প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বগুড়া জেলার শেরপুর উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছর ধরে এক ভয়াবহ ও কৃত্রিম জলাবদ্ধতার শিকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন অন্তত নয়টি গ্রামের সাধারণ মানুষ। অপরিকল্পিতভাবে মিল-কারখানা স্থাপন, গুরুত্বপূর্ণ কালভার্টের মুখ বন্ধ করে দেওয়া এবং পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথগুলো জবরদখল করার ফলে সৃষ্ট এই স্থায়ী জলজটের কারণে এই জনপদের মানুষের জীবনযাত্রা সম্পূর্ণরূপে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে চলতি বর্ষা মৌসুমে টানা বর্ষণে পরিস্থিতি এতটাই চরম আকার ধারণ করেছে যে, ঘরবাড়ি, ধর্মীয় উপাসনালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার সমস্ত রাস্তাঘাট এখন সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে আছে। পানিবন্দি এই নয়টি গ্রামের প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ চরম দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন এবং এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট তাদের দৈনন্দিন স্বাভাবিক অস্তিত্বকে মারাত্মক হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, মির্জাপুর ইউনিয়নের মির্জাপুর, রামচরণমুকুন্দ, দড়িমুকুন্দ, কানাইকান্দর, রাজবাড়ী, হাতিগাড়া, আড়ংশাইল, মদনপুর এবং কৃষ্ণপুর গ্রামগুলোর বর্তমান দৃশ্যপট প্রায় একই রকম। বসতবাড়ির ভেতরে ও চারপাশে পানি জমে থাকায় অনেক পরিবার তাদের বহুযুগের পৈতৃক ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকের মাটির দেয়ালের কাঁচা ঘরবাড়িগুলো স্থায়ী জলাবদ্ধতার প্রভাবে ইতিমধ্যেই ধসে পড়েছে, আবার অনেকের ঘরগুলো যে কোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়ে আছে। পানিবন্দি অবস্থায় থাকা এসব গ্রামের কোমলমতি শিশুরা স্কুলে যাওয়া থেকে দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত রয়েছে। কৃষকদের অবস্থা আরও বেশি করুণ, কারণ গোখাদ্য সংগ্রহ করা এবং হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু নিয়ে তাদের এক অবর্ণনীয় সংকটের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এছাড়া বদ্ধ ও পচা নোংরা পানির ক্রমাগত সংস্পর্শে আসার ফলে এলাকার ঘরে ঘরে চর্মরোগসহ বিভিন্ন মারাত্মক পানিবাহিত রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যা জনস্বাস্থ্যকে এক গভীর বিপদের মুখে ফেলেছে।

কৃষিপ্রধান এই অঞ্চলে স্থায়ী এই জলাবদ্ধতার সবচেয়ে মর্মান্তিক আঘাত হেনেছে গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষিখাতে। একসময় এই নয়টি গ্রামের বিস্তীর্ণ প্রান্তরে প্রায় পাঁচ হাজার বিঘা জমিতে সোনালী রঙের বোরো ধান উৎপাদিত হতো, যার প্রতিটি বিঘা থেকে প্রায় কুড়ি থেকে পঁচিশ মণ ধান ঘরে তুলতেন কৃষকরা। অথচ গত পাঁচ বছর ধরে সেই উর্বর কৃষিজমিগুলো সম্পূর্ণ অনাবাদি ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে। স্থানীয় কৃষক ফারুক, আশাদুল ও করিমসহ ক্ষতিগ্রস্ত শতাধিক মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় যে, শুধু তাদের ষাট বিঘা জমি গত চার বছর ধরে পানির নিচে ডুবে থাকায় প্রতি বছর তাদের প্রায় পঁচিশ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। এই অঞ্চলের কৃষকরা আজ সহায়-সম্বল হারিয়ে সম্পূর্ণ দিশাহারা হয়ে পড়েছেন এবং তাদের আশঙ্কা যে, দ্রুত পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী ব্যবস্থা করা না হলে তাদের ভিটামাটি বিক্রি করে পুরোপুরি নিঃস্ব হওয়া ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর থাকবে না।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যে, এই জনদুর্ভোগের পেছনে কোনো প্রাকৃতিক কারণ নেই, বরং এটি সম্পূর্ণ মানবসৃষ্ট ও কৃত্রিম। স্থানীয় এলাকার রাস্তার দুই পাশে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা বিভিন্ন মিল-কারখানা এবং পানি চলাচলের জন্য তৈরি কালভার্টগুলোর মুখগুলো বেপরোয়াভাবে বন্ধ করে দেওয়ার ফলেই মূলত এই বিপর্যয় নেমে এসেছে। ব্র্যাক বটতলা এলাকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কালভার্টটির মুখ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই নয়টি গ্রামের অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি নিষ্কাশিত হতে না পেরে স্থায়ীভাবে আটকে গেছে। কালভার্টের ঠিক পরবর্তী অংশে প্রভাবশালীদের দ্বারা ব্যক্তিগত জমি উঁচু করে ভরাট করার কারণে পুরো এলাকার প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা পুরোপুরি পঙ্গু হয়ে পড়েছে। ভুক্তভোগী গ্রামবাসীরা গত কয়েক বছর ধরে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, কৃষি অফিসসহ প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে বহুবার ছুটে গেছেন এবং প্রতিকার চেয়ে আবেদন করেছেন, কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে কেবল বিভিন্ন মহলের আশ্বাসের বাণী ছাড়া কোনো কার্যকর ও স্থায়ী সমাধান তাঁরা পাননি।
মির্জাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহিদুল ইসলাম কালভার্ট বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং মিল-কারখানা নির্মাণের কারণে পানিপ্রবাহ স্থায়ীভাবে আটকে যাওয়ার সত্যতা অকপটে স্বীকার করে জানিয়েছেন যে, এই দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার মর্মান্তিক বিষয়টি তারা বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, খুব শীঘ্রই একটি বিশেষ সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে এই অঞ্চলে জমে থাকা পানি নিষ্কাশনের আধুনিক ও স্থায়ী ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে। এ বিষয়ে শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুজ্জামান গণমাধ্যমকে জানান যে, কালভার্টের মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলেই মূলত এলাকার সামগ্রিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ইতিমধ্যে উপজেলা প্রকৌশলী আব্দুল মজিদ এবং মির্জাপুর ইউপি চেয়ারম্যানসহ একটি প্রতিনিধি দল সরেজমিন এলাকা পরিদর্শন করেছেন। খুব দ্রুত সরকারি কোনো বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করে হলেও এই জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্ত করতে কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
বগুড়া জেলার শেরপুর উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের জনপদে বিগত প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলমান এই ভয়াবহ ও কৃত্রিম জলাবদ্ধতার সংকট কেবল কয়েকটি গ্রামের স্থানীয় সমস্যা নয়, বরং এটি অপরিকল্পিত গ্রামীণ উন্নয়ন, পরিবেশগত বিপর্যয় এবং প্রশাসনিক উদাসীনতার এক গভীর ও দীর্ঘমেয়ায়ী রূপ। মির্জাপুর, রামচরণমুকুন্দ, দড়িমুকুন্দ, কানাইকান্দর, রাজবাড়ী, হাতিগাড়া, আড়ংশাইল, মদনপুর এবং কৃষ্ণপুর—এই নয়টি গ্রামের ভৌগোলিক ও সামাজিক মানচিত্র আজ পানিবন্দি দশার কারণে সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বর্ষাকাল কিংবা শুষ্ক মৌসুম—সব ঋতুতেই এই এলাকার মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে থমকে থাকা পচা পানি, যা তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে এক অচলাবস্থার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। হাজার হাজার মানুষ বছরের পর বছর ধরে নিজ বাসগৃহে অবরুদ্ধ জীবনযাপন করছেন, যা একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক সমাজে একটি জনপদের মানুষের মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনের শামিল।
এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক হলো এর বহুমুখী আর্থসামাজিক ও মানবিক বিপর্যয়। গ্রামীণ জনপদের মানুষ সাধারণত কৃষি ও ছোটখাটো জীবিকার ওপর নির্ভর করে জীবন অতিবাহিত করেন। কিন্তু এই নয়টি গ্রামের প্রায় পাঁচ হাজার বিঘা উর্বর কৃষিজমি একটানা পাঁচ বছর ধরে পানির নিচে ডুবে থাকায় এলাকার প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি ভেঙে পড়েছে। একসময়ের সোনার ফসল ফলানো মাঠগুলো আজ মৎস্যহীন ডোবা কিংবা কচুরিপানায় ভরা জলাশয়ে পরিণত হয়েছে। কৃষকরা ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন, অনেকে পেশা বদল করতে বাধ্য হয়েছেন, আবার কেউ কেউ পৈতৃক ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি জমাচ্ছেন। অন্যদিকে, মাটির দেয়াল বা কাঁচা ঘরবাড়িগুলো বছরের পর বছর আর্দ্রতার কারণে ধসে পড়ায় গৃহহীন মানুষের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকি; শিশুদের খেলাধুলার জায়গা হারিয়ে যাওয়া এবং নোংরা পানির কারণে চর্মরোগ, ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব জনজীবনকে আরও বেশি দুর্বিষহ করে তুলেছে।

বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই মানবসৃষ্ট দুর্যোগের পেছনে মূলত দায়ী অপরিকল্পিত শিল্পায়ন এবং ব্যক্তি স্বার্থে প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহের পথ অবরুদ্ধ করা। রাস্তার দুই পাশে কোনো ধরনের পানি নিষ্কাশনের যথাযথ ড্রেনেজ ব্যবস্থা ছাড়াই একের পর এক মিল-কারখানা স্থাপন এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কর্তৃক কালভার্টের মুখ ভরাট করে ব্যক্তিগত জমি উঁচুকরণের অপচেষ্টা পুরো এলাকার প্রাকৃতিক নিকাশ ব্যবস্থাকে চিরতরে পঙ্গু করে দিয়েছে। ব্র্যাক বটতলা এলাকার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পানি নিষ্কাশনের পথগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিপাতও এই অঞ্চলগুলোর জন্য বড় ধরনের প্লাবনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে বছরের পর বছর ধরে লিখিত ও মৌখিক আবেদন জানিয়েও কোনো দৃশ্যমান সুরাহা না পাওয়ায় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। কেবল আশ্বাস এবং পরিদর্শনই যে কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান হতে পারে না, তা এই এলাকার দীর্ঘমেয়াদী ভোগান্তি প্রমাণ করে।
এই অচলাবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য অবিলম্বে একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদী প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য। প্রথমত, স্থানীয় প্রভাবশালী মহল কর্তৃক জবরদখল করা কালভার্টের মুখগুলো এবং পানি চলাচলের প্রাকৃতিক খালগুলো অবিলম্বে দখলমুক্ত করতে হবে। প্রয়োজনে বুলডোজার চালিয়ে অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়ে পানির বাধাহীন প্রবাহ নিশ্চিত করার কঠোর আইনগত পদক্ষেপ নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসন এবং তাদের অনাবাদি হয়ে পড়ে থাকা পাঁচ হাজার বিঘা জমি চাষ উপযোগী করার জন্য বিশেষ সরকারি প্রণোদনা বা কৃষি পুনর্বাসন প্রকল্প হাতে নেওয়া দরকার। তৃতীয়ত, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা উচিত, যাতে কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা রাস্তা নির্মাণের ফলে এলাকার প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়। দেশের এই প্রান্তিক ও অবহেলিত মানুষগুলোর দীর্ঘদিনের কান্না ও দুর্ভোগের অবসান ঘটিয়ে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার বিভাগকে অবিলম্বে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।