প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানী ঢাকা সংলগ্ন সাভার ও কেরানীগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বেশ কয়েকটি বোমা বিস্ফোরণ, অস্ত্র উদ্ধার এবং নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের পেছনে একটিমাত্র উগ্রপন্থী উগ্রবাদী গোষ্ঠী জড়িত রয়েছে বলে চাঞ্চল্যকর তথ্য উদ্ঘাটন করেছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। গত বছরের ডিসেম্বরে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় আকস্মিক বিস্ফোরণের ঘটনার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই নাশকতার শৃঙ্খল ধরে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে পুলিশ ও কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বা সিটিটিসি ইউনিট দেখতে পেয়েছে যে, একে একে প্রায় এগারোটি বড় ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে একই নব্য জেএমবি চক্রের সদস্যরা সরাসরি যুক্ত রয়েছে। এই উগ্রপন্থী চক্রটি দেশে বড় ধরনের কোনো নাশকতার পরিকল্পনা নিয়ে মাঠপর্যায়ে তাদের গোপন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল এবং তাদের সেই ভয়ংকর পরিকল্পনা প্রতিহত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেশজুড়ে গোয়েন্দা নজরদারি ও সাড়াঁশি অভিযান জোরদার করেছে।
সর্বশেষ চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটেছে শিল্পাঞ্চল সাভারের সাধাপুর ও দক্ষিণ শ্যামপুর এলাকায়, যেখানে পুলিশ ও বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল যৌথ অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক ও শক্তিশালী বোমা উদ্ধার করেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে যখন সাভারের সাধাপুর এলাকার একটি মসজিদের মাঠে নীল রঙের প্লাস্টিকের ড্রামের ভেতর স্কচটেপে মোড়ানো একটি রহস্যজনক প্রেশার কুকার দেখতে পাওয়া যায়। ভবানীপুর পুলিশ ক্যাম্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপরিদর্শক ইমরান হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে এবং ঢাকা থেকে বিশেষ বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিটকে তলব করে। পরবর্তীতে বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রেশার কুকার বোমাটি নিরাপদে নিষ্ক্রিয় করেন, যা বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়ে চারপাশে ঘন ধোঁয়া ও আতঙ্কের সৃষ্টি করে। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, গভীর রাতে অজ্ঞাতপরিচয় তিন ব্যক্তি ওই প্লাস্টিকের ড্রামটি মসজিদের মাঠে ফেলে রেখে পালিয়ে গিয়েছিল, যাদের পরিচয় শনাক্ত করতে পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে।

এই ঘটনার ঠিক আগের রাতে সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুর এলাকার একটি তিনতলা বাড়িতে অত্যন্ত নাটকীয় ও সফল অভিযান পরিচালনা করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সিটিটিসি ইউনিট। হেমায়েতপুর এলাকা থেকে প্রথমে মোহাম্মদ আরিফ নামের এক সন্দেহভাজন যুবককে আটকের পর তার দেওয়া সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে দক্ষিণ শ্যামপুরের ওই বাড়ির তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে সেখান থেকে এগারোটি শক্তিশালী পাইপ বোমা বা আইইডি এবং বিপুল পরিমাণ বোমা তৈরির রাসায়নিক বারুদ, গানপাউডার, ইলেকট্রিক তার, বিয়ারিং বল, নাইট্রিক অ্যাসিড ও প্লাস্টিকের কনটেইনার জব্দ করা হয়। বাড়িটির মালিকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আব্বাস আলী পরিচয়ে গত আগস্ট মাসের শুরুর দিকে পরিবার নিয়ে থাকার কথা বলে ওই ফ্ল্যাটটি ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। এই ঘটনায় সাভার থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি নিয়মিত মামলা রুজু করা হয়েছে, যেখানে মোহাম্মদ আরিফসহ বেশ কয়েকজনকে সুনির্দিষ্টভাবে আসামি করা হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দীর্ঘ অনুসন্ধান ও খতিয়ে দেখা তথ্যে উঠে এসেছে যে, সাভারের এই সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, বরং এর সঙ্গে গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর ঘটিত দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ এলাকার আল কুরা মাদ্রাসার বিস্ফোরণের গভীর যোগসূত্র রয়েছে। কেরানীগঞ্জের ওই মাদ্রাসার একটি একতলা কক্ষ বিস্ফোরণে সম্পূর্ণ উড়ে যাওয়ার পর ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধারকৃত একটি মুঠোফোনের সূত্র ধরে তদন্তকারীরা চাঞ্চল্যকর ক্লু লাভ করেন। ওই ডিজিটাল প্রমাণের ভিত্তিতে গত পহেলা ফেব্রুয়ারি যৌথ বাহিনী যশোরের বাঘারপাড়ায় নব্য জেএমবির শীর্ষস্থানীয় এক নেতার চালকের বাসায় অভিযান চালিয়ে দশটি শক্তিশালী গ্রেনেড, তিনটি বিদেশি পিস্তল, উনিশ রাউন্ড গুলি ও বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দীর্ঘ পর্যালোচনায় দেখা গেছে যে, কেরানীগঞ্জ বিস্ফোরণ, যশোরের অস্ত্র উদ্ধার, ২১ ফেব্রুয়ারি যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী তল্লাশিচৌকিতে পুলিশের ওপর হামলা, ৭ মার্চ কুমিল্লার একটি মন্দিরে বোমা হামলা, ১২ মার্চ ফেনীতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তিকে হত্যা, ২৫ মার্চ যাত্রাবাড়ীতে পাইপ বোমা বিস্ফোরণ, ২২ জুন উত্তরার দক্ষিণখানে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ওপর হামলা, ২৪ জুলাই মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের ছাতার ভেতর বোমা উদ্ধার, ৩০ জুলাই আশুলিয়ার মুদিদোকানে প্রেশার কুকার বোমা উদ্ধার এবং সর্বশেষ সাভারের দুটিসহ মোট এগারোটি নাশকতামূলক ঘটনায় একই উগ্রপন্থী গোষ্ঠী জড়িত।

এই গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের অতীত অপরাধের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। সাভারে গ্রেপ্তার হওয়া আরিফসহ এই চক্রের মূল হোতারা এর আগেও বিভিন্ন জঙ্গি মামলার আসামি ছিল এবং ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জামিনে কিংবা অন্য কোনো উপায়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে এসে পুনরায় গোপন তৎপরতা শুরু করেছিল। কেরানীগঞ্জের বিস্ফোরণ মামলায় এ পর্যন্ত ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে শেখ আল আমিন ও অলি উল্লাহ জনির মতো দীর্ঘদিনের দাগী উগ্রপন্থীরা রয়েছে। অতীতে বিভিন্ন নাশকতার ঘটনায় অভিযুক্ত হয়ে গ্রেপ্তার হওয়া এবং পরবর্তীতে জামিনে মুক্ত হয়ে আবার একই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার এই প্রবণতা দেশের সামগ্রিক অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই উগ্রপন্থী নেটওয়ার্কের মূলোৎপাটন করতে এবং পলাতক আসামিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রেখেছে।