প্রকাশ: ৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ঘিরে তৈরি হওয়া সংকট আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার বড় বাণিজ্যিক পরিকল্পনা বাতিল হওয়ার পর এবার তাঁর নেতৃত্ব, সমর্থন ও পুনর্নির্বাচনের কৌশল নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে মরক্কোর রাজধানী রাবাতে ফিফার শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরি বৈঠক ডেকেছেন ইনফান্তিনো।
আগামী বছরের মার্চে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ফিফা সভাপতি নির্বাচনের আগে এই সংকট ইনফান্তিনোর অবস্থানকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। ফিফার ২১১ সদস্যদেশের সমর্থন ধরে রাখার জন্য তাঁর ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারা বিভিন্ন ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সভাপতি পদে নিজের অবস্থান শক্ত রাখতে ইনফান্তিনোর পক্ষ থেকে সদস্যদেশগুলোর কাছে সমর্থন চাওয়া হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত অল্প কয়েকটি দেশ প্রকাশ্যে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে। এমনকি তাঁর ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত সৌদি আরবও এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থনের ঘোষণা দেয়নি।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই জর্ডান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি প্রিন্স আলী বিন আল-হুসেইন ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, ফিফা সভাপতির পুনর্নির্বাচনে সমর্থন দেওয়ার বিনিময়ে জর্ডানের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সহায়তার বার্তা দেওয়া হয়েছিল। তিনি এই ঘটনাকে সরাসরি ‘ব্ল্যাকমেল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে প্রিন্স আলী বলেন, তাঁরা অতীতেও ইনফান্তিনোকে সমর্থন করেননি এবং ভবিষ্যতেও করবেন না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো ফুটবল সংস্থার ওপর চাপ প্রয়োগ করে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।
জর্ডান ফুটবলপ্রধান আরও অভিযোগ করেন, গত ডিসেম্বরে কাতারে অনুষ্ঠিত ফিফা আরব কাপে রানার্সআপ হওয়ার পরও জর্ডান দল তাদের প্রাপ্য অর্থ পুরোপুরি পায়নি। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাওয়া জর্ডানের অনেক সমর্থক ভিসা জটিলতার কারণে মাঠে উপস্থিত হতে পারেননি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
প্রিন্স আলীর আরেকটি অভিযোগ হলো, বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের জন্য জর্ডানের প্রাইজমানিও যুক্তরাষ্ট্রের কর ব্যবস্থার আওতায় পড়েছে। এসব বিষয় নিয়ে অসন্তোষ থেকেই তিনি ফিফার বর্তমান নেতৃত্বের সমালোচনা করেছেন।
ইনফান্তিনোর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে ফিফার অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়ার কারণে। ফিফার গ্লোবাল ফুটবল ডেভেলপমেন্ট বিভাগের প্রধান ও সাবেক আর্সেনাল কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গার জানিয়েছেন, বিতর্কিত বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাতিল করা প্রয়োজন ছিল। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ওই পরিকল্পনা সম্পর্কে আগে থেকে তাঁকে জানানো হয়নি।
ফিফার মহাসচিব ম্যাটিয়াস গ্রাফস্ট্রমও কর্মীদের উদ্দেশে পাঠানো এক বার্তায় সাম্প্রতিক পরিস্থিতিকে ‘দুঃখজনক ও নিন্দনীয়’ বলে উল্লেখ করেছেন। ফিফার ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের এমন মন্তব্য সংস্থাটির নেতৃত্ব নিয়ে তৈরি হওয়া অস্বস্তিকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ফিফার বড় টুর্নামেন্টগুলোর বাণিজ্যিক স্বত্ব বিক্রির একটি পরিকল্পনা। বিশ্বকাপসহ ফিফার প্রধান প্রতিযোগিতাগুলোর বাণিজ্যিক মূল্য আরও বাড়ানোর উদ্দেশ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে পরিকল্পনাটি নিয়ে স্বচ্ছতা ও পরিচালনাগত প্রশ্ন ওঠার পর তা বাতিল করা হয়।
সমালোচকদের মতে, ফিফার মতো বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ক্রীড়া সংস্থায় এমন বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সদস্যদেশ ও অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আরও বেশি আলোচনা প্রয়োজন ছিল। পরিকল্পনাটি বাতিল হওয়ায় ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের ধরন নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এদিকে ইউরোপীয় ফুটবলের কয়েকটি দেশ ইতিমধ্যে ইনফান্তিনোর প্রতি দেওয়া সমর্থনপত্র প্রত্যাহার করেছে। ওয়েলস, ফিনল্যান্ড, সুইডেন ও সার্বিয়ার মতো উয়েফার সদস্যদেশগুলো এ বিষয়ে অবস্থান পরিবর্তন করেছে বলে জানা গেছে।
২০১৬ সালে ফিফার সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে ইনফান্তিনো সংস্থাটিতে ব্যাপক পরিবর্তনের দাবি করে আসছেন। তাঁর আমলে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা বৃদ্ধি, নতুন প্রতিযোগিতা আয়োজন এবং ফিফার আর্থিক সম্প্রসারণের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সমর্থকদের মতে, তাঁর নেতৃত্বে ফিফার আয় বেড়েছে এবং ফুটবলের বৈশ্বিক বিস্তার হয়েছে।
তবে সমালোচকদের অভিযোগ, তাঁর শাসনামলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া আরও কেন্দ্রীভূত হয়েছে। বড় বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত, সদস্যদেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এবং ফিফার প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ইনফান্তিনোর সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সদস্যদেশগুলোর আস্থা ধরে রাখা। ফিফা সভাপতি নির্বাচনে সদস্যদেশগুলোর ভোটই চূড়ান্ত ভূমিকা পালন করে। ফলে কোনো অঞ্চলের বড় অংশের সমর্থন হারালে তাঁর পুনর্নির্বাচনের পথ কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের ফুটবল ফেডারেশনগুলোর অবস্থান আগামী নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। দীর্ঘদিনের মিত্র দেশগুলোর নীরবতা এবং কিছু সদস্যদেশের অবস্থান পরিবর্তন ইনফান্তিনোর জন্য সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে এখনো তাঁর হাতে সময় রয়েছে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার। রাবাতের জরুরি বৈঠক থেকে সদস্যদেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন, অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ কমানো এবং নেতৃত্বের বিষয়ে আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবেন তিনি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ফিফার ইতিহাসে নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। কিন্তু বর্তমান সংকটের বিশেষত্ব হলো, এটি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে ঘিরে নয়; বরং ফিফার ভবিষ্যৎ পরিচালনা, স্বচ্ছতা এবং সভাপতির নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
ইনফান্তিনোর জনপ্রিয়তা ও প্রভাব এখনো অনেক শক্তিশালী। তবে আগামী নির্বাচনের আগে তাঁকে প্রমাণ করতে হবে, ফিফার সদস্যদেশগুলোর আস্থা তিনি আগের মতোই ধরে রাখতে সক্ষম। নতুবা বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষ পদে তাঁর দীর্ঘ যাত্রা বড় অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।