জন্ম তারিখ সংশোধনের ক্ষমতা পেল মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৪ বার
জন্ম তারিখ সংশোধনের ক্ষমতা পেল মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি সংশোধনের জটিলতায় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী নির্দেশনা প্রদান করেছে নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ। এখন থেকে অনলাইনে যাচাইযোগ্য জেএসসি, মাধ্যমিক বা সমমানের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদের ভিত্তিতে জমাকৃত জন্ম তারিখ সংশোধনের আবেদনগুলো ‘ক’ ক্যাটাগরিভুক্ত হিসেবে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে এখন থেকে একজন আবেদনকারীকে তার জন্ম তারিখ সংশোধনের জন্য কেন্দ্রীয় পর্যায়ের ওপর নির্ভর করতে হবে না, বরং সংশ্লিষ্ট মাঠ পর্যায়ের উপজেলা বা থানা নির্বাচন কর্মকর্তা, সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এবং এনআইডি উইংয়ের সংশ্লিষ্ট সহকারী পরিচালক, উপপরিচালক ও পরিচালক পর্যায়ের কর্মকর্তারা তাদের নিজ নিজ অধিক্ষেত্র থেকে সরাসরি এই আবেদনগুলো নিষ্পত্তি করতে পারবেন। নাগরিকদের দুর্ভোগ লাঘবে নির্বাচন কমিশনের এই উদ্যোগটি প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের এক অনন্য নজির হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে এনআইডি সংশোধনের সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকা হেডকোয়ার্টারে ন্যস্ত থাকার কারণে সারা দেশের হাজার হাজার মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছিলেন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে সাধারণ মানুষকে কেবল একটি ছোট ভুলের সংশোধনের জন্য ঢাকা নির্বাচন ভবনে দিনের পর দিন ভিড় করতে হতো, যা একদিকে যেমন তাদের আর্থিক ও শারীরিক কষ্টের কারণ ছিল, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় দপ্তরে অতিরিক্ত আবেদনের চাপে কাজের গতি মন্থর হয়ে পড়েছিল। নির্বাচন কমিশনের এই সাম্প্রতিক বোধোদয়ের ফলে মাঠ পর্যায়ে ক্ষমতা ন্যস্ত হওয়ায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ থেকে প্রেরিত একটি দাপ্তরিক নির্দেশনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম অবিলম্বে শুরু করার জন্য কঠোর নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
নির্দেশনায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শিক্ষা সনদের তথ্যের পাশাপাশি জন্ম তারিখ সংশোধনের আবেদনের সঙ্গে যে সকল প্রয়োজনীয় প্রমাণক বা দলিলাদি জমা দেওয়ার প্রয়োজন, সেগুলোর যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর বা এসওপি অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। বিশেষ করে গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর জারি করা প্রজ্ঞাপনে বর্ণিত নিয়মাবলী কঠোরভাবে মেনে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। এনআইডি অনুবিভাগের পরিচালক (অপারেশন্স) মো. সাইফুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, অনলাইনে নির্ভুলভাবে যাচাইযোগ্য শিক্ষা সনদের ভিত্তিতেই কেবল এই বিশেষ সুবিধাটি পাওয়া যাবে এবং আবেদন অনুমোদন বা বাতিলের ক্ষেত্রে পূর্বনির্ধারিত প্রতিটি প্রক্রিয়া ও প্রমাণাদি যাচাইয়ের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে হবে।
এই বিকেন্দ্রীভূত প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষে নির্বাচন কমিশন বেশ কিছু কঠোর নিয়মাবলীও আরোপ করেছে। কোনো আবেদন ইলেকট্রনিক মাধ্যমে অনুমোদন বা বাতিলের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অবশ্যই সিএমএস বা সেন্ট্রাল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে সুনির্দিষ্ট কারণসহ প্রয়োজনীয় নোট প্রদান করতে হবে। এছাড়া, আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাদের নিয়মিতভাবে তাদের অধীনস্থ কর্মকর্তাদের কাজের ধারা মনিটরিং করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দুর্নীতির পথ বন্ধ করতে ও কাজের মান বজায় রাখতে দ্বৈবচয়ন বা র‍্যান্ডম স্যাম্পলিং পদ্ধতিতে প্রতি মাসে প্রতিটি নিষ্পত্তিকারী কর্মকর্তার সর্বনিম্ন তিনটি আবেদনের সত্যতা ও সঠিকতা যাচাই করে নির্ধারিত ছকে প্রতিবেদন তৈরির বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। এই প্রতিবেদনগুলো সরাসরি পরিচালকের (অপারেশন্স) নিজস্ব ইন্টারনাল অ্যাকাউন্টে পাঠাতে হবে, যাতে কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে পুরো প্রক্রিয়ার ওপর কড়া নজর রাখা সম্ভব হয়।
তবে সকল আবেদন মাঠ পর্যায়ে নিষ্পত্তির সুযোগ থাকলেও কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে মহাপরিচালক বা ডিজি পর্যায়ের সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত রাখা হয়েছে। নির্দেশনায় বিশেষভাবে সতর্ক করা হয়েছে যে, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদের ভিত্তিতে জমাকৃত জন্ম তারিখ সংশোধনের যেকোনো আবেদন কেবল মহাপরিচালক পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমেই নিষ্পত্তি করতে হবে। একই সঙ্গে, জন্ম তারিখের পাশাপাশি নিজের নাম অথবা পিতা-মাতার নামের সম্পূর্ণ পরিবর্তনের মতো সংবেদনশীল আবেদনগুলোও মহাপরিচালক পর্যায়ের বিবেচনার জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, জন্ম তারিখ, নিজের নাম এবং পিতা-মাতার নাম সম্পূর্ণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কোনো আবেদনকারী একই ফিল্ডে দ্বিতীয়বার সংশোধনের কোনো সুযোগ পাবেন না। তাই আবেদনকারীদের তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
স্মরণ করা যেতে পারে যে, গত কয়েক মাস আগে জাতীয় পরিচয়পত্র সংক্রান্ত সব ধরনের সংশোধনের একক এখতিয়ার ঢাকার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মহাপরিচালকের অধীনে ন্যস্ত করার পর দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও চরম জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছিল। সেই হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন শত শত মানুষ ঢাকা নির্বাচন ভবনে ছুটে আসছিলেন, যার ফলে এক অসহনীয় অবস্থার সৃষ্টি হয়। মানুষের সেই চরম কষ্ট ও ক্ষোভের কথা বিবেচনায় নিয়ে অবশেষে কমিশন তাদের ভুল সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে এবং মাঠ পর্যায়ে সীমিত পরিসরে ক্ষমতা পুনর্বহাল করেছে। নির্বাচন কমিশনের এই প্রজ্ঞাপন জারির ফলে দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে এবং আশা করা হচ্ছে যে, এখন থেকে অত্যন্ত দ্রুত ও হয়রানিমুক্তভাবে নাগরিকরা তাদের এনআইডি সংক্রান্ত ছোটখাটো ভুলগুলো সংশোধন করতে সক্ষম হবেন। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর অর্পিত এই গুরুদায়িত্ব তারা কতটা পেশাদারিত্বের সঙ্গে পালন করতে পারেন, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত