প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের ভোক্তাদের নিরাপদ ও মানসম্মত পণ্য নিশ্চিত করতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় চারটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত আট ধরনের খাদ্য ও প্রসাধনী পণ্য বাজার থেকে অবিলম্বে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে সংস্থাটি। পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণের মাধ্যমে এসব পণ্যে অতিরিক্ত প্রিজারভেটিভ, মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর অণুজীবের উপস্থিতি এবং নির্ধারিত মানের ব্যত্যয় ধরা পড়েছে বলে জানিয়েছে বিএসটিআই।
সোমবার (২০ জুলাই) প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বিএসটিআই জানায়, নিয়মিত বাজার তদারকি ও পরীক্ষাগার বিশ্লেষণের অংশ হিসেবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষার ফলাফলে কয়েকটি পণ্যে গুরুতর মানগত ত্রুটি ধরা পড়ায় জনস্বার্থ ও ভোক্তা সুরক্ষার স্বার্থে তাৎক্ষণিকভাবে বাজার থেকে সেগুলো প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সংস্থাটির তথ্যমতে, ফ্রেশ গার্ডেন অ্যাগ্রো রিসোর্সেসের উৎপাদিত আমের আচারে নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি মাত্রায় প্রিজারভেটিভ পাওয়া গেছে। খাদ্যপণ্যে অতিরিক্ত প্রিজারভেটিভের ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদে মানবস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এ কারণে সংশ্লিষ্ট পণ্যটি বাজার থেকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একইভাবে কাজী ফুড ইন্ডাস্ট্রিজের বেলিসিমো ব্র্যান্ডের রোটোন্ডো হ্যাজেলনাট কোটেড চকলেট আইসক্রিম পরীক্ষায় বাংলাদেশ মানদণ্ড অনুযায়ী অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি টোটাল মিল্ক সলিড নন-ফ্যাট উপাদান পাওয়া যায়। পণ্যের গুণগত মান ও নির্ধারিত মানদণ্ড বজায় রাখতে এ ধরনের বিচ্যুতিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে বিএসটিআই।
প্রসাধনী পণ্যের ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। অলিভ বাংলাদেশের লাবণ্য ব্র্যান্ডের মিল্ক স্কিন লোশন, অ্যালোভেরা স্কিন লোশন, মোরিংগা ও মাচা ফোমিং মিল্ক ফেসওয়াশ এবং অ্যালোভেরা ভ্যারিয়েন্টের শ্যাম্পুতে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর অণুজীবের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অণুজীবযুক্ত প্রসাধনী ব্যবহার করলে ত্বকে সংক্রমণ, অ্যালার্জি ও বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই ভোক্তাদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিয়ে এসব পণ্যও বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ডেকো ফুডসের ডেকো ফ্রুট ফান্ডা ব্র্যান্ডের ম্যাঙ্গো ও অরেঞ্জ ভ্যারিয়েন্টের সফট ড্রিংক পাউডারে বাংলাদেশ মান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় মাত্রার তুলনায় কম ভিটামিন ‘সি’ পাওয়া গেছে। যদিও এটি সরাসরি স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয় নয়, তবে পণ্যের মোড়কে উল্লেখিত গুণগত মান ও প্রকৃত উপাদানের মধ্যে অসঙ্গতি থাকায় সেটিও মানদণ্ড লঙ্ঘনের আওতায় পড়েছে।
বিএসটিআই জানিয়েছে, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া পণ্যগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিক প্রত্যাখ্যানপত্র পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি এসব পণ্যের লাইসেন্স নবায়ন বা পুনরায় অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত উৎপাদন, বিপণন, বিক্রয় ও বিতরণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের সব পরিবেশক, ডিলার এবং খুচরা বিক্রেতার কাছ থেকে এসব পণ্য দ্রুত প্রত্যাহার করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, শুধু নির্দেশনা জারি করেই দায়িত্ব শেষ করা হবে না। বাজার থেকে পণ্য প্রত্যাহারের কার্যক্রম সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, তা নিবিড়ভাবে তদারকি করবে বিএসটিআই। প্রয়োজন হলে ভ্রাম্যমাণ অভিযান পরিচালনা এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণও করা হবে।
বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক (সচিব) কাজী ইমদাদুল হক বলেন, নিরাপদ ও মানসম্মত পণ্য ভোক্তার মৌলিক অধিকার। সেই অধিকার নিশ্চিত করতে বিএসটিআই নিয়মিতভাবে বাজার তদারকি, নমুনা সংগ্রহ এবং পরীক্ষাগার বিশ্লেষণ পরিচালনা করে। কোনো প্রতিষ্ঠান মানদণ্ড লঙ্ঘন করলে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং এ ধরনের কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
তিনি ভোক্তাদেরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, কোনো পণ্য কেনার আগে অবশ্যই বিএসটিআইয়ের মানচিহ্ন, লাইসেন্স নম্বর, উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং পণ্যের অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করা উচিত। এতে নিম্নমানের বা অননুমোদিত পণ্য কেনার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে আসবে।
ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, দেশের বাজারে নিরাপদ খাদ্য ও মানসম্মত প্রসাধনী নিশ্চিত করতে নিয়মিত নজরদারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোরও উচিত উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত মান কঠোরভাবে অনুসরণ করা এবং বাজারজাত করার আগে প্রতিটি পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করা। অন্যথায় শুধু প্রতিষ্ঠানের সুনামই ক্ষুণ্ন হবে না, ভোক্তার স্বাস্থ্যও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ভেজাল ও নিম্নমানের পণ্য নিয়ে ভোক্তাদের উদ্বেগ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে বিএসটিআইয়ের এই পদক্ষেপ বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং উৎপাদকদের আরও দায়িত্বশীল হতে উৎসাহিত করবে। একই সঙ্গে ভোক্তার আস্থা পুনরুদ্ধারেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিরাপদ খাদ্য ও মানসম্মত পণ্য নিশ্চিত করতে সরকারি সংস্থার পাশাপাশি উৎপাদক, পরিবেশক, বিক্রেতা এবং ভোক্তা—সব পক্ষের সম্মিলিত সচেতনতাই সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাজারে কোনো পণ্যের মান নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে তা দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো এবং অনুমোদিত মানচিহ্নযুক্ত পণ্য ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত