প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কার্যত হেরে গেছেন বলে মন্তব্য করেছেন ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফি। তার দাবি, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান দুর্বল হচ্ছে এবং বিপরীতে ইরান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করছে। একই সঙ্গে সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
রোববার (৯ আগস্ট) মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মারফি বলেন, ‘আমেরিকা দুর্বল হচ্ছে, ইরান শক্তিশালী হচ্ছে।’ তার বক্তব্যে মূলত যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তিনি মনে করেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি কূটনৈতিকভাবেও ওয়াশিংটনের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।
মারফি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুদ্ধ বন্ধ করা এবং গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করার জন্য প্রয়োজন হলে তিনি একটি ‘খারাপ চুক্তি’ সমর্থন করতেও প্রস্তুত। তার যুক্তি, একটি অসম্পূর্ণ বা যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশার তুলনায় কম সুবিধাজনক সমঝোতা হলেও তা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে ভালো হতে পারে। কারণ প্রতিদিন সংঘাত চলার সঙ্গে সঙ্গে এর মূল্য শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাতেও পড়ছে।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংকটই বর্তমান সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ পরিবাহিত হয়। ফলে প্রণালিতে নৌ-চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে তার প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, পণ্য পরিবহন ব্যয় এবং বিভিন্ন দেশের ভোক্তা বাজারেও এর প্রভাব পড়ে।
মারফির মতে, আলোচনা যত বিলম্বিত হচ্ছে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্যও তত বাড়ছে। ফলে কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ থাকা অবস্থায় সেটিকে কাজে লাগানো প্রয়োজন। তার বক্তব্যে স্পষ্ট, তিনি যুদ্ধের সামরিক সমাধানের চেয়ে দ্রুত একটি রাজনৈতিক সমঝোতার পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন।
সাম্প্রতিক আলোচনায় ইরানের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং মার্কিন সামরিক অভিযান বন্ধের মতো দাবি সামনে এসেছে বলে বিভিন্ন মার্কিন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তবে এসব দাবির বিষয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের অবস্থানের মধ্যে এখনও বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধানে পৌঁছানো কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রভাব নিয়ে মারফির উদ্বেগের একটি বড় অংশ অর্থনৈতিক। তার ভাষায়, যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষকে এর মূল্য দিতে হবে। জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেন, দীর্ঘ যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ পরিবারের ওপরই সবচেয়ে বেশি পড়ে।
মারফির এই বক্তব্য মার্কিন কংগ্রেসে যুদ্ধ নিয়ে চলমান রাজনৈতিক বিতর্কেরও একটি প্রতিফলন। ডেমোক্র্যাটদের একটি অংশ শুরু থেকেই ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান নীতির সমালোচনা করে আসছে। তবে বর্তমান মন্তব্যে মারফি শুধু সামরিক অভিযানের সমালোচনা করেননি; তিনি যুদ্ধ বন্ধের জন্য রাজনৈতিকভাবে অজনপ্রিয় বা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন হতে পারে এমন চুক্তিও বিবেচনার কথা বলেছেন।
তিনি আরও জানান, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের বিরোধিতা করবেন। তবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত পুনরায় পূরণ করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দে তিনি সমর্থন দেবেন। অর্থাৎ তার অবস্থান যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অর্থায়নের বিরোধিতা করলেও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা সক্ষমতা পুনর্গঠনের বিপক্ষে নয়।
মারফির এই অবস্থান এমন সময়ে এসেছে, যখন সংঘাতের সামরিক ব্যয় ও অস্ত্রের মজুত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আলোচনা বাড়ছে। এর আগে মার্কিন কংগ্রেসের রেকর্ডেও তিনি যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও মানবিক ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে সংকট অব্যাহত থাকায় আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। উপসাগরীয় দেশগুলো যেমন এই সংকটের সরাসরি অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন, তেমনি এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশও জ্বালানি সরবরাহ ও নৌ-নিরাপত্তা পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা যত দীর্ঘ হবে, ততই জ্বালানি ও পরিবহন খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এ অবস্থায় মারফির ‘খারাপ চুক্তি’ সমর্থনের বক্তব্য মূলত একটি বাস্তববাদী কূটনৈতিক অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তার যুক্তি হলো, কোনো সমঝোতা যদি যুদ্ধ থামাতে পারে এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করতে পারে, তাহলে সেটিকে সম্পূর্ণ আদর্শ না হলেও বিবেচনা করা উচিত। তবে এমন কোনো চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা স্বার্থ কতটা রক্ষা করবে, তা নিয়ে ওয়াশিংটনে বিতর্ক থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে ট্রাম্প ‘হেরে গেছেন’—মারফির এই মন্তব্য তাই কেবল রাজনৈতিক সমালোচনা হিসেবে নয়, বরং যুদ্ধের লক্ষ্য, ব্যয় এবং সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে একটি বৃহত্তর বিতর্কের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। কোনো যুদ্ধের সামরিক ফলাফল নির্ধারণের পাশাপাশি কূটনৈতিক লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে কি না, অর্থনৈতিক ক্ষতি কতটা হয়েছে এবং সংঘাত শেষে কোন পক্ষ কতটা কৌশলগত সুবিধা পেল—এসব প্রশ্নও রাজনৈতিক মূল্যায়নের অংশ হয়ে ওঠে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ওয়াশিংটন ও তেহরান শেষ পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমে এমন কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে কি না, যা যুদ্ধ বন্ধের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির নৌ-চলাচল স্বাভাবিক করবে। আলোচনা ব্যর্থ হলে সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। আর যুদ্ধ দীর্ঘ হলে, মারফির ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
তবে ইরানও যে কোনো সমঝোতার বিনিময়ে বড় ধরনের ছাড় চাইছে বলে প্রতিবেদনগুলোতে উঠে এসেছে। ফলে দুই পক্ষের অবস্থানের দূরত্ব কমানোই হবে কূটনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য কত দ্রুত স্বাভাবিক করা যায়, সেটিও হয়ে উঠেছে জরুরি প্রশ্ন।
সব মিলিয়ে ক্রিস মারফির বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ইরান যুদ্ধ নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের তীব্রতা স্পষ্ট করেছে। ট্রাম্প প্রশাসন সংঘাত থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসবে, যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা কীভাবে পুনর্গঠন করবে এবং হরমুজ প্রণালির সংকট কীভাবে সমাধান করবে—এই তিনটি বিষয় আগামী দিনগুলোতে ওয়াশিংটনের জন্য বড় কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।