মায়ের শোকে নর্মদায় নেমেছিলেন গোবিন্দ, ফিরিয়ে আনেন সাধু

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬
  • ১২ বার

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা গোবিন্দ তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি নিয়ে মুখ খুলেছেন। মায়ের মৃত্যুর পর গভীর শোকে তিনি এমন এক মানসিক অবস্থার মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন, যখন জীবনকে অর্থহীন মনে হয়েছিল তাঁর কাছে। সেই সময় নর্মদা নদীর পানিতে নেমে মায়ের সঙ্গে আবার দেখা হবে—এমন বিশ্বাসে আরও সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। পরে নদীর তীরে থাকা এক সাধুর ডাকে সাড়া দিয়ে সেখান থেকে ফিরে আসেন অভিনেতা।

সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ১৯৯৬ সালের সেই ঘটনার কথা স্মরণ করেন গোবিন্দ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মায়ের মৃত্যুর পর তিনি প্রবল মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে ছিলেন। দীর্ঘদিন পর সেই স্মৃতি প্রকাশ্যে এনে তিনি জানান, ওই সময় তাঁর কাছে মনে হয়েছিল জীবনের সবকিছু যেন শেষ হয়ে গেছে।

গোবিন্দর মা নির্মলা দেবী ছিলেন শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী ও অভিনেত্রী। ১৯৯৬ সালের ১৫ জুন ৬৯ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। মায়ের সঙ্গে গোবিন্দর সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর। তাঁর অভিনয়জীবন, ব্যক্তিগত মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে মায়ের স্বপ্ন তাঁর ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল। ফলে মায়ের চলে যাওয়া তাঁর জীবনে শুধু একজন প্রিয়জনকে হারানোর ঘটনা ছিল না; এটি ছিল তাঁর ব্যক্তিগত জগতের একটি বড় ভাঙন।

মায়ের মৃত্যুর পর নর্মদা নদীর তীরে গিয়ে তিনি পানিতে নেমেছিলেন। গোবিন্দ জানান, তখন তাঁর মনে হয়েছিল, নদীর আরও গভীরে গেলে হয়তো মায়ের সঙ্গে আবার দেখা হতে পারে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে তাঁর এই স্মৃতিচারণকে জীবনের প্রতি চরম হতাশা ও শোকের একটি মুহূর্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

সাক্ষাৎকারে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, ঘটনাটি আত্মহত্যার চেষ্টা ছিল কি না। জবাবে গোবিন্দ বিষয়টিকে সরাসরি অস্বীকার করেননি। বরং মায়ের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা ও সেই সময়কার মানসিক অবস্থার কথা তুলে ধরে বলেন, মানুষের কাছে ঘটনাটি আত্মহত্যা হিসেবে মনে হতে পারে, কিন্তু তাঁর নিজের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ভিন্ন। তাঁর বিশ্বাস, জীবন শেষ হয়ে যায় না; বরং অন্য কোনো রূপে পরিবর্তিত হয়।

তবে সেই মুহূর্তে একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা তাঁর জীবনকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেয়। নদীর তীরে থাকা রাম কুণ্ডল নামের এক সাধু তাঁকে দেখতে পান এবং ডাক দেন। গোবিন্দের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি তাঁর কাছে এগিয়ে এসে জানতে চান কী হয়েছে। সেই সাধারণ প্রশ্নই যেন তাঁকে বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনে।

এরপর তিনি উপলব্ধি করেন, তিনি যে পথে এগোচ্ছেন সেটি সঠিক নয়। নিজের সন্তানদের কথা তাঁর মনে পড়ে। সন্তানদের জন্য তাঁকে বেঁচে থাকতে হবে—এই উপলব্ধিই তাঁর জীবনে নতুন মোড় এনে দেয়। গোবিন্দ জানিয়েছেন, সেই গভীর মানসিক সংকট থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে তাঁর প্রায় ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লেগেছিল।

