প্রকাশ: ০৯ আগস্ট, ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এবং ইউরোপীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা উয়েফার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা মতপার্থক্য আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এবার ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর উপদেষ্টা হিশাম খারজা অভিযোগ করেছেন, ইউরোপীয় ফুটবল মহল মূলত নিজেদের দীর্ঘদিনের আধিপত্য হারানোর আশঙ্কা থেকেই ইনফান্তিনোর বিভিন্ন উদ্যোগের বিরোধিতা করছে। তাঁর মতে, এশিয়া, আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য অঞ্চলের ফুটবলের উন্নয়ন ইউরোপের একচ্ছত্র প্রভাবকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে, আর সেই কারণেই বিরোধিতা আরও তীব্র হয়েছে।
সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে ফিফার মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের পরিচালক এবং মরক্কো জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার হিশাম খারজা বলেন, বর্তমান বিরোধের পেছনে শুধু প্রশাসনিক বা বাণিজ্যিক মতভেদ নয়, বরং বৈশ্বিক ফুটবলের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যাওয়ার বিষয়টিও বড় ভূমিকা রাখছে। তাঁর ভাষায়, ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থাগুলো এখন উপলব্ধি করছে যে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলও দ্রুত উন্নতি করছে এবং সেই বাস্তবতা তাদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
গত কয়েক বছরে ফিফা বিশ্বকাপসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক কাঠামো সম্প্রসারণ এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এর মধ্যে বিশ্বকাপ এবং অন্যান্য প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক স্বত্ব ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের একটি প্রস্তাবও ছিল। তবে সেই পরিকল্পনার তীব্র বিরোধিতা করে উয়েফা। ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থার দাবি ছিল, এ ধরনের পদক্ষেপ বিশ্ব ফুটবলের বিদ্যমান ভারসাম্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং ক্লাব ও আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডারে জটিলতা তৈরি করবে।
বিভিন্ন ফুটবল ফেডারেশন এবং অংশীজনের আপত্তির পর শেষ পর্যন্ত ফিফা সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসে। কিন্তু এরপরও ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক থামেনি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এমন খবর প্রকাশিত হয় যে, ফিফার নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিয়ে ইউরোপের কিছু প্রভাবশালী মহল অসন্তোষ প্রকাশ করছে এবং ইনফান্তিনোর অবস্থান দুর্বল করার চেষ্টা করছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে উয়েফার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে একই ধরনের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
এই প্রেক্ষাপটেই হিশাম খারজা বলেন, ইউরোপের মূল উদ্বেগ হলো অন্য মহাদেশগুলোর ফুটবল অবকাঠামো এবং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা দ্রুত উন্নত হচ্ছে। তাঁর মতে, অতীতে বিশ্ব ফুটবলের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ইউরোপকেন্দ্রিক ছিল। এখন সেই অবস্থায় পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে, যা অনেকের কাছে অস্বস্তিকর বলে মনে হচ্ছে।
নিজ দেশের উদাহরণ টেনে খারজা বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপে জন্ম নেওয়া এবং সেখানেই বেড়ে ওঠা অনেক দ্বৈত নাগরিকত্বধারী ফুটবলার মরক্কোর জাতীয় দলের হয়ে খেলতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তিনি মনে করেন, এই প্রবণতা শুধু মরক্কোর ক্ষেত্রেই নয়, আফ্রিকা ও এশিয়ার আরও অনেক দেশের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে। তাঁর ভাষায়, নিজের শিকড়ের দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে চাওয়ার বিষয়টি বৈশ্বিক ফুটবলের স্বাভাবিক বিকাশের অংশ।
খারজা আরও বলেন, ইউরোপ যদি ফুটবলকে সত্যিকার অর্থে বৈশ্বিক খেলা হিসেবে দেখতে চায়, তাহলে অন্যান্য অঞ্চলের অগ্রগতিকে স্বাগত জানানো উচিত। তিনি অভিযোগ করেন, কিছু ইউরোপীয় মহল কেবল নিজেদের প্রভাব ধরে রাখার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়গুলো বিবেচনা করছে। তাঁর মতে, ফুটবল কোনো একটি মহাদেশের সম্পত্তি নয়; এটি বিশ্বের সব দেশের মানুষের খেলা।
ফিফা সভাপতির এই উপদেষ্টা আরও দাবি করেন, ইনফান্তিনোর সমালোচকদের বড় অংশ ইউরোপ থেকেই আসছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন প্রতিযোগিতা, সম্প্রসারিত টুর্নামেন্ট এবং উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে অন্যান্য অঞ্চলের ফুটবল শক্তিশালী হয়ে উঠলে ইউরোপের একক প্রভাব কমে যেতে পারে—এই আশঙ্কাই তাদের অবস্থানকে প্রভাবিত করছে।
অন্যদিকে, উয়েফার দৃষ্টিভঙ্গি বরাবরই ভিন্ন। সংস্থাটি অতীতে বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যালেন্ডারের ভারসাম্য রক্ষা, খেলোয়াড়দের অতিরিক্ত চাপ কমানো এবং প্রতিযোগিতার মান বজায় রাখার বিষয়গুলোই তাদের প্রধান উদ্বেগ। তারা মনে করে, নতুন নতুন প্রতিযোগিতা বা বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের আগে ফুটবল সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, ফিফা এবং উয়েফার এই মতবিরোধ শুধু প্রশাসনিক নয়, বরং অর্থনীতি, সম্প্রচারস্বত্ব, স্পন্সরশিপ এবং বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিশ্ব ফুটবলের বাজার ক্রমেই ইউরোপের বাইরে বিস্তৃত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া, আফ্রিকা এবং উত্তর আমেরিকায় নতুন বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আয়োজনের মাধ্যমে ফুটবলের ভৌগোলিক কেন্দ্রও ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে।
বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ নির্বাচন, ক্লাব বিশ্বকাপের সম্প্রসারণ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যিক অধিকার ব্যবস্থাপনা নিয়েও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফিফা ও উয়েফার মধ্যে একাধিকবার মতপার্থক্য দেখা গেছে। ফলে দুই সংস্থার সম্পর্ক আগের তুলনায় অনেক বেশি আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, ফুটবলের জনপ্রিয়তা এবং অর্থনৈতিক পরিসর যত বাড়ছে, ততই এর প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলোও বৈশ্বিক প্রভাব ফেলছে। তাই ফিফা এবং উয়েফার মতো সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও পারস্পরিক সহযোগিতা বিশ্ব ফুটবলের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মতভেদ থাকলেও শেষ পর্যন্ত খেলাটির উন্নয়ন, প্রতিযোগিতার মান এবং সমর্থকদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়াই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
হিশাম খারজার সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই চলমান বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। তবে ফিফা ও উয়েফার এই টানাপোড়েন ভবিষ্যতে কোন দিকে মোড় নেয় এবং বৈশ্বিক ফুটবল প্রশাসনে তার কী প্রভাব পড়ে, সেটিই এখন ক্রীড়া বিশ্বের অন্যতম আলোচিত বিষয়।