প্রকাশ: ৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের দাবা অঙ্গনে একটি প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরেই ঘুরপাক খাচ্ছে—দেশ কি আবারও নতুন কোনো গ্র্যান্ডমাস্টার (জিএম) পাবে? ২০০৮ সালে এনামুল হোসেন রাজীব দেশের পঞ্চম গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার পর কেটে গেছে দীর্ঘ ১৮ বছর। এই সময়ের মধ্যে বিশ্বের বহু দেশ দাবায় নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে। বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারত যেখানে ১৮ জন গ্র্যান্ডমাস্টার থেকে এখন ৮৯ জনের দেশে পরিণত হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ এখনো নতুন কোনো জিএমের অপেক্ষায়।
তবে এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার মাঝেও আশার আলো দেখাচ্ছেন তিন তরুণ দাবাড়ু। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন আন্তর্জাতিক মাস্টার (আইএম) ফাহাদ রহমান। তাঁর পেছনেই রয়েছেন দেশের সর্বকনিষ্ঠ আইএম মনন রেজা। আর প্রয়াত গ্র্যান্ডমাস্টার জিয়াউর রহমানের স্বপ্ন বুকে ধারণ করে আন্তর্জাতিক মাস্টার হওয়ার লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছেন তাঁর ছেলে তাহসিন তাজওয়ার। তাঁদের সাফল্য-ব্যর্থতা, সংগ্রাম, আর্থিক সংকট ও মানসিক চাপ মিলিয়ে বাংলাদেশের দাবার বর্তমান বাস্তবতাই যেন ফুটে উঠছে।
দাবার আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিদের নিয়ম অনুযায়ী গ্র্যান্ডমাস্টার হতে একজন খেলোয়াড়কে তিনটি জিএম নর্ম অর্জনের পাশাপাশি নির্ধারিত ২৫০০ ইলো রেটিং স্পর্শ করতে হয়। ফাহাদ রহমান ইতোমধ্যে দুটি জিএম নর্ম অর্জন করেছেন। এখন প্রয়োজন আর মাত্র একটি নর্ম। অন্যদিকে মনন রেজার এখনো কোনো জিএম নর্ম হয়নি, যদিও তিনি বয়সের তুলনায় অসাধারণ সম্ভাবনার পরিচয় দিয়েছেন। তাহসিন তাজওয়ারের লক্ষ্য আপাতত আন্তর্জাতিক মাস্টার খেতাব অর্জন, যার জন্য প্রয়োজন ২৪০০ রেটিং।
গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের সুযোগ আগের তুলনায় বেড়েছে। জুলাই মাসজুড়ে তিনজনই দেশের বাইরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় খেলেছেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য ধরা দেয়নি কারও ভাগ্যে। বারবার লক্ষ্য ছুঁতে গিয়েও শেষ রাউন্ডে ব্যর্থ হওয়ার গল্প যেন তাঁদের সবারই অভিন্ন বাস্তবতা।
২৩ বছর বয়সী ফাহাদ রহমান বর্তমানে বাংলাদেশের ষষ্ঠ গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে। ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক মাস্টার হওয়ার পর তিনি প্রায় ২২ থেকে ২৩টি জিএম নর্ম টুর্নামেন্ট খেলেছেন। তাঁর নিজের হিসাব অনুযায়ী অন্তত ১৩টি টুর্নামেন্টে শেষ রাউন্ডে জয় বা ড্র করলেই নর্ম নিশ্চিত হতো। কিন্তু প্রতিবারই মানসিক চাপ তাঁর সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফাহাদের প্রথম জিএম নর্ম আসে ২০২৪ সালের এপ্রিলে ভিয়েতনামের হ্যানয়ে। দ্বিতীয় নর্ম অর্জন করেন ২০২৬ সালের মে মাসে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে। তবে একই সফরের আরেকটি টুর্নামেন্টে শেষ রাউন্ডে একটি জয় তাঁকে আরও আগেই নর্ম এনে দিতে পারত। সম্প্রতি কাজাখস্তানের ওসকেমেনে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতাতেও তিনি মাত্র এক পয়েন্টের জন্য তৃতীয় নর্ম হাতছাড়া করেন। ফলে তাঁর রেটিংও কিছুটা কমে গেছে।
দেশে ফিরে ফাহাদ স্বীকার করেছেন, শেষ মুহূর্তের স্নায়ুচাপই তাঁর সবচেয়ে বড় সমস্যা। তাঁর ভাষায়, সুযোগ তৈরি হলেও শেষ রাউন্ডে কাঙ্ক্ষিত ফল করতে না পারার হতাশা বারবার ফিরে আসে। তবে তিনি থেমে যেতে রাজি নন। আগামী ১৫ আগস্ট আবুধাবি মাস্টার্স, এরপর মালয়েশিয়া এবং উজবেকিস্তানে বিশ্ব দাবা অলিম্পিয়াডে অংশ নিয়ে সেই অধরা তৃতীয় নর্ম অর্জনের লক্ষ্য নিয়েই প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছেন।
অন্যদিকে মাত্র ১৬ বছর বয়সী মনন রেজা ইতোমধ্যেই দেশের দাবা ইতিহাসে নিজের নাম লিখিয়েছেন। ২০২৪ সালের অক্টোবরে মাত্র ১৪ বছর ৩ মাস বয়সে আন্তর্জাতিক মাস্টার হয়ে তিনি বাংলাদেশের সর্বকনিষ্ঠ আইএম হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেন। তবে আইএম হওয়ার পরও প্রথম জিএম নর্মের অপেক্ষা কাটেনি।
এসএসসি পরীক্ষার কারণে কয়েক মাস প্রতিযোগিতামূলক দাবা থেকে দূরে থাকতে হয়েছিল তাঁকে। এরপর দীর্ঘ দুই মাসের জন্য হাঙ্গেরি সফরে গিয়ে টানা পাঁচটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশ নেন। সেখানে একটি টুর্নামেন্টে শেষ রাউন্ডে জয় পেলেই প্রথম জিএম নর্ম নিশ্চিত হতো। কিন্তু স্লোভাকিয়ার এক গ্র্যান্ডমাস্টারের কাছে হেরে সেই সুযোগ হারান। আরেকটি টুর্নামেন্টে আধা পয়েন্টের জন্য নর্ম মিস করলেও চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
মননের বিশ্বাস, এসব ব্যর্থতা তাঁকে আরও শক্তিশালী করবে। তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়মিত খেলতে পারলে এবং অভিজ্ঞতা বাড়লে গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার স্বপ্ন একদিন বাস্তবে রূপ নেবে।
বাংলাদেশের দাবার আরেকটি আবেগঘন নাম তাহসিন তাজওয়ার। প্রয়াত গ্র্যান্ডমাস্টার জিয়াউর রহমানের ছেলে হিসেবে তাঁর প্রতি প্রত্যাশাও অনেক বেশি। বাবার মৃত্যুর পর মানসিক ধাক্কা এবং পড়াশোনার কারণে দীর্ঘ বিরতি কাটিয়ে বর্তমানে সার্বিয়ায় টানা সাতটি টুর্নামেন্ট খেলছেন তিনি। দ্বিতীয় প্রতিযোগিতায় যুগ্ম রানারআপ হয়ে পুরস্কারও জিতেছেন। তবে সামগ্রিকভাবে রেটিংয়ে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। সার্বিয়ায় যাওয়ার সময় তাঁর রেটিং ছিল ২৩৫১, যা পরে ২৩০০-এর নিচে নেমে আসে।
তাহসিনের মতে, দীর্ঘ বিরতির প্রভাব কাটিয়ে উঠতে সময় লাগছে। তিনি এখনো আশাবাদী যে চলতি বছরই প্রয়োজনীয় রেটিং অর্জন করে আন্তর্জাতিক মাস্টার খেতাব নিশ্চিত করতে পারবেন। তবে তাঁর মা তাসমিন সুলতানা জানিয়েছেন, কোনো বড় স্পনসর ছাড়াই বিদেশে দীর্ঘ সফর চালিয়ে যাওয়া তাঁদের পরিবারের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের দাবায় সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর মধ্যে রয়েছে পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ, নিয়মিত আর্থিক সহায়তা এবং মানসিক প্রস্তুতির ঘাটতি। অনেক সময় একজন খেলোয়াড় পুরো টুর্নামেন্টে দারুণ খেলেও শেষ রাউন্ডের চাপ সামলাতে না পেরে কাঙ্ক্ষিত নর্ম হারিয়ে ফেলছেন। ফলে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং স্পোর্টস সাইকোলজির মতো বিষয়গুলোকেও এখন গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশনের নতুন সাধারণ সম্পাদক এবং দেশের প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার নিয়াজ মোরশেদও বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তাঁর মতে, ফাহাদ এখন গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছেন। একই সঙ্গে মনন রেজার প্রতিভা তাঁকে আরও বেশি আশাবাদী করে। তিনি জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক ওপেন টুর্নামেন্টে নিয়মিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশে আরও বেশি জিএম নর্ম টুর্নামেন্ট আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
নিয়াজ মোরশেদ বলেন, শুধু ফাহাদ বা মনন নন, তাহসিন, সাকলাইনসহ আরও কয়েকজন সম্ভাবনাময় দাবাড়ুকেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে কিছু করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় কয়েকজন খেলোয়াড় আর্থিক সুবিধা পেয়েছেন। অলিম্পিয়াড শেষে আরও বড় পরিসরে পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের দাবায় প্রতিভার অভাব নেই। প্রয়োজন শুধু ধারাবাহিক পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা, মানসিক প্রস্তুতি এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সহায়তা। প্রতিবেশী দেশগুলোর মতো নিয়মিত বিনিয়োগ ও কাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশও আবার নতুন গ্র্যান্ডমাস্টার উপহার দিতে সক্ষম হবে।
১৮ বছরের অপেক্ষা তাই এখনো শেষ হয়নি। কিন্তু ফাহাদ রহমান, মনন রেজা এবং তাহসিন তাজওয়ারদের সংগ্রাম দেখিয়ে দিচ্ছে, বাংলাদেশের দাবা থেমে নেই। তাঁদের সামনে আরও বহু টুর্নামেন্ট, বহু সুযোগ। যদি শেষ মুহূর্তের মানসিক বাধা অতিক্রম করা যায় এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত হয়, তাহলে খুব শিগগিরই হয়তো দেশের দাবাপ্রেমীরা নতুন এক গ্র্যান্ডমাস্টারকে স্বাগত জানানোর সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটি দেখতে পাবেন।