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাকে জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, সরকারি প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা বজায় রাখতে কঠোর শৃঙ্খলার কোনো বিকল্প নেই। মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর এই বহিষ্কারাদেশ অন্য সব কর্মকর্তাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে। রাষ্ট্র যখন একজন সরকারি কর্মচারীকে বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে, তখন তার বিনিময়ে জনসেবার নিশ্চয়তা প্রত্যাশা করে। যেখানেই দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা স্বেচ্ছাচারিতার প্রমাণ মিলবে, প্রশাসন সেখানে শূন্য সহনশীলতার পরিচয় দেবে—এটাই প্রশাসনিক সুশাসনের মূল কথা। আশা করা যায়, এই দৃষ্টান্তটি ভবিষ্যতে প্রশাসনিক শৃঙ্খলাকে আরও সুদৃঢ় করবে এবং জনসেবার মান উন্নয়নে কর্মকর্তাদের আরও বেশি দায়িত্বশীল ও সচেতন করে তুলবে।