প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আধুনিক ডিজিটাল যুগে কিশোর-কিশোরীদের জীবনযাত্রার সাথে প্রযুক্তির ওতপ্রোত সংযোগ যেন এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতের গভীর পর্যন্ত স্মার্টফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখা বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের দৈনন্দিন রুটিনের অংশ। ঠিক এই জায়গাতেই লাগাম টানতে উদ্যোগী হয়েছিল যুক্তরাজ্য সরকার। ১৬ ও ১৭ বছর বয়সি কিশোর-কিশোরীদের জন্য রাতের বেলা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বা ‘কারফিউ’ চালুর প্রস্তাব করেছিল তৎকালীন সরকার। কিন্তু সাম্প্রতিক এক নির্ভরযোগ্য জরিপের ফলাফল বলছে ভিন্ন কথা। সরকারের এই উচ্চাভিলাষী ও কঠোর পরিকল্পনাকে মোটেও ভালোভাবে গ্রহণ করছে না দেশের তরুণ প্রজন্ম। বিপুলসংখ্যক কিশোর-কিশোরী সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে তারা সরকারের এই প্রস্তাবিত নিয়ম কোনোভাবেই মেনে চলতে নারাজ।
গত জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এই বিশেষ সামাজিকমাধ্যম কারফিউ চালুর পরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছিল। সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সরকারের আমলে মূলত কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের কুফল থেকে বাঁচাতে এই নীতি প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রস্তাবিত এই পরিকল্পনাটি ছিল ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য প্রণীত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সার্বিক নিষেধাজ্ঞার একটি পরিপূরক ব্যবস্থা। এর আগে গত জুন মাসে স্টারমার প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্ন্যাপচ্যাট, টিকটক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকের মতো জনপ্রিয় সব প্ল্যাটফর্মের ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। সরকারের তরফ থেকে পরিকল্পনা করা হয়েছিল যে ১৬ ও ১৭ বছর বয়সিদের সমস্ত সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে ডিফল্ট বা স্বয়ংক্রিয় সেটিং হিসেবে রাতের বেলা একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা সক্রিয় থাকবে। নিয়ম অনুযায়ী মধ্যরাত থেকে শুরু করে ভোর ৬টা পর্যন্ত এই বয়সিরা এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে পারবে না। তবে ব্যবহারকারীদের জন্য এটি বাধ্যতামূলক না রেখে একটি অপশন রাখা হয়েছিল যে, তারা চাইলেই এই বিধিনিষেধের সুবিধাটি বন্ধ করে দিতে পারবে।

সম্প্রতি বিখ্যাত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সেন্সাসওয়াইডের পরিচালনা করা একটি বিস্তারিত জরিপে এই সরকারি প্রস্তাবের বাস্তব চিত্র চরমভাবে ফুটে উঠেছে। জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে যে, ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সি কিশোর-কিশোরীদের প্রায় ৮৫ শতাংশই এই ধরনের কোনো নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে বাতিল করার জোরালো দাবি জানিয়েছে। তরুণ প্রজন্মের স্পষ্ট অভিমত হলো, রাতের বেলা তাদের যোগাযোগ ও বিনোদনের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার কোনো অধিকার রাষ্ট্রের নেই। জরিপে অংশ নেওয়া কিশোর-কিশোরীদের প্রায় অর্ধেক অংশ জানিয়েছে যে, বন্ধুবান্ধব এবং পরিবার বা আত্মীয়স্বজনের সাথে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রক্ষা করার স্বার্থেই তারা এই ডিফল্ট ফিচারটি ইচ্ছাকৃতভাবে বন্ধ করে দেবে। অন্যদিকে, জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৩৭ শতাংশ কিশোর-কিশোরী জানিয়েছে যে, গভীর রাতে নিজেদের পছন্দমতো অনলাইন কনটেন্ট উপভোগ করার জন্য তারা যেকোনো মূল্যে এই কারফিউর আওতা থেকে বেরিয়ে আসবে।
জরিপের এই চাঞ্চল্যকর ফলাফল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে অনলাইন রেসপনসিবিলিটি নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রক বিভাগের প্রধান লিয়ান প্রোক্টর অত্যন্ত যৌক্তিক একটি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। তিনি পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন যে, কেবল ওপর থেকে একটি মনগড়া কারফিউ বা নিষেধাজ্ঞা জারি করলেই অনলাইনের ক্ষতিকর প্রভাব বা সাইবার বুলিং পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব হবে— এমন সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। তার মতে, তরুণদের ডিজিটাল আসক্তি বা অনলাইন ক্ষতি প্রতিরোধের জন্য কেবল প্রশাসনিক এই ধরনের কারফিউ যথেষ্ট কোনো সমাধান হতে পারে না, বরং এর জন্য প্রয়োজন আরও গভীর ও মনস্তাত্ত্বিক সচেতনতা। জরিপে অংশ নেওয়া ১ হাজার কিশোর-কিশোরীর মধ্যে মাত্র ২ শতাংশ এমন রয়েছে যারা স্কুল চলাকালীন রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার বা স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও দেখা থেকে স্বেচ্ছায় বিরত থাকে। এর বিপরীতে ১৮ শতাংশের বেশি কিশোর-কিশোরী নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছে যে তারা গভীর রাত ১টা বা তারও পর পর্যন্ত নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন কনটেন্ট দেখে সময় কাটায়।
পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে বর্তমান প্রশাসনের শিক্ষামন্ত্রী ব্রিজেট ফিলিপসনও নমনীয় মনোভাবের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি সম্প্রতি গণমাধ্যমে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন যে, প্রস্তাবিত এই কারফিউ ব্যবস্থার ডিফল্ট সেটিংস যদি দেশের বিপুলসংখ্যক কিশোর-কিশোরী নিজেদের ইচ্ছামতো বন্ধ করে দেয়, তবে সরকারের উচিত এর স্বেচ্ছামূলক ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন বা পরিবর্ধন আনার বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করা। সরকারের এই নীতি প্রণয়নকারীরা মূলত অস্ট্রেলিয়ার বাস্তবায়ন করা কৌশলের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। গত ডিসেম্বরে অস্ট্রেলিয়া বিশ্বজুড়ে প্রথম দেশ হিসেবে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছিল। তবে অস্ট্রেলিয়ার সেই কঠোর বিধিমালার মধ্যেও ১৬ ও ১৭ বছর বয়সিদের জন্য কোনো রাতের বেলাকার কারফিউর ব্যবস্থা রাখা হয়নি। তা সত্ত্বেও অস্ট্রেলিয়ায় চালু হওয়া ওই নিষেধাজ্ঞার সার্বিক ফলাফল এখন পর্যন্ত বেশ মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে, যা যুক্তরাজ্যের নীতিনির্ধারকদের জন্যও নতুন চিন্তার খোরাক জুগিয়েছে।

সব মিলিয়ে যুক্তরাজ্যের কিশোর-কিশোরীদের এই লাগামহীন ডিজিটাল জীবনযাত্রা এবং সরকারের নিয়ন্ত্রক প্রচেষ্টার মধ্যকার দ্বন্দ্ব এক জটিল মোড় নিয়েছে। একদিকে প্রযুক্তির অবাধ স্বাধীনতার পক্ষে তরুণদের দৃঢ় অবস্থান, অন্যদিকে তাদের ভার্চুয়াল সুরক্ষা নিশ্চিত করার সরকারের সদিচ্ছা—সব মিলিয়ে এই পরিস্থিতি এক দীর্ঘমেয়াদী বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কিশোরদের মতামতকে উপেক্ষা করে জোরপূর্বক কোনো আইন চাপিয়ে দিলে তা কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে এখন সংশয় প্রকাশ করছেন দেশের সমাজবিজ্ঞানী ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। শেষ পর্যন্ত সরকার এই অনড় অবস্থান থেকে সরে এসে কতটা ভারসাম্যপূর্ণ কোনো মধ্যপন্থা খুঁজে পায় এবং তরুণ প্রজন্ম তা কতটুকু গ্রহণ করে, এখন সেটাই দেখার অপেক্ষা।