কবরস্থানের জমি নিয়ে বিরোধে নেত্রকোনায় সংঘর্ষ, আহত ৫৬

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ১২ বার
কবরস্থানের জমি নিয়ে বিরোধে নেত্রকোনায় সংঘর্ষ, আহত ৫৬

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নেত্রকোনার কলমাকান্দায় কবরস্থানের জমির মালিকানা ও ওয়াক্ফ সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধকে কেন্দ্র করে দুই গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার সকালে উপজেলার রংছাতী ইউনিয়নের আমগড়া এলাকায় সংঘটিত এ ঘটনায় অন্তত ৫৬ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে কয়েকজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র পাঠানো হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আমগড়া ও পুলিয়া পানেশ্বরপাড়ার বাসিন্দাদের মধ্যে একটি কবরস্থানের জমির মালিকানা এবং ওই জমি ওয়াক্ফ সম্পত্তি কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। বিরোধপূর্ণ ওই কবরস্থান দুই গ্রামের মানুষের জন্যই দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। দুই গ্রামের বাসিন্দারাই সেখানে নিজেদের মৃত স্বজনদের দাফন করে আসছেন।

দীর্ঘদিনের এই বিরোধের সঙ্গে কবরস্থানের পাশের জমিতে বাজার নির্মাণসহ আরও কিছু বিষয় যুক্ত হওয়ায় দুই পক্ষের মধ্যে আগে থেকেই উত্তেজনা ছিল। স্থানীয় পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার আলোচনা হলেও বিরোধের স্থায়ী সমাধান হয়নি বলে জানা গেছে। ফলে সামান্য কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করেও দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল।

শুক্রবার সকালে সেই উত্তেজনাই সংঘর্ষে রূপ নেয়। স্থানীয় সূত্র জানায়, দুই গ্রামের বাসিন্দারা একপর্যায়ে মুখোমুখি অবস্থানে চলে গেলে উভয় পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। পরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় হাতাহাতির পাশাপাশি ইট-পাটকেল ছোড়াছুড়ির ঘটনাও ঘটে।

রাস্তার নির্মাণকাজের জন্য সেখানে রাখা ইট-পাটকেল সংঘর্ষে ব্যবহার করা হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এতে দুই পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হন। সংঘর্ষের খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় আতঙ্ক তৈরি হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে অনেকে নিরাপদ স্থানে সরে যান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়।

পুলিশ গিয়ে দুই পক্ষকে সরিয়ে দিলে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে সংঘর্ষের পরও এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে, সে জন্য ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

কলমাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, সংঘর্ষে আহত হয়ে শুক্রবার দুপুর ১টা পর্যন্ত মোট ৫৬ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। আহতদের বিভিন্ন ধরনের আঘাত নিয়ে হাসপাতালে আসতে দেখা যায়। তাদের মধ্যে ছয়জনের অবস্থা বিবেচনায় উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হওয়ায় অন্যত্র রেফার করা হয়েছে।

একটি কবরস্থানকে ঘিরে দুই গ্রামের মানুষের মধ্যে এমন সংঘর্ষের ঘটনায় স্থানীয় পর্যায়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ কবরস্থান সাধারণত কোনো একটি পরিবারের নয়, বরং একটি এলাকার মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি স্থান। সেখানে মৃত স্বজনদের দাফন করা হয় এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একটি নির্দিষ্ট এলাকার মানুষ সেটিকে ব্যবহার করে থাকে। ফলে কবরস্থানের জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে তা সহজেই আবেগ ও সামাজিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আমগড়া ও পুলিয়া পানেশ্বরপাড়ার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে একই কবরস্থান ব্যবহার করে আসছেন। কে কোন জমির মালিক এবং কবরস্থানের জমির আইনগত অবস্থান কী—এসব প্রশ্ন নিয়ে বিরোধ ধীরে ধীরে জটিল হয়েছে। এর সঙ্গে বাজার নির্মাণের বিষয়টি যুক্ত হওয়ায় দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে।

এ ধরনের জমি ও ওয়াক্ফ সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে সমাধানের পাশাপাশি প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট সরকারি ও ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে জমির কাগজপত্র ও মালিকানা যাচাই করা প্রয়োজন। বিরোধপূর্ণ জমির প্রকৃত মালিকানা, ওয়াক্ফ হিসেবে নিবন্ধনের অবস্থা এবং দীর্ঘদিনের ব্যবহার—এসব বিষয় যাচাই না করে কোনো পক্ষের দাবিকে চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হলে বিরোধ আরও বাড়তে পারে।

কলমাকান্দা থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, কবরস্থানের জমির মালিকানা ও ওয়াক্ফ সম্পত্তি নিয়ে দুই গ্রামের মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ থেকেই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

পুলিশের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি শান্ত রাখতে উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ এবং এতে কারা জড়িত ছিলেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রেখেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, বিরোধটি যেন আবারও সংঘর্ষে না গড়ায়। কারণ কবরস্থানের জমি নিয়ে বিরোধটি নতুন নয়; দীর্ঘদিন ধরে দুই গ্রামের মানুষের মধ্যে এ নিয়ে মতবিরোধ চলে আসছিল। শুক্রবারের সংঘর্ষে বিপুলসংখ্যক মানুষ আহত হওয়ায় বিষয়টি এখন আরও গুরুত্ব পেয়েছে।

একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে স্থায়ী সমাধানের প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে। কবরস্থানের জমির মালিকানা ও ওয়াক্ফ সম্পত্তির বিষয়টি আইনগতভাবে নিষ্পত্তি করা গেলে ভবিষ্যতে এমন সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হতে পারে। দুই গ্রামের মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্পর্ক যাতে এই বিরোধের কারণে আরও ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়েও স্থানীয়ভাবে উদ্যোগ প্রয়োজন।

শুক্রবারের ঘটনায় কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। তবে ৫৬ জনের আহত হওয়ার ঘটনা বিরোধের তীব্রতা স্পষ্ট করে। আহতদের মধ্যে ছয়জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র পাঠানো হয়েছে। পরিস্থিতি আপাতত নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এলাকায় থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে।

স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কবরস্থানের জমির মালিকানা ও ওয়াক্ফ সম্পত্তির প্রকৃত অবস্থান যাচাই করে বিরোধের একটি স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য সমাধান করা না গেলে ভবিষ্যতে আবারও উত্তেজনা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই সংঘর্ষের পর শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ নয়, দীর্ঘদিনের মূল বিরোধের নিষ্পত্তিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত