সাত সপ্তাহের শীর্ষ থেকে নামল বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬
  • ১২ বার

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ববাজারে টানা ঊর্ধ্বগতির পর কিছুটা কমেছে স্বর্ণের দাম। মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের পরবর্তী সুদহার সিদ্ধান্ত ঘিরে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানের মধ্যে সোমবার মূল্যবান ধাতুটির দর নিম্নমুখী হয়েছে। এর আগে গত শুক্রবার দুর্বল মার্কিন কর্মসংস্থান প্রতিবেদনের প্রভাবে স্বর্ণের দাম সাত সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার বাংলাদেশ সময় সকাল ৮টার দিকে স্পট গোল্ডের দাম শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৩২২ দশমিক ২৮ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের গোল্ড ফিউচার্সের দাম শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৩৮১ দশমিক ৬০ ডলারে দাঁড়ায়।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক দিনে দ্রুত মূল্যবৃদ্ধির পর বিনিয়োগকারীদের একাংশ মুনাফা তুলে নেওয়ায় স্বর্ণের দামে সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে। তবে এই পতনকে এখনই বাজারের বড় ধরনের প্রবণতা পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন না তারা। বরং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক তথ্য, ফেডের সুদহার নীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি আগামী দিনগুলোতে স্বর্ণের দিকনির্দেশ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

গত শুক্রবার স্বর্ণের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। এর পেছনে প্রধান কারণ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল কর্মসংস্থান তথ্য। মার্কিন শ্রমবাজারের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে জুলাই মাসে দেশটির অর্থনীতি অপ্রত্যাশিতভাবে কর্মসংস্থান হারিয়েছে বলে উঠে আসে। একই সঙ্গে আগের দুই মাসের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হিসাবও বড় ধরনের সংশোধনের মাধ্যমে কমিয়ে দেওয়া হয়।

মার্কিন অর্থনীতির শ্রমবাজারে এমন দুর্বলতার ইঙ্গিত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ফেডারেল রিজার্ভের ভবিষ্যৎ নীতি নিয়ে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। বাজারে এখন সেপ্টেম্বরের বৈঠকে সুদহার কমানো হবে কি না, তা নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। ১৫ ও ১৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠেয় ফেডের বৈঠকে সুদহার কমানোর সম্ভাবনা ৫০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে বলে বাজারভিত্তিক হিসাব থেকে জানা যাচ্ছে।

স্বর্ণের বাজারে সুদহারের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বর্ণ কোনো সুদ বা নির্দিষ্ট আয় প্রদান করে না। ফলে সুদহার যখন বেশি থাকে, তখন বিনিয়োগকারীদের কাছে সুদ-আয়কারী সম্পদ তুলনামূলকভাবে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। বিপরীতে সুদহার কমার সম্ভাবনা তৈরি হলে স্বর্ণ ধরে রাখার সুযোগ ব্যয় কমে যায়। তখন নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা বাড়তে পারে এবং দামও ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার সুযোগ পায়।

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির পরবর্তী তথ্য বাজারের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চলতি সপ্তাহে বুধবার দেশটির ভোক্তা মূল্যসূচক বা সিপিআই প্রকাশিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর পরদিন বৃহস্পতিবার প্রকাশ করা হবে উৎপাদক মূল্যসূচক বা পিপিআই। এসব তথ্য থেকে মার্কিন মূল্যস্ফীতির বর্তমান প্রবণতা সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।

যদি মূল্যস্ফীতির হার প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল হয়, তাহলে ফেডারেল রিজার্ভের জন্য ভবিষ্যতে নীতি শিথিল করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সুদহার কমার প্রত্যাশা বাড়লে স্বর্ণের বাজারে আবারও ক্রয়চাপ দেখা দিতে পারে। বিপরীতে মূল্যস্ফীতির তথ্য শক্তিশালী হলে সুদহার কমানোর সম্ভাবনা পিছিয়ে যেতে পারে, যা স্বর্ণের দামে বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।

কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, দুর্বল মার্কিন কর্মসংস্থান প্রতিবেদনের পর গত সপ্তাহে স্বর্ণের দাম শক্তিশালীভাবে বেড়েছে। সেই ঊর্ধ্বগতির পর বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ এখন মুনাফা তুলে নিচ্ছেন। তবে তিনি এই পতনকে বাজারের মৌলিক প্রবণতায় বড় পরিবর্তনের সংকেত হিসেবে দেখছেন না। তার মতে, কাছাকাছি সময়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৩০০ ডলারের ওপরে স্বর্ণের দাম শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে পারে।

স্বর্ণের বাজারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হলো ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতি বিনিয়োগকারীদের নজরের কেন্দ্রে রয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে উত্তেজনা বাড়লে সাধারণত বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকতে পারেন। এর ফলে স্বর্ণের চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা থাকে।

সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে পরিস্থিতিও আন্তর্জাতিক বাজারের নজরে রয়েছে। ইরান জানিয়েছে, ওমানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে নতুন নৌপথ নির্ধারণের বিষয়ে একটি চূড়ান্ত সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছে তারা। তবে তেহরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ পুনরায় খুলে দেওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হবে।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। এই অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়লে জ্বালানি সরবরাহ, তেলের দাম এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে এর প্রভাব সরাসরি স্বর্ণের বাজারেও পড়তে পারে। বিনিয়োগকারীরা যখন অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়তে দেখেন, তখন নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের প্রতি আগ্রহ বাড়তে পারে।

অন্যদিকে সোমবার অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর বাজারেও কিছুটা দুর্বলতা দেখা গেছে। স্পট রুপার দাম শূন্য দশমিক ২ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৬৩ দশমিক ৪৫ ডলারে নেমেছে। প্লাটিনামের দাম শূন্য দশমিক ১ শতাংশ কমে ১ হাজার ৭৪২ দশমিক ৫০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। প্যালাডিয়ামের দাম তুলনামূলক বেশি কমে ১ দশমিক ১ শতাংশ হ্রাস পেয়ে প্রতি আউন্স ১ হাজার ৩৬২ দশমিক ৯৭ ডলারে নেমেছে।

স্বর্ণের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি তাই একাধিক অর্থনৈতিক সংকেতের ওপর নির্ভর করছে। একদিকে দুর্বল মার্কিন শ্রমবাজার ফেডের নীতি শিথিল করার প্রত্যাশা তৈরি করছে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি ও সুদহার নিয়ে অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের সতর্ক রাখছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে নিরাপদ সম্পদের চাহিদা।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, স্বর্ণের সাম্প্রতিক পতনকে স্বাভাবিক বাজার সমন্বয় হিসেবেই দেখা হচ্ছে। গত সপ্তাহে দ্রুত মূল্যবৃদ্ধির পর কিছু বিনিয়োগকারী লাভ তুলে নেওয়ায় সাময়িক বিক্রির চাপ তৈরি হয়েছে। তবে সামনে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি, ফেডের সুদহার নীতি এবং ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি যদি স্বর্ণের পক্ষে যায়, তাহলে আবারও দাম ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে।

অর্থাৎ সাত সপ্তাহের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সোমবার স্বর্ণের দাম কিছুটা কমলেও মূল্যবান ধাতুটির বাজারে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। বরং আগামী কয়েক দিনের মার্কিন অর্থনৈতিক তথ্য ও আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহই নির্ধারণ করতে পারে স্বর্ণের দাম আবারও রেকর্ডের দিকে এগোবে, নাকি সাময়িকভাবে আরও চাপের মুখে থাকবে।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত