প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার জাতীয় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ। এ লক্ষ্য অর্জনে আইনি সংস্কার, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণে সরকার সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রাবিউল আলম। তিনি বলেন, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, বরং এটি রাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ, উন্নয়ন অংশীদার এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত দায়িত্ব।
সোমবার জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়নবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বক্তব্য দিতে গিয়ে মন্ত্রী বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন। বৈশ্বিক ‘রোড সেফটি ২০২১–২০৩০’ কর্মপরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলার বিষয়ে সরকারের চলমান উদ্যোগের কথাও তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরেন।
বক্তব্যে শেখ রাবিউল আলম বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে নিরাপদ সড়কব্যবস্থা নিবিড়ভাবে জড়িত। প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় যে প্রাণহানি ও আর্থিক ক্ষতি হয়, তা কমিয়ে আনতে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। তিনি জানান, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, চালকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, আইন প্রয়োগ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়েও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রী জানান, সড়কে গতি নিয়ন্ত্রণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার ও জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করতে ‘পোস্ট-ক্র্যাশ রেসপন্স’ সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চলছে। বিশেষ করে মহাসড়কে পথচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে, যাতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ অনুসরণ করে বাংলাদেশ একটি আধুনিক ও সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের পথে এগোচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইন চূড়ান্ত, অনুমোদন এবং কার্যকর করা। নতুন আইনটি আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে এবং সড়ক ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা ও কার্যকারিতা আরও বাড়াবে।
সড়ক নিরাপত্তাকে জাতীয় উন্নয়ন ও জননিরাপত্তার অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে শেখ রাবিউল আলম বলেন, ২০৩০ সালের বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনে শক্তিশালী রাজনৈতিক অঙ্গীকার, কার্যকর নীতিমালা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বিত অংশীদারিত্ব অপরিহার্য। তিনি বলেন, নিরাপদ, টেকসই, স্বাস্থ্যসম্মত এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করে এমন সড়কব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাবে।
মন্ত্রী তার বক্তব্যে আরও উল্লেখ করেন, সড়ক দুর্ঘটনা শুধু একটি পরিবহন সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। তাই সড়ক নিরাপত্তাকে একটি বহুমাত্রিক জাতীয় ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, সংস্থা ও অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
জাতিসংঘের এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রাবিউল আলম। প্রতিনিধি দলে আরও রয়েছেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক, জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী এবং বাংলাদেশ রোড সেফটি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ শাব্বির হাসান খান। বৈঠকে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা এবং সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা অংশগ্রহণ করেন।
মঙ্গলবার জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিতব্য ‘Strengthening Multisectoral Coordination for Road Safety’ শীর্ষক পার্শ্ব-আয়োজনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী। সেখানে তিনি সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন এবং বিভিন্ন দেশের সফল অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান এবং কার্যকর নীতিমালা নিয়ে আলোচনা হবে। এই আলোচনার মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং সড়ক নিরাপত্তা জোরদারে নতুন সহযোগিতার সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে শুধু আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়; কার্যকর বাস্তবায়ন, নিয়মিত মনিটরিং, সড়ক প্রকৌশলের উন্নয়ন, চালকদের প্রশিক্ষণ, যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে দুর্ঘটনার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসংঘের এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা ও সর্বোত্তম চর্চা থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনার পথও আরও সুগম হবে। সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি অর্ধেকে নামিয়ে আনতে হলে পরিকল্পিত উদ্যোগ, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণই হবে সবচেয়ে বড় শক্তি।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত