আগুন নেভাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে প্রাণ গেল বিএনপি নেতার

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৯ আগস্ট, ২০২৬
  • ২ বার

প্রকাশ: ০৯ আগস্ট, ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় চাচাতো ভাইয়ের বাড়িতে আগুন লাগার খবর পেয়ে সহায়তায় ছুটে গিয়ে নিজের ঘরের আইপিএসের বৈদ্যুতিক সংযোগ বন্ধ করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মো. জামাল উদ্দিন (৫৫) নামে স্থানীয় বিএনপির এক নেতার মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। আকস্মিক এ দুর্ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজন, প্রতিবেশী এবং রাজনৈতিক সহকর্মীরা বলছেন, অন্যের বিপদে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়েই তিনি নিজের জীবন হারিয়েছেন।

ঘটনাটি ঘটে শনিবার (৮ আগস্ট) দিবাগত মধ্যরাতে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বারখাইন ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ তৈলারদ্বীপ এলাকার মোহছেন ডিলারের বাড়িতে। নিহত মো. জামাল উদ্দিন আনোয়ারা উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি স্থানীয় রাজনীতি ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গভীর রাতে জামাল উদ্দিনের চাচাতো ভাই মো. মুজিবের বসতঘরে হঠাৎ আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকেই আগুনের উৎপত্তি হতে পারে। আগুন লাগার খবর ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের বাসিন্দারা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন এবং আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা শুরু করেন।

খবর পেয়ে মো. জামাল উদ্দিনও ঘর থেকে বের হয়ে ঘটনাস্থলে যান। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে তিনি নিজের বাড়ির আইপিএসের বৈদ্যুতিক সংযোগ বন্ধ করার উদ্যোগ নেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে অসাবধানতাবশত তিনি বিদ্যুতায়িত হয়ে পড়েন। মুহূর্তের মধ্যেই তিনি গুরুতর আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোকজন দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার উদ্যোগ নেন। তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তিনি মারা যান বলে স্থানীয়রা জানান। আকস্মিক এ মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের সদস্যরা ভেঙে পড়েন। গভীর রাতে এলাকায় শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয় এবং খবর ছড়িয়ে পড়লে স্বজন ও প্রতিবেশীরা নিহতের বাড়িতে ভিড় করেন।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বারখাইন ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নাসির উদ্দিন বলেন, চাচাতো ভাইয়ের বাড়িতে আগুন লাগার খবর শুনে জামাল উদ্দিন সেখানে ছুটে যান। পরে নিজের ঘরের আইপিএসের লাইন বন্ধ করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং অনাকাঙ্ক্ষিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।

আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জুনায়েত চৌধুরী বলেন, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে একজনের মৃত্যুর খবর পুলিশ পেয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। দুর্ঘটনার কারণ এবং সার্বিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, আগুন লাগার সময় মানুষ সাধারণত আতঙ্কিত হয়ে দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করেই আগুন নেভানোর চেষ্টা করতে গিয়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে। তাঁদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রথমেই মূল বৈদ্যুতিক সংযোগ নিরাপদভাবে বন্ধ করা এবং বিদ্যুৎ বিভাগের নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি।

জামাল উদ্দিনের মৃত্যুর ঘটনায় স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর সহকর্মীরা জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং এলাকার বিভিন্ন সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি শান্ত স্বভাবের এবং মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর জন্য পরিচিত ছিলেন বলেও অনেকেই উল্লেখ করেন।

দুর্ঘটনার পর স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা নিহতের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেন এবং তাঁদের প্রতি সমবেদনা জানান। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা বিষয়ে আরও সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আইপিএস, ইনভার্টার বা গৃহস্থালির বৈদ্যুতিক ব্যাকআপ ব্যবস্থার সংযোগে কাজ করার সময় যথাযথ নিরাপত্তাবিধি অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈদ্যুতিক সংযোগে ত্রুটি, খোলা তার, ভেজা পরিবেশ অথবা অসাবধানতা মুহূর্তের মধ্যে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। বিশেষ করে অগ্নিকাণ্ডের সময় আতঙ্কের মধ্যে বিদ্যুৎ সংযোগ স্পর্শ করা ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।

বাংলাদেশে প্রতি বছর বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনায় বহু মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘরোয়া বিদ্যুৎ ব্যবস্থার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, মানসম্মত বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার এবং শর্টসার্কিট প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করলে অনেক দুর্ঘটনাই এড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি অগ্নিকাণ্ডের সময় নিজে ঝুঁকি না নিয়ে দ্রুত ফায়ার সার্ভিস ও বিদ্যুৎ বিতরণ কর্তৃপক্ষকে খবর দেওয়ার পরামর্শও দেন তারা।

আনোয়ারার এ দুর্ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দিল, জরুরি পরিস্থিতিতে সাহায্যের আন্তরিক চেষ্টা কখনো কখনো বড় ধরনের ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। তাই জীবন রক্ষার পাশাপাশি নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। জামাল উদ্দিনের মৃত্যু শুধু তাঁর পরিবারের জন্য নয়, স্থানীয় সমাজ এবং রাজনৈতিক সহকর্মীদের কাছেও এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, ঘটনাটি দুর্ঘটনা হিসেবেই প্রাথমিকভাবে বিবেচনায় রয়েছে। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পাশাপাশি ঘটনার সব দিক পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এদিকে নিহতের পরিবার, স্বজন এবং এলাকাবাসী এমন মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত