মহড়াকে ঘিরে পারমাণবিক যুদ্ধের হুঁশিয়ারি উত্তর কোরিয়ার

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৬ বার
মহড়াকে ঘিরে পারমাণবিক যুদ্ধের হুঁশিয়ারি উত্তর কোরিয়ার

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার আসন্ন যৌথ সামরিক মহড়াকে কেন্দ্র করে কোরীয় উপদ্বীপে আবারও উত্তেজনার পারদ চড়ছে। এই মহড়াকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে উত্তর কোরিয়া। দেশটির অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের ক্রমবর্ধমান সামরিক সহযোগিতা পরিস্থিতিকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে বিশ্ব আরও ভয়াবহ পারমাণবিক সংঘাতের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

শুক্রবার উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা কেসিএনএ দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্রের বক্তব্য প্রকাশ করে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়াকে কোরীয় উপদ্বীপে সামরিক উত্তেজনা বাড়ানোর একটি পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। একই সঙ্গে পিয়ংইয়ং সতর্ক করে বলেছে, তাদের বিরুদ্ধে যেকোনো নতুন ধরনের সামরিক হুমকির জবাব দেওয়া হবে নতুন মাত্রার প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তোলার মাধ্যমে।

আগামী ১৭ থেকে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়া ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’। প্রতি বছর অনুষ্ঠিত এই মহড়াকে দুই দেশ প্রতিরক্ষামূলক প্রশিক্ষণ হিসেবে তুলে ধরলেও উত্তর কোরিয়া বরাবরই এটিকে তাদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে দেখে আসছে। ফলে মহড়ার সময় ঘনিয়ে এলেই পিয়ংইয়ংয়ের পক্ষ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা, সামরিক হুঁশিয়ারি এবং কড়া বিবৃতি দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।

এবারের মহড়ায় প্রচলিত সামরিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ড্রোন হামলা, জিপিএস ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং সাইবার হামলার মতো সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলার প্রশিক্ষণও মহড়ার অংশ হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক কর্মকর্তাদের ভাষ্য, উত্তর কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতার পরিবর্তন এবং আধুনিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়েই এবারের প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা করা হয়েছে।

মহড়ায় দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় ১৮ হাজার সেনাসদস্য অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। তাদের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থানরত প্রায় ২৮ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনাসদস্যও যুক্ত থাকবেন। এত বড় সামরিক উপস্থিতি উত্তর কোরিয়ার দৃষ্টিতে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগের বিষয়। পিয়ংইয়ংয়ের বক্তব্যে সেই উদ্বেগই এবার আরও কঠোর ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে।

উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সামরিক সহযোগিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর দাবি, তিন দেশের সামরিক সমন্বয় ক্রমেই একটি ‘পারমাণবিক জোটের’ রূপ নিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উত্তর কোরিয়াকে আরও শক্তিশালী প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে বলে মন্তব্য করা হয়েছে।

কোরীয় উপদ্বীপে সামরিক উত্তেজনার পেছনে শুধু সাম্প্রতিক মহড়াই নয়, দীর্ঘদিনের পারস্পরিক অবিশ্বাসও বড় ভূমিকা রাখছে। উত্তর কোরিয়া নিজেদের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতা ও ক্ষেপণাস্ত্র কার্যক্রমকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখে।

এই উত্তেজনার মধ্যে উত্তর কোরিয়ার সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষাও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। দেশটি সম্প্রতি পরপর দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছে। সর্বশেষ বুধবার কোরীয় উপদ্বীপের পূর্ব উপকূল থেকে সমুদ্রের দিকে একটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। এ ধরনের পরীক্ষাকে উত্তর কোরিয়া সাধারণত নিজেদের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন এবং সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের প্রতি রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার উপায় হিসেবে ব্যবহার করে।

পিয়ংইয়ংয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ এবং পারমাণবিক নীতির পরিবর্তনের কারণেই তাদের নিজেদের প্রতিরোধক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। উত্তর কোরিয়ার অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সীমা কমিয়ে এনে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। যদিও ওয়াশিংটন ও সিউল উত্তর কোরিয়ার এমন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের সামরিক মহড়াকে প্রতিরক্ষামূলক এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে তুলে ধরে।

এদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার সেনাদের অংশগ্রহণের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তারা মনে করছেন, ইউক্রেন যুদ্ধে অংশগ্রহণের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার সেনারা বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রের গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে। ড্রোন, সাইবার প্রযুক্তি এবং আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থার ব্যাপক ব্যবহারের কারণে এই যুদ্ধকে আধুনিক সামরিক কৌশলের পরীক্ষাগার হিসেবেও দেখা হচ্ছে। উত্তর কোরিয়া সেই অভিজ্ঞতা নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে কাজে লাগাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পশ্চিমা ও দক্ষিণ কোরীয় কর্মকর্তারা।

এই প্রেক্ষাপটে ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ মহড়ার গুরুত্বও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য এটি শুধু নিয়মিত সামরিক প্রশিক্ষণ নয়; বরং পরিবর্তিত যুদ্ধকৌশল, প্রযুক্তিনির্ভর হামলা এবং উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য সামরিক তৎপরতা মোকাবিলার প্রস্তুতি হিসেবেও দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়া এটিকে নিজেদের বিরুদ্ধে সামরিক চাপ বৃদ্ধির অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, এ ধরনের পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ কোরীয় উপদ্বীপে ভুল হিসাবের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। একটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা, সামরিক মহড়ায় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা কিংবা সীমান্ত এলাকায় সামান্য উত্তেজনাও দ্রুত বড় ধরনের সংকটে পরিণত হতে পারে। বিশেষ করে উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের কাছেই পারমাণবিক সক্ষমতা থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি করে।

তবে কোরীয় উপদ্বীপের বর্তমান পরিস্থিতিকে সরাসরি পারমাণবিক যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাওয়া হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। উত্তর কোরিয়ার কড়া বক্তব্য অনেক সময় সামরিক প্রতিরোধক্ষমতা প্রদর্শন এবং রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক মহড়াও তাদের ভাষ্য অনুযায়ী প্রতিরোধক্ষমতা বজায় রাখার অংশ। কিন্তু দুই পক্ষের এই অবস্থান পরস্পরের মধ্যে আস্থার সংকট আরও গভীর করছে।

উত্তর কোরিয়ার সর্বশেষ হুঁশিয়ারি তাই শুধু একটি সামরিক মহড়ার প্রতিক্রিয়া নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোরীয় উপদ্বীপের দীর্ঘস্থায়ী ভূরাজনৈতিক সংঘাত, পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতা এবং পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোর পরিবর্তন। যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সামরিক সহযোগিতা যত বাড়ছে, ততই উত্তর কোরিয়া নিজেদের বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে আরও শক্তিশালী সামরিক অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করছে।

আগামী ১৭ আগস্ট থেকে শুরু হতে যাওয়া যৌথ মহড়ার সময় উত্তর কোরিয়া কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নতুন ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা বা সামরিক প্রদর্শন হলে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে। আবার কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার সুযোগও তৈরি হতে পারে।

সব মিলিয়ে, কোরীয় উপদ্বীপে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন উত্তেজনা কমানো এবং সামরিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগের পথ খোলা রাখা। কারণ পারমাণবিক অস্ত্রের যুগে প্রতিটি সামরিক হুঁশিয়ারির প্রভাব শুধু একটি দেশের সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকে না। কোরীয় উপদ্বীপে তৈরি হওয়া যেকোনো বড় সংকটের প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে পুরো পূর্ব এশিয়া এবং শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত