প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিনোদনের রঙিন দুনিয়ায় আজ যার নামের দ্যুতি ছড়াচ্ছে বিশ্বজুড়ে, কমেডি কিং হিসেবে যিনি কোটি মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন, সেই কপিল শর্মার সাফল্যের পথটি কখনোই মসৃণ ছিল না। বর্তমান সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় এই কমেডিয়ান ও উপস্থাপকের সাফল্যের মুকুটে যতই গৌরবের ফলক যুক্ত থাকুক না কেন, তার শুরুর দিনগুলো ছিল চরম অনিশ্চয়তা, সংগ্রাম আর প্রত্যাখ্যাত হওয়ার বেদনায় ভরা। ভারতের কমেডি ঘরানাকে সম্পূর্ণ নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া কপিল শর্মা যে একসময় প্রতিযোগিতার মূল মঞ্চে জায়গা পাওয়ার জন্যই রীতিমতো যুদ্ধ করেছিলেন, তা হয়তো অনেকেরই অজানা। সম্প্রতি তার দীর্ঘদিনের শৈশবের বন্ধু ও সহকর্মী চন্দন প্রভাকরের একটি খোলামেলা সাক্ষাৎকারে উন্মোচিত হয়েছে কপিল শর্মার সেই ফেলে আসা সংগ্রামী জীবনের এক রোমাঞ্চকর ও চমকপ্রদ অধ্যায়, যা যেকোনো পরিশ্রমী তরুণের জন্য এক দারুণ অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠতে পারে।
ঘটনাটি ২০০৭ সালের, যখন স্টার ওয়ান চ্যানেলের পর্দায় সম্প্রচারিত হতো সেসময়ের অন্যতম সাড়া জাগানো এবং তুমুল জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ‘দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান লাফটার চ্যালেঞ্জ’-এর তৃতীয় মৌসুম। স্ট্যান্ড আপ কমেডির দুনিয়ায় নিজেদের ভাগ্য পরীক্ষা করার জন্য সেবার অডিশনে অংশ নিয়েছিলেন কপিল শর্মা, চন্দন প্রভাকর এবং রাজিব ঠাকুরের মতো তরুণেরা। আজকের দিনে কপিল শর্মা নামটি নিজেই একটি বিশাল ব্র্যান্ড এবং ‘দ্য কপিল শর্মা শো’ বিশ্বজুড়ে বিপুল খ্যাতির অধিকারী হলেও, সেই ২০০৭ সালে শোটির প্রাথমিক অডিশনেই দুই দফায় নির্মমভাবে বাদ পড়েছিলেন খোদ কপিল শর্মা। প্রথমে পাঞ্জাবের স্থানীয় অডিশনে এবং পরবর্তীতে রাজধানী দিল্লিতে এসেও প্রথম দফায় বিচারকদের মন জয় করতে ব্যর্থ হন তিনি। অথচ ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, একই অডিশনে কপিলের দুই বন্ধু চন্দন প্রভাকর ও রাজিব ঠাকুর ঠিকই প্রতিযোগিতায় টিকে যান এবং মূল পর্বে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন।

বন্ধুর এই আকস্মিক ও হতাশাজনক পরিস্থিতিতে মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে কপিল শর্মা বরং জেদ ধরেছিলেন ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য। চন্দন প্রভাকরের জবানিতে উঠে আসা সেই স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, পাঞ্জাবে বাদ পড়ার পর যখন দিল্লিতে চূড়ান্ত অডিশনের সুযোগ আসে, তখন চন্দনের নিজস্ব শুটিংয়ের তারিখ নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কপিল কিছুতেই হাল ছাড়তে নারাজ ছিলেন। তিনি চন্দনকে জোরপূর্বক রাজি করান তার সাথে দিল্লি যাওয়ার জন্য। বন্ধুদের না জানিয়ে বা পূর্বানুমতি না নিয়েই তারা সেই মুহূর্তে অডিশনের উদ্দেশ্যে উধাও হয়ে যান। দিল্লিতে পৌঁছে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে কপিল অডিশন কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করলেও চন্দন বাইরে উৎকণ্ঠার সাথে অপেক্ষা করতে থাকেন। অডিশন শেষে কপিল বেরিয়ে এসে বেশ আত্মবিশ্বাসী সুরে জানান যে তার পরিবেশনা দারুণ হয়েছে, কিন্তু তৎকালীন বিচারক বা আয়োজকদের পক্ষ থেকে তাকে কোনো ইতিবাচক সাড়া বা মূল পর্বে ফেরার ডাক দেওয়া হয়নি।
চন্দন ও রাজিব শো-এর মূল মঞ্চে পৌঁছে গেলেও নিজেদের সাফল্যের আনন্দ পুরোপুরি উপভোগ করতে পারেননি, কারণ তাদের মনে প্রতিনিয়ত কাঁটার মতো বিঁধছিল বন্ধু কপিলের প্রতি এই অন্যায়। তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে বিচারকরা আসলে অত্যন্ত প্রতিভাবান এক তরুণকে ভুলবশত ফিরিয়ে দিয়েছেন। রিহার্সালের ফাঁকে সুযোগ পেলেই তারা সহকারী পরিচালক ও প্রোডাকশন টিমের সদস্যদের বারবার অনুরোধ করতে থাকেন এই বলে যে, তারা যেন অন্তত একবারের জন্য হলেও কপিলকে সুযোগ দিয়ে দেখেন। তাদের লাগাতার জেদ আর অনুরোধের কাছে একসময় হার মানতে বাধ্য হয় শো-এর কর্তৃপক্ষ। ওয়াইল্ড কার্ড এন্ট্রির মাধ্যমে প্রতিযোগিতায় ফিরে আসার সুযোগ পান কপিল শর্মা। তবে সেই সুযোগ আদায় করতে গিয়ে বন্ধু চন্দন প্রভাকরকে এক অদ্ভুত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। আয়োজকরা সাফ জানিয়ে দেন যে কপিলকে দলে ভেড়ানোর জন্য চন্দনকে এবার অনুষ্ঠান থেকে বিদায় নিতে হবে, এবং কপিলের জন্য নিজের ব্যাগ গুছিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে হয় চন্দনকে।

এই আকস্মিক প্রত্যাবর্তনের পরই ইতিহাস রচিত হয়। ওয়াইল্ড কার্ড রাউন্ডে ওয়াইল্ড ফায়ারের মতো নিজের দুর্দান্ত কমেডি জাদু ছড়িয়ে দেন কপিল শর্মা। বিচারক থেকে শুরু করে সাধারণ দর্শক—সবার নজর কেড়ে নিয়ে একে একে সব বাধা পেরিয়ে তিনি সেই প্রতিযোগিতার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। লাফটার চ্যালেঞ্জের সেই মঞ্চ থেকে জয়ী হয়ে বের হওয়ার পর কপিল আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। অন্যদিকে, শো ছেড়ে আসার পর চন্দন প্রভাকর কিছুদিন নিজের মূল পেশা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ফিরে গেলেও অভিনয়ের নেশা তাকে বেশিক্ষণ দূরে রাখতে পারেনি। পরবর্তীতে কপিল শর্মার হাত ধরেই তিনিও আবার বিনোদন জগতে ফিরে আসেন এবং বিশ্বজুড়ে সমাদৃত ‘দ্য কপিল শর্মা শো’-এর অন্যতম প্রধান আকর্ষণে পরিণত হন। জীবনের সেই কঠিন অডিশন পর্বে বাদ পড়ার বেদনা আজ কপিল শর্মার অদম্য জেদ ও বন্ধুত্বের শক্তির কাছে ম্লান হয়ে গেছে, যা প্রমাণ করে যে সত্যিকারের প্রতিভা এবং পরিশ্রমকে কখনো বেশিদিন দমিয়ে রাখা যায় না।