দুই মেট্রো প্রকল্পে ব্যয় বাড়ছে ১ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪ বার
দুই মেট্রো প্রকল্পে ব্যয় বাড়ছে ১ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে নেওয়া দুটি মেট্রোরেল প্রকল্প এখন অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধির মুখে পড়েছে। এমআরটি লাইন-১ এবং এমআরটি লাইন-৫ উত্তর প্রকল্পে সম্মিলিতভাবে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত সংশোধন অনুমোদিত হলে প্রকল্প দুটির মোট ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ২ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকায়। এর সঙ্গে নির্মাণের সময়সীমাও কয়েক বছর বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।

ডিএমটিসিএলের প্রস্তাব বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনের যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। অর্থাৎ এই বিপুল ব্যয় এখনো চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যয় বৃদ্ধির কারণ, ঠিকাদারদের দর, বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের বাস্তবতা পর্যালোচনা করছে। সরকারি সিদ্ধান্তের আগে এ বিষয়ে আরও যাচাই হওয়ার কথা রয়েছে।

এই দুই প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে সরকার ইতোমধ্যে স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়েছে। সাত সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে প্রকল্পগুলোর ব্যয় কাঠামো, নির্মাণসামগ্রীর দাম, নকশাগত পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। কমিটির পর্যবেক্ষণে ডলারের বিনিময়মূল্যের পরিবর্তন, মূল্যস্ফীতি, নতুন কর এবং বিভিন্ন নির্মাণ উপকরণের দাম বৃদ্ধিকে ব্যয় বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর পাশাপাশি প্রকল্পের বিভিন্ন প্যাকেজে ঠিকাদারদের প্রস্তাবিত দরও প্রাথমিক হিসাবের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হওয়ায় ব্যয় বৃদ্ধির চাপ তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে সরকার এই অস্বাভাবিক দর নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ দিয়ে প্রকল্পের খরচ পর্যালোচনার উদ্যোগও নেয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, কয়েকটি প্যাকেজে ঠিকাদারদের দর মূল প্রাক্কলনের তুলনায় ২৫ শতাংশ থেকে ৩০০ শতাংশেরও বেশি ছিল।

এমআরটি লাইন-১ হচ্ছে দেশের প্রথম বড় আকারের পাতাল মেট্রোরেল প্রকল্প। বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটারের এই অংশ পুরোপুরি ভূগর্ভস্থ হওয়ার কথা। অন্যদিকে নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত প্রায় ১১ দশমিক ৩৬৯ কিলোমিটার রুটের বড় অংশ উড়ালপথে নির্মাণ করা হবে। সরকারি প্রকল্প নথি অনুযায়ী, লাইন-১-এর বিমানবন্দর রুটে ১২টি এবং পূর্বাচল রুটে ৯টি স্টেশন থাকার পরিকল্পনা রয়েছে।

২০১৯ সালে অনুমোদনের সময় এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের ব্যয় ছিল প্রায় ৫২ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা। এখন সেটি প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ আগের অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ৬৮ হাজার কোটি টাকা বেশি প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ২০২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে বাড়িয়ে ২০৩৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

ব্যয়ের এই বৃদ্ধি শুধু সরকারি অর্থায়নের ওপরই চাপ বাড়াচ্ছে না, বিদেশি ঋণের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে। প্রকল্পটির অর্থায়নে জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকার ঋণ সহায়তা রয়েছে। সংশোধিত প্রস্তাব অনুযায়ী, জাইকার ঋণের পরিমাণও আগের তুলনায় বড় আকারে বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। সরকারের নিজস্ব অর্থায়নের অংশও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

লাইন-১ বাস্তবায়িত হলে ঢাকার সবচেয়ে ব্যস্ত কয়েকটি এলাকার মধ্যে দ্রুত যোগাযোগের নতুন সুযোগ তৈরি হওয়ার কথা। বিমানবন্দর, খিলক্ষেত, বাড্ডা, রামপুরা, মালিবাগ, রাজারবাগ ও কমলাপুরকে একই গণপরিবহন ব্যবস্থার আওতায় আনার ফলে যাতায়াতের সময় কমার সম্ভাবনা রয়েছে। পূর্বাচলমুখী রুটটি নতুন বাজারের সঙ্গে পূর্বাচলের যোগাযোগও সহজ করার লক্ষ্য নিয়ে পরিকল্পিত।

তবে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি সামনে আসায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—এত বিপুল অর্থ ব্যয় করে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন কতটা অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিসংগত হবে। বিশেষ করে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বৈদেশিক ঋণ, সরকারি অর্থায়ন এবং ভবিষ্যৎ ঋণ পরিশোধের চাপ বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণের দাবি উঠেছে।

