প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ এক নতুন ও উদ্বেগজনক মোড় নিয়েছে। সম্প্রতি ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠী সৌদি আরবের অভ্যন্তরে এবং ইয়েমেনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবস্থানে বড় ধরনের হামলার দাবি করেছে। বুধবার এক আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় হুতিদের সামরিক মুখপাত্র জানিয়েছেন, তাদের বাহিনী লোহিত সাগরে একটি সামরিক পরিবহন জাহাজ এবং ইয়েমেনের ভেতরে সৌদি আরবের সমর্থনপুষ্ট বিভিন্ন কৌশলগত অবস্থানে অত্যন্ত শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছে। এই হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ইয়েমেনের মোচা এলাকা এবং মারিব প্রদেশের তাদাউইন শিবিরকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে সৌদি সমর্থিত সেনাদের প্রধান কমান্ড সেন্টার ও অস্ত্রাগার ছিল। হুতিদের দাবি অনুযায়ী, তাদের এই অভিযান নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে এবং এতে সৌদি নাগরিকসহ কয়েক ডজন সেনা সদস্য হতাহত হয়েছেন। যদিও এই ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি কোনো নিরপেক্ষ সূত্র দ্বারা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি, তবে এই ঘোষণা পুরো অঞ্চলে নতুন করে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।
হুতি সামরিক মুখপাত্র তাদের বিবৃতিতে অত্যন্ত কঠোর সুর বজায় রেখে জানিয়েছেন যে, ইয়েমেনের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং দেশটিতে বিদেশি হস্তক্ষেপের প্রতিবাদে তাদের এই সশস্ত্র অভিযান অব্যাহত থাকবে। তারা স্পষ্টভাবে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে যে, ইয়েমেনের যেসব নাগরিক বিভ্রান্ত হয়ে শত্রুপক্ষের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে বা সৌদি আরবের হয়ে কাজ করছে, তারা যেন অবিলম্বে এই ‘দেশদ্রোহী’ কর্মকাণ্ড থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়। হুতিদের দাবি, পরিস্থিতি আরও জটিল ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করতে হবে। এই হুমকি ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ বিভক্তিকে আরও গভীর করে তোলার আশঙ্কা তৈরি করেছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা যে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তা-ই পুনরায় প্রমাণ করল। গৃহযুদ্ধের এই দীর্ঘ পথ চলায় ইয়েমেনের জনগণ আজ দিশাহারা এবং রাজনৈতিক সমাধানের পরিবর্তে সামরিক সংঘাতের এমন তীব্রতা তাদের জন্য কেবল নতুন শোক ও বিড়ম্বনাই বয়ে আনছে।

অন্যদিকে, হুতিদের এই উসকানিমূলক ঘোষণার পর ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। দেশটির প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান রাশাদ আল-আলিমি এক বৈঠকে হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে, হুতিদের এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই বিনা জবাবে ছেড়ে দেওয়া হবে না। তার মতে, হুতিদের প্রতিটি পদক্ষেপ সরকারের কঠোর নজরদারিতে রয়েছে। তবে তিনি সংঘাতের পথ পরিহার করে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ফিরে আসার জন্য হুতিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। আল-আলিমি জোর দিয়ে বলেছেন যে, অস্ত্র নামিয়ে রাখলে এবং ইয়েমেনের অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর মতো গণতান্ত্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করলে দেশের শান্তি নিশ্চিত করা সম্ভব। ইয়েমেনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সাবার মাধ্যমে এই আহ্বানের মধ্য দিয়ে সরকার শান্তি আলোচনার একটি দ্বার উন্মুক্ত রাখার ইঙ্গিত দিলেও, হুতিদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।
হুতিদের এই নতুন হামলার ঘোষণার মাত্র কয়েক দিন আগেই লোহিত সাগরের বাব আল-মানদেব প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ ‘তিহামাহ’র ওপর ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। ওই হামলায় অন্তত ছয়জন নিহত হন, যাদের মধ্যে উদ্ধারকারী দলের সদস্য এবং বিভিন্ন দেশের নাবিক রয়েছেন। ইয়েমেনের পরিবহন মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যমতে, হুতিরা প্রথমবার হামলার পর জাহাজটি যখন বিপদে পড়েছিল, তখন যাত্রীদের উদ্ধার করতে আসা উদ্ধারকারী দলের সদস্যদের ওপর দ্বিতীয়বার হামলা চালানো হয়। এই ধরনের বর্বরতা যুদ্ধের সকল নীতিকে লঙ্ঘন করে। প্রথমে সৌদি মালিকানাধীন জাহাজ হিসেবে এটি পরিচিতি পেলেও পরবর্তীতে মেরিন ট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, তানজানিয়ার পতাকাবাহী এই জাহাজটির মালিকানা মিসর ও ইয়েমেনের কয়েকটি কোম্পানির যৌথ মালিকানাধীন ছিল। উদ্ধারকারী দলের সদস্যদের ওপর পরিকল্পিত এই হামলাটি মূলত মানুষের জীবন বাঁচানোর প্রচেষ্টাকে স্তব্ধ করার এক নির্মম উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
ইয়েমেনের এই যুদ্ধ কেবল সৌদি আরব বা হুতিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি লোহিত সাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্য পথকেও হুমকির মুখে ফেলেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর এই ধরনের বারবার হামলা বিশ্ব অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হুতিদের এই ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে বাইরের শক্তিগুলোর পরোক্ষ সহায়তা থাকতে পারে, যা ইয়েমেনের সংকটকে আরও দীর্ঘায়িত করছে। সাধারণ মানুষ, যাদের কোনো যুদ্ধ বা রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক নেই, তারাই আজ এই ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার প্রধান শিকার। ঘরবাড়ি ছাড়া হওয়া, পরিবার হারানো এবং সর্বদা মৃত্যুর আতঙ্কে দিন কাটানো ইয়েমেনের জনগণের কাছে শান্তি এখন মরিচীকা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, হুতি বিদ্রোহী এবং ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর মধ্যকার এই চলমান সংঘাত কেবল সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। রাজনৈতিক সমঝোতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং বিদেশি হস্তক্ষেপমুক্ত একটি আলোচনার পরিবেশই পারে ইয়েমেনে শান্তি ফেরাতে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, প্রতিবারই কোনো না কোনো হামলার ঘোষণা শান্তি আলোচনার সব প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করে দিচ্ছে। লোহিত সাগরের নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করা এবং ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ নিরসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও বেশি সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা পালন করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, সামরিক শক্তির এই নিষ্ঠুর খেলা চলতে থাকলে ইয়েমেন আরও বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের দিকেই ধাবিত হবে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করতে পারে।