প্রকাশ: ০৯ আগস্ট, ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের স্বর্ণবাজারে আবারও দাম বেড়েছে। নতুন করে প্রতি ভরি স্বর্ণালঙ্কারের দাম সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৩৭৪ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। নতুন এ মূল্য শনিবার (৮ আগস্ট) সকাল ১০টা থেকে কার্যকর হয়েছে। টানা কয়েক দিনের ব্যবধানে একাধিকবার মূল্য পরিবর্তনের ফলে স্বর্ণবাজারে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ক্রেতা, বিক্রেতা এবং ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামা এবং স্থানীয় বাজারে কাঁচা স্বর্ণের মূল্য সমন্বয়ের কারণেই ঘন ঘন দাম পরিবর্তন হচ্ছে।
বাজুসের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, শনিবার সকাল ৯টায় সংগঠনটির মূল্য নির্ধারণ ও মূল্য পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে নতুন মূল্য নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য, স্থানীয় কাঁচা স্বর্ণের দাম এবং সার্বিক বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে নতুন দর নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন মূল্যতালিকা অনুযায়ী, ভ্যাটসহ ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণালঙ্কারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৩৪ হাজার ৩৮ টাকা। এর আগে একই মানের স্বর্ণের দাম ছিল ২ লাখ ২৯ হাজার ৬৬৪ টাকা। ফলে একদিনের ব্যবধানে প্রতি ভরিতে ৪ হাজার ৩৭৪ টাকা বেড়েছে।
একইভাবে ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫৪১ টাকা। ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণ বিক্রি হবে ১ লাখ ৯১ হাজার ৯৩১ টাকায়। অন্যদিকে সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৮২২ টাকা।
তবে স্বর্ণের দাম বাড়লেও রুপার বাজারে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। বাজুসের নির্ধারিত দামে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপা বিক্রি হবে ৪ হাজার ৮৯৯ টাকায়। ২১ ক্যারেটের রুপার দাম ৪ হাজার ৬৬৬ টাকা, ১৮ ক্যারেটের রুপা ৪ হাজার ২৪ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি রুপার দাম অপরিবর্তিত থেকে ৩ হাজার ২৬৬ টাকা রাখা হয়েছে।
স্বর্ণের দামে সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিক ওঠানামা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর মাত্র দুই দিন আগে, ৬ আগস্ট, বাজুস প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম সর্বোচ্চ ৯ হাজার ৮৫৬ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছিল। এরপর ৭ আগস্ট নতুন মূল্য নির্ধারণ করে প্রতি ভরিতে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ২৬৬ টাকা কমানো হয়। সেই সমন্বয়ের একদিন পর আবারও দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে একাধিকবার মূল্য পরিবর্তনের কারণে বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের মূল্য পরিবর্তনের পাশাপাশি ডলারের বিনিময় হার, আমদানি ব্যয় এবং স্থানীয় বাজারে কাঁচা স্বর্ণের সরবরাহ পরিস্থিতিও দেশের বাজারে মূল্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব উপাদানে পরিবর্তন এলেই বাজুস নতুন মূল্য নির্ধারণ করে থাকে।
রাজধানীর কয়েকটি জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়কর্মীরা জানান, ঘন ঘন মূল্য পরিবর্তনের কারণে অনেক ক্রেতা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন। কেউ কেউ দাম আরও বাড়তে পারে এমন আশঙ্কায় দ্রুত কিনছেন, আবার অনেকে ভবিষ্যতে দাম কমার অপেক্ষায় রয়েছেন। ফলে বিক্রির ধরণেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, স্বর্ণ শুধু অলঙ্কার নয়, অনেক মানুষের কাছে এটি নিরাপদ বিনিয়োগের অন্যতম মাধ্যম। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মুদ্রাস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার সময় স্বর্ণের চাহিদা সাধারণত বেড়ে যায়। এর প্রভাব স্থানীয় বাজারেও পড়ে। ফলে আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের বাজারেও দাম সমন্বয় করা হয়।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, স্বর্ণের দামে ধারাবাহিক ওঠানামা ক্রেতাদের জন্য যেমন অনিশ্চয়তা তৈরি করে, তেমনি ব্যবসায়ীদের জন্যও মূল্য সমন্বয় একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠানের মৌসুমে স্বর্ণের দামের পরিবর্তন পারিবারিক ব্যয়েও প্রভাব ফেলে।
ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূল্য পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের অবশ্যই বাজুস নির্ধারিত মূল্যতালিকা অনুসরণ করা উচিত। একই সঙ্গে ভ্যাট, মজুরি এবং অন্যান্য চার্জের বিষয়ে ক্রেতাদের পরিষ্কার ধারণা দেওয়া প্রয়োজন। এতে অপ্রয়োজনীয় বিভ্রান্তি কমবে এবং বাজারে স্বচ্ছতা বজায় থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনার প্রবণতা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবণতার ওপর দেশের বাজারে স্বর্ণের মূল্য অনেকাংশে নির্ভর করবে। তাই সামনে মূল্য আবার বাড়বে নাকি কমবে, তা নির্ভর করবে এসব বৈশ্বিক ও স্থানীয় অর্থনৈতিক সূচকের পরিবর্তনের ওপর।
বর্তমানে যারা স্বর্ণ কেনার পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের জন্য বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং বাজুসের সর্বশেষ মূল্যতালিকা অনুযায়ী কেনাবেচা করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে স্বর্ণ কেনার সময় অনুমোদিত জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান থেকে রসিদসহ অলঙ্কার কেনার পরামর্শও দিয়েছেন তারা।