অন্যদিকে এমআরটি লাইন-৫ উত্তর প্রকল্পেও প্রায় একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রুট রাজধানীর পশ্চিম ও পূর্ব অংশকে যুক্ত করবে। প্রকল্পের প্রায় ১৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ এবং ৬ দশমিক ৫০ কিলোমিটার উড়ালপথে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে ৯টি ভূগর্ভস্থ এবং ৫টি উড়াল স্টেশন থাকার কথা। সরকারি দরপত্রের তথ্যেও এই রুটের দৈর্ঘ্য, স্টেশন ও নির্মাণ কাঠামোর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

২০১৯ সালে অনুমোদনের সময় এমআরটি লাইন-৫ উত্তর প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় ৪১ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা। এখন তা প্রায় ৯৩ হাজার ১৯১ কোটি টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রকল্পটির ব্যয় বাড়ছে প্রায় ৫১ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা। একই সঙ্গে অনুমোদিত সময়সীমার চেয়ে আরও প্রায় ছয় বছর সময় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

লাইন-৫ উত্তর প্রকল্পের অর্থায়নেও জাইকার ঋণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সংশোধিত প্রস্তাব অনুযায়ী, জাইকার ঋণের পরিমাণ প্রায় ৬৮ হাজার ৯৩১ কোটি টাকায় উন্নীত হতে পারে। সরকারের নিজস্ব অর্থায়নের অংশও প্রায় দ্বিগুণ করার প্রস্তাব রয়েছে।

প্রকল্পটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে ঢাকার পশ্চিম ও পূর্ব অংশের যোগাযোগের ক্ষেত্রে। হেমায়েতপুর, আমিনবাজার, গাবতলী, দারুস সালাম, মিরপুর, কচুক্ষেত, বনানী, গুলশান, নতুন বাজার ও ভাটারার মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাকে একই মেট্রো নেটওয়ার্কে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে রাজধানীর সড়কনির্ভর যাতায়াতের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে যানজট কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে বাস্তবায়ন বিলম্বের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মেট্রোরেল নির্মাণের মতো বড় অবকাঠামো প্রকল্পে সময় বাড়লে শুধু নির্মাণ ব্যয়ই বাড়ে না, ঋণের সুদ, পরামর্শক ব্যয়, প্রশাসনিক ব্যয় এবং নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির কারণেও মোট ব্যয় আরও বাড়তে পারে। ফলে বর্তমান ব্যয় অনুমোদনের আগে ভবিষ্যৎ ব্যয়ের ঝুঁকিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

সরকারি সংস্থাগুলো অবশ্য প্রকল্প দুটি বাতিলের পথে না গিয়ে ব্যয় যৌক্তিক করার চেষ্টা করছে। চলতি বছর লাইন-৫ উত্তর প্রকল্পের বিভিন্ন প্যাকেজে দরপত্র প্রক্রিয়া এগিয়েছে এবং হেমায়েতপুর ডিপোর ভূমি উন্নয়নকাজও চলমান রয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির ২০ কিলোমিটার রুটে ১৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার পাতাল এবং ৬ দশমিক ৫০ কিলোমিটার উড়াল অংশ থাকবে।

অন্যদিকে লাইন-১-এর ক্ষেত্রেও ইউটিলিটি স্থানান্তরসহ প্রাথমিক কাজ এগিয়েছে। বিমানবন্দর থেকে নতুন বাজার ও কমলাপুরমুখী অংশে বিভিন্ন প্রস্তুতিমূলক কাজের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের ভিত্তি তৈরি করা হচ্ছে। ফলে দুই প্রকল্পই এখন এমন পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে ব্যয় পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের গতি এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক দায়—দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

মেট্রোরেল ঢাকার মানুষের কাছে শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি প্রতিদিনের যানজট, দীর্ঘ যাত্রা ও অনিশ্চিত গণপরিবহনের বিকল্প হিসেবে প্রত্যাশার প্রতীক। কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী ও ব্যবসায়ীদের জন্য দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি হলে এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুফলও বড় হতে পারে। কিন্তু সেই সুফল পেতে প্রকল্পের ব্যয় যেন অযৌক্তিকভাবে বেড়ে না যায়, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তাই এখন মূল নজর পরিকল্পনা কমিশনের যাচাই-বাছাই ও সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে। প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন না থাকলেও ব্যয়ের যৌক্তিকতা, ঠিকাদারদের দর, ঋণের শর্ত এবং সময়সীমা—সবকিছুই নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে। জনগণের অর্থ ও বৈদেশিক ঋণের সর্বোচ্চ কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করে যদি প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন করা যায়, তবে এগুলো ঢাকার যোগাযোগব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে পারে। আর ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে কাঙ্ক্ষিত গণপরিবহন সুবিধার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক দায়ও বড় হয়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত