প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের উত্তর জনপদের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় স্থলবন্দর হিসেবে পরিচিত জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ উপজেলার ধানুয়া কামালপুর স্থলবন্দর বর্তমানে এক গভীর অস্তিত্ব সংকট ও স্থবিরতার মুখোমুখি হয়েছে। দীর্ঘ প্রায় তিন মাস ধরে এই গুরুত্বপূর্ণ বন্দরটির আমদানি ও রপ্তানি কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রয়েছে, যার ফলে একদিকে যেমন সরকার প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে এই বন্দরের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল প্রায় আট হাজার শ্রমিক, স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং পরিবহন শ্রমিকেরা চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। প্রতি বছর বছরের উল্লেখযোগ্য একটি দীর্ঘ সময় ধরে এই বন্দরটি সচল না থাকায় স্থানীয় অর্থনীতিতে মারাত্মক ধস নেমেছে এবং খেটে খাওয়া মানুষের জীবনযাত্রায় নেমে এসেছে চরম দুর্দশার কালোছায়া।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, গত পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দের ছুটির অজুহাতে মাত্র সাত দিনের জন্য যে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছিল, তা প্রায় তিন মাস অতিক্রান্ত হতে চললেও আজও পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে ধানুয়া কামালপুর স্থলবন্দরের পুরো চত্বরজুড়ে এখন এক সুনসান ও খাঁ-খাঁ ভাব বিরাজ করছে। বন্দরের ইয়ার্ডে অলস ও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে রয়েছে শত শত পাথর ভাঙার ভারী ক্রাশার মেশিন, যা দিয়ে একসময় মুখরিত থাকত পুরো এলাকা। ব্যবসায়ীদের তীব্র অভিযোগ রয়েছে যে, আমদানিকৃত পাথরের সঙ্গে সংযুক্ত মাটি ও বালির পরিমাণের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক বা ট্যাক্স আরোপ করা, কাস্টমসের অতিরিক্ত চার্জ, ওপারে ভারতীয় অংশের সংযোগ সড়কগুলোর দীর্ঘদিন ধরে চলা বেহাল ও শোচনীয় দশা এবং আমদানি-রপ্তানিকারকদের নিজেদের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ ব্যবসায়িক বিরোধের কারণে এই বন্দর দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা এখন অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়েছে। প্রতিটি চালানে মাত্রাতিরিক্ত লোকসান গুনতে হওয়ায় ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়েই পাথর আমদানি কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে সচেষ্ট হয়েছেন।

অন্যদিকে, কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের ভিন্ন বক্তব্য অনুযায়ী, বন্দর সচল রাখতে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে নানা ধরনের দাবিদাওয়া ও অভিযোগের কথা বলা হলেও কাস্টমস কর্তৃপক্ষ তাদের বারবার আমদানিতে ফিরে আসার জন্য উৎসাহিত করেছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা মূলত অব্যাহত লোকসানের আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি এড়ানোর জন্যই ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না। ল্যান্ড কাস্টমস স্টেশন এবং সংশ্লিষ্ট বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রায় পাঁচ মাস এবং পরবর্তী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রায় ছয় মাস ধরেই এই বন্দরের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বিভিন্ন জটিলতার কারণে সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। এমনকি চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরু থেকেই এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের কার্যক্রমের দেখা মেলেনি। এর অর্থ দাঁড়ায় যে, প্রতি বছরের প্রায় অর্ধেক সময়জুড়ে দেশের এই সম্ভাবনাময় স্থলবন্দরটি কার্যত সম্পূর্ণ অচল বা মৃতপ্রায় অবস্থায় পড়ে থাকে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক বিরাট অপূরণীয় ক্ষতি।
বন্দর এলাকায় কর্মরত পাথর ব্যবসায়ী মো. মাহফুজুল হক অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে জানান যে, আমদানিকৃত পাথরের সঙ্গে থাকা সাধারণ মাটির ওপর অযৌক্তিক শুল্ক এবং অতিরিক্ত চার্জের বোঝা না কমালে কোনোভাবেই এই বন্দর দিয়ে পুনরায় পাথর আমদানি চালু করা সম্ভব হবে না। একইভাবে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি বিকাশ দত্ত উল্লেখ করেন যে, বছরের মাত্র তিন থেকে চার মাস সীমিত আয় করে সাধারণ শ্রমিক ও কর্মচারীদের পক্ষে পুরো বারো মাস সংসার চালানো বা পরিবারের ভরণপোষণ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বছরের দীর্ঘ সময় কাজ না থাকায় শ্রমিকদের সঞ্চয় ফুরিয়ে গেছে এবং তাদের দিন কাটাতে হচ্ছে চরম অনটনে। ধানুয়া কামালপুর স্থলবন্দরের রাজস্ব কর্মকর্তা মো. আবুল হোসেন আকন্দ বর্তমান পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়ে জানান যে, সীমান্তের ওপারে ভারতীয় অংশের ভাঙা ও ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো মেরামতের কাজ ধীরগতিতে চলছে। এর পাশাপাশি লোকসানের মুখে পড়ে ব্যবসায়ীদের পারস্পরিক বনিবনা নষ্ট হওয়ায় আমদানি কার্যক্রম বর্তমানে স্থবির হয়ে আছে।

এই সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি মর্মান্তিক ও করুণ দশার শিকার হয়েছেন বন্দরের ওপর নির্ভরশীল প্রায় আট হাজার দিনমজুর ও পাথর শ্রমিক। প্রতিদিনের হাড়ভাঙা শ্রমের ওপর নির্ভর করে যাদের পরিবারের তিন বেলা খাবার জুটত, আজ কাজ হারিয়ে তারা দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। সন্তানদের লেখা পড়ার খরচ বহন করা, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনা এবং অসুস্থতার সময় ওষুধ কেনার মতো ন্যূনতম সামর্থ্যও তাদের অনেকের নেই। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন যে, প্রশাসনিক জটিলতা, পরিকাঠামো উন্নয়ন ও ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের অবসান ঘটিয়ে অবিলম্বে ধানুয়া কামালপুর স্থলবন্দরের কার্যক্রম পুনরায় চালুর জন্য সরকারের উচ্চপর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। তা না হলে এই অঞ্চলের অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে আরও বেশি বিপর্যয়ের মুখে পড়বে এবং হাজার হাজার শ্রমজীবী মানুষ স্থায়ীভাবে বেকার হয়ে পড়বে।