এই ঘটনার বহু বছর পরও মায়ের স্মৃতি গোবিন্দের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে। বরং সময়ের সঙ্গে সেই স্মৃতি তাঁর জীবনদর্শনের অংশ হয়ে উঠেছে। তিনি মনে করেন, জীবনে পাওয়া খ্যাতি, অভিনয়ের সুযোগ কিংবা তারকাখ্যাতি কোনো কিছুই কেবল নিজের কৃতিত্ব নয়। এসবের পেছনে তিনি সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ ও মায়ের স্বপ্নের প্রভাব দেখতে পান।

গোবিন্দের ভাষ্যে, চলচ্চিত্র তাঁর কাছে জীবনের চূড়ান্ত সাফল্যের মাপকাঠি নয়। সিনেমা, অভিনয় কিংবা তারকাখ্যাতি তিনি সৃষ্টিকর্তার দেওয়া দায়িত্ব ও সুযোগ হিসেবে দেখেন। তাঁর কাছে বড় অর্জন ছিল মায়ের স্বপ্ন পূরণ করা এবং পরিবারের পাশে থাকা।

বিশেষ করে ২১ বছর বয়সে তাঁর ছেলে কী কী অর্জন করবে—এমন নানা স্বপ্ন তাঁর মা দেখতেন বলে জানান গোবিন্দ। মায়ের সেই প্রত্যাশাগুলো পূরণ করতে পারাকে তিনি নিজের জীবনের প্রকৃত সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করেন। তাঁর কাছে এটিই ছিল প্রকৃত ‘হিরোইজম’; পর্দায় নায়ক হিসেবে পরিচিত হওয়া নয়।

গোবিন্দর এই স্মৃতিচারণ নতুন করে সামনে এনেছে তারকাদের ব্যক্তিজীবনের আরেকটি বাস্তব দিক। পর্দায় যাঁদের হাসি, সাফল্য ও আত্মবিশ্বাস দর্শকদের মুগ্ধ করে, তাঁদের ব্যক্তিজীবনেও গভীর শোক, বিচ্ছেদ ও মানসিক সংকট থাকতে পারে। গোবিন্দর ক্ষেত্রে মায়ের মৃত্যু এমন এক আঘাত হয়ে এসেছিল, যা তাঁর জীবন ও দর্শন দুটিকেই বদলে দেয়।

তবে সেই অন্ধকার সময় থেকে ফিরে আসার গল্পটিও তাঁর বক্তব্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একটি আকস্মিক মানবিক হস্তক্ষেপ, পরিবারের কথা মনে পড়া এবং জীবনের প্রতি নতুন উপলব্ধি তাঁকে সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করে। ফলে ১৯৯৬ সালের ঘটনাটি এখন তাঁর কাছে শুধু অতীতের একটি বেদনাদায়ক স্মৃতি নয়; বরং জীবনের মূল্য ও দায়িত্ব সম্পর্কে পাওয়া একটি গভীর শিক্ষা।

এদিকে দীর্ঘ বিরতির পর আবারও বড় পর্দায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন গোবিন্দ। বর্তমানে তিনি তাঁর নতুন চলচ্চিত্র ‘রূপা’র প্রচারে ব্যস্ত। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ছবিটি তাঁর দীর্ঘ বিরতির পর অভিনয়ে ফেরার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

দীর্ঘ অভিনয়জীবনে অসংখ্য চরিত্রে দর্শকদের হাসিয়েছেন, বিনোদন দিয়েছেন এবং জনপ্রিয়তা পেয়েছেন গোবিন্দ। কিন্তু নিজের জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়ের স্মৃতি বলতে গিয়ে তিনি যে বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, সেটি হলো মায়ের ভালোবাসা ও পরিবারের প্রতি দায়িত্ব।

তাঁর কথায় স্পষ্ট, জীবনের সাফল্যকে তিনি এখন কেবল সিনেমার পর্দা, জনপ্রিয়তা কিংবা তারকাখ্যাতির হিসাব দিয়ে দেখেন না। মায়ের স্বপ্ন পূরণ করা, সন্তানদের জন্য বেঁচে থাকা এবং পরিবারের দায়িত্ব পালন করাকেই তিনি জীবনের বড় অর্জন হিসেবে দেখেন। বহু বছর আগের সেই গভীর শোক তাই শেষ পর্যন্ত তাঁর কাছে জীবনের মূল্য নতুন করে উপলব্ধি করার একটি অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত