মাদকের ছোবলে থমকে যাচ্ছে উচ্চবিত্তের তরুণদের ভবিষ্যৎ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৮ বার
মাদকের ছোবলে থমকে যাচ্ছে উচ্চবিত্তের তরুণদের ভবিষ্যৎ

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কেউ প্রকৌশলী, কেউ চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী, কেউ বিদেশ থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করে দেশে ফিরেছেন। কারও সামনে ছিল উজ্জ্বল পেশাজীবনের সম্ভাবনা, কারও জন্য অপেক্ষা করছিল বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ। কিন্তু মাদকের ভয়াবহ আসক্তি অনেকের সেই স্বপ্নকে থামিয়ে দিয়েছে। অর্থ, শিক্ষা ও সামাজিক অবস্থান থাকা সত্ত্বেও মাদকের বিরুদ্ধে তারা হয়ে পড়েছেন অসহায়। পরিবারের সামর্থ্য আছে চিকিৎসা করানোর, কিন্তু প্রিয় সন্তানকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘ ও কঠিন লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসনকেন্দ্রের চিত্রে এমন বাস্তবতারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। এসব কেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের মধ্যে উচ্চবিত্ত ও প্রতিষ্ঠিত পরিবারের সন্তানদের উপস্থিতিও রয়েছে। তাদের কেউ বিদেশে পড়াশোনা করেছেন, কেউ পেশাজীবনে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, আবার কেউ ইতোমধ্যে কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। মাদক তাদের শিক্ষা, কর্মজীবন, পারিবারিক সম্পর্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যে গভীর প্রভাব ফেলেছে।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে, রাজধানীর অভিজাত কিছু নিরাময়কেন্দ্রে উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের চিকিৎসা নেওয়ার ঘটনা নতুন নয়। কোনো তরুণ বিদেশে উচ্চশিক্ষা শেষে দেশে ফিরে মাদকে জড়িয়ে পড়েছেন, আবার কেউ বিদেশে অবস্থানকালে বিভিন্ন ধরনের মাদক গ্রহণের অভ্যাস তৈরি করে দেশে ফেরার পরও সেই আসক্তি থেকে বের হতে পারেননি।

একটি নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ২৬ বছর বয়সী এক তরুণীর ঘটনাও এমন বাস্তবতার উদাহরণ। ধনাঢ্য পরিবারের এই তরুণী লন্ডন থেকে ব্যারিস্টারি পাস করে দেশে ফিরেছিলেন। আইন পেশায় যুক্ত হয়ে নিজের ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু মাদকাসক্তির কারণে সেই পথে এগোতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত পরিবার তাকে চিকিৎসার জন্য নিরাময়কেন্দ্রে ভর্তি করে।

একই ধরনের আরেকটি ঘটনায় দেখা যায়, চীনে চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়তে যাওয়া এক তরুণ সেখানে মাদকের সংস্পর্শে আসেন। ধীরে ধীরে তার আসক্তি এতটাই বেড়ে যায় যে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে মানসিক সমস্যাও দেখা দেয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতো কঠিন ও মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষার পথে থাকা সেই তরুণকে শেষ পর্যন্ত পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখেই দেশে ফিরতে হয়। দেশে ফেরার পরও আসক্তি থেকে মুক্ত হতে না পারায় তাকে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার আওতায় আনা হয়।

বিদেশে উচ্চশিক্ষা কিংবা প্রতিষ্ঠিত কর্মজীবনও যে মাদকাসক্তির ঝুঁকি থেকে কাউকে পুরোপুরি রক্ষা করতে পারে না, আরও কয়েকটি ঘটনা তার প্রমাণ দেয়। ইউরোপের একটি নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রি নেওয়া এক প্রকৌশলী দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে বসবাস করেছেন। সেখানে ফেনিডাস্ট ও কোকেনসহ বিভিন্ন মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তিনি। দীর্ঘদিন মাদক গ্রহণের ফলে তার শারীরিক অবস্থারও অবনতি ঘটে। দেশে ফিরে তাকে চিকিৎসার আওতায় নেওয়া হয়েছে।

একইভাবে গাজীপুরের ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি থেকে প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করা এক ব্যক্তি গাঁজায় আসক্ত হয়ে পড়েন। রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পদে কর্মরত থাকলেও মাদকের কারণে তার কর্মজীবন বাধাগ্রস্ত হয়। উচ্চশিক্ষা ও ভালো চাকরি থাকা সত্ত্বেও আসক্তি কীভাবে একজন মানুষের পেশাগত সক্ষমতা ধ্বংস করে দিতে পারে, তারও একটি উদাহরণ এটি।

উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের পরিবারের সন্তানদের মধ্যেও মাদকাসক্তির ঘটনা রয়েছে। ইয়াবায় আসক্ত এক তরুণের বাবা পুলিশ কর্মকর্তা এবং মা ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা। শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত পরিবারের এই সন্তানকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগে রয়েছে পুরো পরিবার। শেষ পর্যন্ত তার চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।

বিদেশে থাকা বাংলাদেশি পরিবারের সন্তানদের মধ্যেও একই ধরনের সমস্যা দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন এমন এক তরুণ মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার পর দেশে ফেরত আসেন। চিকিৎসার পর তার অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও ভবিষ্যতে আবার বিদেশে ফিরে পড়াশোনা বা জীবন গুছিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। মাদকাসক্তির প্রভাব অনেক সময় শুধু শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; শিক্ষা, চাকরি, ভ্রমণ ও সামাজিক জীবনেও তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে।

ঢাকার ধানমণ্ডি এলাকার এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তানও ইয়াবায় আসক্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর আগে একাধিকবার চিকিৎসা করানো হলেও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি তিনি। দীর্ঘদিনের মাদক গ্রহণের ফলে তার শরীরেও বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হয়েছে। বারবার চিকিৎসার পরও আসক্তিতে ফিরে যাওয়ার ঘটনা পরিবারগুলোর জন্য সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতার একটি।

রাজধানীর একটি প্রতিষ্ঠিত রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীর একমাত্র ছেলেও দীর্ঘদিনের মাদকাসক্তির কারণে গুরুতর মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। মাদকের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের সঙ্গে মানসিক জটিলতা যুক্ত হওয়ায় তার চিকিৎসা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। চিকিৎসকদের জন্যও এ ধরনের রোগীর ক্ষেত্রে শুধু মাদক গ্রহণ বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রয়োজন হয়।

উচ্চবিত্ত পরিবারের মানুষের ক্ষেত্রে মাদকাসক্তির পেছনে অর্থের সহজলভ্যতা একটি ভূমিকা রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। তবে শুধু অর্থ বা পারিবারিক সম্পদ দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যায় না। পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েন, একাকিত্ব, মানসিক চাপ, বন্ধুদের প্রভাব, সামাজিক পরিবেশ, কৌতূহল এবং সহজে মাদক পাওয়ার সুযোগ—সবকিছু মিলেই একজন তরুণ ধীরে ধীরে আসক্তির দিকে যেতে পারেন।

এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর মাদকাসক্তির পেছনে দীর্ঘদিনের একাকিত্ব ও পারিবারিক সংকট কাজ করেছে বলে জানা যায়। দীর্ঘ বিবাহিত জীবনে সন্তান না হওয়া এবং পরবর্তী সময়ে দাম্পত্য কলহের কারণে বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর গভীর নিঃসঙ্গতার মধ্যে তিনি মাদকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা থাকলেও মানসিকভাবে একজন মানুষ কতটা ভঙ্গুর হয়ে পড়তে পারেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকাসক্তিকে শুধু নৈতিক দুর্বলতা বা অপরাধ হিসেবে দেখলে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এটি অনেক ক্ষেত্রে একটি দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, যার চিকিৎসায় চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, কাউন্সেলর, পরিবার এবং পুনর্বাসনব্যবস্থার সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। চিকিৎসা শুরু করার পরও রোগীকে দীর্ঘ সময় পর্যবেক্ষণ ও সহায়তার মধ্যে রাখতে হয়।

বাংলাদেশে মাদক সমস্যার সামগ্রিক চিত্রও উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালের জুনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছিলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এক জরিপ অনুযায়ী দেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের অবৈধ মাদক ব্যবহার করছেন, যা মোট জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। তিনি আরও বলেন, নতুন সিন্থেটিক ও সেমি-সিন্থেটিক মাদকের বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে এবং বিপুলসংখ্যক তরুণ দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজনের মধ্যে রয়েছে।

সরকারি চিকিৎসা অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার কথাও সরকার স্বীকার করেছে। মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যার তুলনায় সরকারি চিকিৎসা সুবিধা এখনও পর্যাপ্ত নয়। এ পরিস্থিতিতে ঢাকার কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সাতটি বিভাগীয় শহরে ২০০ শয্যার মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কেন্দ্রে চিকিৎসার পাশাপাশি পুনর্বাসন ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে।

মাদকাসক্তির চিকিৎসায় পুনর্বাসনের গুরুত্ব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুধু কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস মাদক থেকে দূরে থাকলেই একজন মানুষ স্থায়ীভাবে সুস্থ হয়ে যাবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কৌশলপত্রেও মাদক ব্যবহার বন্ধের পর পুনরায় আসক্তিতে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং পরিবারকে রোগীর মানসিক ও আচরণগত পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এখানেই পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অনেক পরিবার সামাজিক মর্যাদা বা লোকলজ্জার ভয়ে সন্তানের মাদকাসক্তির বিষয়টি গোপন রাখে। ফলে চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হয়। অথচ যত দ্রুত সমস্যা শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করা যায়, ততই পুনরুদ্ধারের সুযোগ বাড়ে। একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যদেরও জানতে হয় কীভাবে রোগীর সঙ্গে আচরণ করতে হবে, কীভাবে পুনরায় মাদকে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমাতে হবে এবং কীভাবে তাকে স্বাভাবিক শিক্ষা বা কর্মজীবনে ফিরিয়ে আনা যায়।

উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের মাদকাসক্তির ঘটনাগুলো তাই শুধু কিছু বিচ্ছিন্ন পরিবারের সংকট নয়; এটি সমাজের একটি বড় বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। শিক্ষা, অর্থ ও সামাজিক মর্যাদা একজন মানুষকে অনেক সুযোগ দিতে পারে, কিন্তু মানসিক স্থিতি, সুস্থ পারিবারিক সম্পর্ক এবং নিরাপদ সামাজিক পরিবেশের বিকল্প হতে পারে না।

মাদকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রতিরোধ, চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও পুনর্বাসনকে সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। কারণ মাদকাসক্ত তরুণের পেছনে শুধু একটি পরিবার নয়, একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সময়মতো চিকিৎসা, পরিবারের সহমর্মিতা এবং সমাজের দায়িত্বশীল সহযোগিতা থাকলে সেই থেমে যাওয়া ভবিষ্যৎ আবারও নতুন পথে ফিরতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com