প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে আগামীকাল বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট। জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে বেলা ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এই ভোট গ্রহণ করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। একাধিক প্রার্থী থাকায় এবার সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভোটগ্রহণ শেষে একই দিন ব্যালট গণনা করে ফল ঘোষণা করা হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। তফসিল অনুযায়ী ১৩ আগস্ট রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ছিল। ওই সময়ের মধ্যে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের একটি এবং ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অলি আহমদের দুটি মনোনয়নপত্র জমা পড়ে। পরে নির্ধারিত নিয়মে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। ১৮ আগস্ট বিকেল ৪টা পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সুযোগ থাকলেও কোনো প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার করেননি। ফলে নির্বাচনে দুই প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিশ্চিত হয়।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত সূচি অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে নির্বাচনকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী প্রধান নির্বাচন কমিশনার সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবেন। এরপর নির্ধারিত নিয়মে ভোটগ্রহণ শুরু হবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার হিসেবে সংসদ সদস্যরাই অংশ নেবেন। ইসির তথ্য অনুযায়ী, মোট ভোটার সংখ্যা ৩৪৯ জন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সাধারণ নির্বাচনের মতো ভোটকেন্দ্রে গিয়ে সাধারণ নাগরিকদের ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। সংবিধান ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইনের বিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ফলে বৃহস্পতিবারের ভোটে সংসদ সদস্যদের উপস্থিতি, ভোটদানের পদ্ধতি এবং ব্যালটের বৈধতা বিশেষ গুরুত্ব বহন করবে। একদিকে এটি দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে নতুন ব্যক্তিকে নির্বাচিত করার প্রক্রিয়া, অন্যদিকে সংসদীয় ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্বও।
ইসি সচিব আখতার আহমেদ মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনে সংবাদ সম্মেলনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ ও গণনার পদ্ধতি বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, ভোট শুরুর আগে সংসদ সদস্যদের ভোটদানের প্রক্রিয়া সম্পর্কে নির্বাচনকর্তা অবহিত করবেন। এরপর ব্যালট পেপার বিতরণের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ শুরু হবে।
ভোটের ব্যালট পেপারে দুটি অংশ থাকবে। একটি হবে মুড়ি অংশ এবং অন্যটি মূল ব্যালট পেপার। মুড়ি অংশে থাকবে ক্রমিক নম্বর, ভোটদানকারী সংসদ সদস্যের নাম এবং বিভক্তি নম্বর। নির্ধারিত স্থানে সংসদ সদস্যকে পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করতে হবে। এরপর তাঁকে মূল ব্যালট পেপার দেওয়া হবে।
মূল ব্যালট পেপারের ডান পাশে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নাম বাংলা বর্ণমালার আদ্যাক্ষর অনুযায়ী মুদ্রিত থাকবে। সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য নির্ধারিত স্থানে নিজের পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করে ভোট দেবেন। ভোট দেওয়ার পর ব্যালটটি নির্ধারিত ব্যালট বাক্সে জমা দিতে হবে। বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ চলবে। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই গণনা শুরু হবে।
গণনার সময় মোট কতজন সংসদ সদস্য ভোট দিয়েছেন, কতটি ব্যালট বৈধ হয়েছে, কতটি বাতিল হয়েছে এবং কতটি ব্যালট অব্যবহৃত রয়েছে—এসব তথ্য হিসাব করা হবে। এরপর দুই প্রার্থীর প্রাপ্ত বৈধ ভোট গণনা করা হবে। যে প্রার্থী বেশি ভোট পাবেন, নির্বাচনকর্তা তাঁকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিজয়ী ঘোষণা করবেন। পরে নির্বাচন কমিশনে ফলাফল পাঠানো হবে এবং নির্বাচনের ফল অনুযায়ী গেজেট প্রকাশ করা হবে।
এবারের নির্বাচনটি রাজনৈতিকভাবেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়ন এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে অলি আহমদের প্রার্থিতা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করেছে। মির্জা ফখরুল বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে সক্রিয় রয়েছেন। অন্যদিকে অলি আহমদ দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নেতা এবং ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার পেছনে সংসদের বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জাতীয় সংসদে কোন দলের কতটি আসন রয়েছে, তার ওপর সংসদ সদস্যদের ভোটের সম্ভাব্য চিত্র অনেকাংশে নির্ভর করে। সাম্প্রতিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে বিএনপি জোট সংখ্যাগরিষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা হিসাব-নিকাশ চলছে। তবে ভোটের আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণার আগে কোনো প্রার্থীর জয় নিশ্চিত ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময়সীমা। নির্বাচন কমিশন শুরু থেকেই নির্ধারিত সাংবিধানিক ও আইনগত কাঠামোর মধ্যে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছে। তফসিল ঘোষণার পর মনোনয়নপত্র জমা, যাচাই-বাছাই, প্রার্থিতা প্রত্যাহার এবং ভোটগ্রহণের দিন নির্ধারণ—প্রতিটি ধাপ নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে। ২০ আগস্টের ভোটের মাধ্যমে সেই প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাবে।
নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতির পাশাপাশি সংসদ সদস্যদের ভোটদানের বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ভোটের সময় নির্ধারিত হওয়ার কারণে বৃহস্পতিবার দুপুরের পর জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণের জন্য ব্যবহার করা হবে। ভোট শেষ হওয়ার পর সেখানেই ব্যালট গণনার কার্যক্রম শুরু হবে। এতে ভোটগ্রহণ থেকে গণনা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া একই স্থানে সম্পন্ন করার সুযোগ থাকবে।
রাষ্ট্রপতি পদ দেশের সাংবিধানিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ। রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রধান হিসেবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বের মধ্যে সাংবিধানিক বিভিন্ন বিষয়, আইন ও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কেবল একটি আনুষ্ঠানিক নির্বাচন নয়; এটি দেশের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বৃহস্পতিবারের ভোটকে ঘিরে সংসদ সদস্যদের অংশগ্রহণ এবং নির্বাচন কমিশনের ব্যবস্থাপনার ওপরও নজর থাকবে। বিশেষ করে ব্যালট পূরণ, স্বাক্ষর, ব্যালট বাক্সে জমা এবং গণনার প্রতিটি ধাপ নির্ধারিত নিয়মে সম্পন্ন করা হবে। কোনো ব্যালট বাতিল হলে তার কারণও গণনার সময় হিসাবের অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে। এ কারণে ভোটদানের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
সব প্রস্তুতি শেষে এখন অপেক্ষা বৃহস্পতিবারের ভোটের। দুপুর ২টায় ভোট শুরু হওয়ার পর সংসদ সদস্যরা তাঁদের পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে ভোট দেবেন। বিকেল ৫টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর শুরু হবে গণনা। এরপর বৈধ ভোটের সংখ্যার ভিত্তিতে বিজয়ী প্রার্থীর নাম ঘোষণা করবেন নির্বাচনকর্তা। ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হবে।
দুই প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন তাই রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি করেছে। সংসদ সদস্যদের ভোটে শেষ পর্যন্ত কে দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন, সেই সিদ্ধান্তের জন্য এখন অপেক্ষা আর মাত্র এক দিনের।