তারেক রহমানের নৈশভোজে গরহাজির জমিয়ত: নেপথ্যে গভীর ক্ষোভ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬
  • ৪২ বার
তারেক রহমানের নৈশভোজে গরহাজির জমিয়ত: নেপথ্যে গভীর ক্ষোভ

প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সরকার গঠনের প্রায় পাঁচ মাস পর প্রথমবারের মতো যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের নিয়ে এক বিশেষ নৈশভোজের আয়োজন করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান। সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এই আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে শতাধিক রাজনৈতিক নেতা অংশগ্রহণ করলেও, দৃশ্যপটে অনুপস্থিত থাকল দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত মিত্র জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ। ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার পর থেকেই বিএনপির সঙ্গে যে দূরত্ব ও শীতল সম্পর্কের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল, এই নৈশভোজে যোগ না দেওয়ার মধ্য দিয়ে তা আজ একরকম প্রকাশ্যে রূপ নিল। রাজনীতির মাঠে এই অনুপস্থিতি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক বর্জন নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের অবমূল্যায়ন ও উপেক্ষা থেকে সৃষ্ট এক গভীর অভিমান ও রাজনৈতিক অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ।

ফ্যাসিস্ট সরকার পতনের যুগপৎ আন্দোলনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ বিএনপির সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মাঠে ছিল। সেই রাজনৈতিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটগতভাবে চারটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ পেয়েছিল দলটি। কিন্তু নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফলাফল না আসায় এবং দলটির সব প্রার্থী পরাজিত হওয়ায় শুরু হয় এক ধরনের অস্বস্তিকর নীরবতা। জমিয়তের শীর্ষ নেতাদের অভিযোগ, নির্বাচনের পর থেকেই বিএনপির সঙ্গে তাদের যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। একটি জোটে যখন দলগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করে, তখন বিজয়ের পর বা সরকার গঠনের পর শরিকদের মর্যাদা ও মতামতের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া রাজনৈতিক শিষ্টাচারের অংশ। কিন্তু জমিয়ত মনে করছে, সরকার গঠনের পর তাদের প্রয়োজনীয় গুরুত্ব না দিয়ে ক্রমাগত উপেক্ষা করা হয়েছে, যা দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে প্রবল ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

সম্প্রতি দলটির সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক প্রকাশ্যে এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন যে, নির্বাচনের পর থেকে বিএনপির সঙ্গে তাদের কোনো কুশল বিনিময় বা আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়নি। জোটের অন্যান্য শরিকদের সঙ্গে বিএনপি যোগাযোগ রাখলেও জমিয়তকে কেন ব্রাত্য করে রাখা হলো, তা নিয়ে তাদের মনে দানা বেঁধেছে রহস্যের জট। শরিক দলটির প্রচার সম্পাদক ইমরানুল বারী সিরাজী নৈশভোজ বর্জনের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বলেন, আমরা বিএনপির প্রধান শরিক ছিলাম, কিন্তু সরকার গঠনের পর আমাদের কোনো খোঁজ-খবর নেওয়া হয়নি। এখন হঠাৎ করে খাওয়ার নিমন্ত্রণ পেয়ে সেখানে গিয়ে কী লাভ হবে? এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট যে, এটি কেবল নৈশভোজের বিষয় নয়, বরং এটি রাজনীতির দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট ও মর্যাদার লড়াই।

এরই মধ্যে নতুন এক রাজনৈতিক মেরুকরণের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। গত ১৬ জুলাই হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের উদ্যোগে কওমি ধারার সাতটি ইসলামী দল নিয়ে ভবিষ্যতে ঐক্যবদ্ধভাবে পথচলার বিষয়ে নীতিগত ঐকমত্য হয়েছে। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশও এই প্রক্রিয়ায় সক্রিয় রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ রাজনীতিতে কাঙ্ক্ষিত প্রাপ্তি না মেলায় এবং দীর্ঘ সময় ধরে অবমূল্যায়িত হওয়ার কারণে জমিয়ত এখন নিজস্ব অবস্থানে বা নতুন কোনো জোটের ছায়াতলে আশ্রয় খুঁজছে। বিএনপির সঙ্গে তাদের যে ঐতিহাসিক ও দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক ছিল, তা আজকের এই দূরত্বে এসে এক বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েছে। রাজনীতিতে কোনো দলই চিরস্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নয়, বরং স্বার্থ ও পারস্পরিক মর্যাদাই সম্পর্কের স্থায়িত্ব নির্ধারণ করে।

নৈশভোজের এই আয়োজন মূলত শরিকদের সঙ্গে সম্পর্ক ঝালাই করার একটি সুযোগ ছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই এই উদ্যোগ নিয়েছিলেন যেন রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও জোটের সমন্বয় নিয়ে আলোচনা করা যায়। কিন্তু জমিয়তের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ শরিক দলের অনুপস্থিতি সেই আলোচনার গুরুত্বকে কিছুটা হলেও ম্লান করে দিল। যখন বিএনপি সরকার পরিচালনার নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, তখন দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্রদের এভাবে দূরে সরে যাওয়া দলটির জন্য খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। যদি আলোচনার মাধ্যমে এই দূরত্ব ঘোচানো না যায়, তবে আগামী দিনে বিএনপি ও জমিয়তের মধ্যকার এই ফাটল আরও প্রশস্ত হতে পারে, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন কোনো সমীকরণের জন্ম দিতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, রাজনীতির মাঠ সবসময়ই গতিশীল। আজ যারা মিত্র, কাল তারা ভিন্ন মেরুতে অবস্থান নিতেই পারে—এটিই রাজনীতির নির্মম বাস্তবতা। কিন্তু বন্ধুত্বের ভিত্তি যখন পারস্পরিক সম্মান ও যোগাযোগের ওপর গড়ে ওঠে, তখন সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয়। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের এই অভিমানী অবস্থান বিএনপির জন্য একটি সতর্কবার্তা। জোটে থাকা দলগুলোর চাওয়া-পাওয়া ও আত্মমর্যাদার জায়গাগুলো ঠিক রেখে শরিকদের আগলে রাখাই হবে আধুনিক জোট রাজনীতির বড় পরীক্ষা। নৈশভোজের টেবিল খালি থাকলেও, আলোচনার টেবিল এখনো খোলা আছে। বিএনপি যদি সময়মতো এই ক্ষোভ প্রশমনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে, তবেই হয়তো রাজনৈতিক এই দূরত্ব কমিয়ে আবার নতুন করে আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। অন্যথায়, মিত্র হারানোর তালিকা দীর্ঘতর হওয়ার দায় এড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত