দক্ষিণখানে নারী চিকিৎসক হত্যা: রিমান্ড শেষে স্বামী কারাগারে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫৯ বার
দক্ষিণখানে নারী চিকিৎসক হত্যা: রিমান্ড শেষে স্বামী কারাগারে
প্রকাশ: ০৬ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর দক্ষিণখান এলাকার একটি আবাসিক ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা চাঞ্চল্যকর দন্তচিকিৎসক সারা রোকসানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্তে নতুন মোড় নিয়েছে। আলোচিত এই হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারকৃত নিহতের স্বামী মো. সোহেল রানাকে দুই দিনের পুলিশি রিমান্ড জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সফলভাবে সম্পন্ন করার পর আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী সরাসরি কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বুধবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কামাল উদ্দীনের আদালত উভয় পক্ষের আইনজীবীদের শুনানি গ্রহণ শেষে আসামিকে কারাগারে আটক রাখার এই নির্দেশ দেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষ থেকে আদালতকে জানানো হয়েছে যে, রিমান্ডে থাকাকালীন সময়ে আসামি সোহেল রানার কাছ থেকে বেশ কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে, যা বর্তমানে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
মামলার বিবরণী ও পুলিশ সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার এই মামলার নির্ধারিত দুই দিনের রিমান্ড মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আসামি সোহেল রানাকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়েছিল। সে সময় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও দক্ষিণখান থানার উপপরিদর্শক হাবিবুর রহমান আসামিকে পুনরায় জেলহাজতে প্রেরণের জন্য আদালতের নিকট আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থনা জানান। প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক আবু বকর সিদ্দিক আদালতের এই আদেশের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান যে, তদন্তের স্বার্থে আসামির কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের কাজ চলমান রয়েছে এবং আদালতের নির্দেশে তাকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। এর আগে গত ৩ আগস্ট আদালত এই আসামির দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন, যার সুবাদে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য রহস্য উন্মোচনে বেশ কিছু প্রাথমিক সূত্র হাতে পেয়েছে তদন্ত দল।
ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল গত ৩০ জুলাই, যখন রাজধানী ঢাকার দক্ষিণখানের ফায়দাবাদ এলাকার জামতলা গলির একটি বহুতল ভবনের দ্বিতীয় তলার ফ্ল্যাট থেকে ৪২ বছর বয়সী দন্তচিকিৎসক সারা রোকসানার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনার আকস্মিকতায় পুরো এলাকায় তীব্র শোক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছিল। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে ঘটনার পরদিন দক্ষিণখান থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। মামলার এজাহারে ও পারিবারিক সূত্রে প্রকাশ পায় যে, ঘটনার দিন সকালে সোহেল রানা যথারীতি তাঁর দশ বছর বয়সী কন্যাশিশুকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে নিজের কর্মস্থলে চলে যান। সেই সময় বাসায় সম্পূর্ণ একা ছিলেন পেশায় দন্তচিকিৎসক সারা রোকসানা। দীর্ঘ সেই দিনের দুপুর সাড়ে তিনটার দিকে স্কুল ছুটির পর মেয়েটি একা বাসায় ফিরে আসে এবং ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে তার মায়ের মর্মান্তিক পরিণতি দেখতে পায়।
নিহত শিশুটির সেই বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে মামলায় বলা হয়, ঘরে প্রবেশ করার পর মেয়েটি তার মাকে শোবার বিছানার ওপর মুখের ঠিক ওপরে বালিশচাপা দেওয়া অবস্থায় motionless বা নিথর পড়ে থাকতে দেখে। সে অনেক ডাকাডাকি করা সত্ত্বেও তার মা কোনো সাড়া দেননি, যার ফলে সে বুঝতে পারে যে তার মায়ের কোনো শ্বাসপ্রশ্বাস নেই এবং তিনি বেঁচে নেই। মানসিকভাবে ভেঙে পড়া শিশুটি তাৎক্ষণিকভাবে স্কুল ভবনে ফিরে যায় এবং সেখানকার প্রধান শিক্ষকের মুঠোফোন ব্যবহার করে তার বাবাকে গোটা বিষয়টি দ্রুত জানায়। খবর পেয়ে স্বামী সোহেল রানা এবং পরবর্তীতে সারা রোকসানার পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা দ্রুত সেই বাসায় ছুটে আসেন। সে সময় নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে, ঘরের একটি জানালার গ্রিল কাটা অবস্থায় পাওয়া গেছে এবং আলমারি থেকে আনুমানিক বিশ লক্ষ টাকা মূল্যের স্বর্ণালংকার ও মূল্যবান সামগ্রী সম্পূর্ণ চুরি বা লুট হয়ে গেছে।
প্রাথমিক অবস্থায় এই হত্যাকাণ্ডের দৃশ্যপট দেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং স্থানীয় এলাকাবাসী ধারণা করেছিলেন যে, কোনো সংঘবদ্ধ চোর বা ডাকাত চক্র রাতের বেলা বা সুযোগ বুঝে জানালার গ্রিল কেটে ফ্ল্যাটের ভেতরে প্রবেশ করেছে এবং লুটপাট চালানোর সময় বাধা দেওয়ায় দন্তচিকিৎসক সারা রোকসানাংশকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। এই চাঞ্চল্যকর খবরের পর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের বা সিআইডির একটি বিশেষায়িত দল দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে সমস্ত আলামত ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করে। পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের উদ্দেশ্যে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। কিন্তু পুলিশি তদন্তের গভীরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ঘটনার পেছনে অন্য কোনো গভীর রহস্য বা পারিবারিক বিরোধের ইঙ্গিত মিলতে শুরু করে, যা পুরো ঘটনাকে সম্পূর্ণ এক নতুন মোড় এনে দেয়।
মামলাটির রহস্য উদ্ঘাটনের ধারাবাহিকতায় পুলিশ তদন্তের একপর্যায়ে গত শুক্রবার দিবাগত রাতে নিহতের স্বামী সোহেল রানাকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করে। পরবর্তীতে দীর্ঘ ও নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদে তিনি চাঞ্চল্যকর সব তথ্য প্রকাশ করেন। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বামী সোহেল রানা তাদের দীর্ঘদিনের দাম্পত্য কলহ ও পারিবারিক অশান্তির কথা স্বীকার করেছেন। পাশাপাশি, স্ত্রীর একটি ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে তীব্র সন্দেহ পোষণ করতেন বলেও পুলিশকে জানিয়েছেন। এই সন্দেহের বশবর্তী হয়েই পারিবারিক বিরোধের চরম পর্যায়ে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। রিমান্ডে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ ও অন্যান্য আলামতগুলো মিলিয়ে দেখার প্রক্রিয়া চলছে। একজন চিকিৎসকের এমন নৃশংস মৃত্যুর ঘটনায় সমাজের সব মহলে গভীর শোকের পাশাপাশি তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে এবং প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com