যুদ্ধের মধ্যেই ইউক্রেনে নির্বাচনের দাবি ফেদোরভের

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩ বার
যুদ্ধের মধ্যেই ইউক্রেনে নির্বাচনের দাবি ফেদোরভের

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ চলার মধ্যেই ইউক্রেনে পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনরায় চালু করে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভ। সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সরকার থেকে বরখাস্ত হওয়া ৩৫ বছর বয়সী এই রাজনীতিক বলেছেন, যুদ্ধকে অজুহাত করে গণতন্ত্রকে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখা উচিত নয়। তাঁর এই বক্তব্য ইউক্রেনের যুদ্ধকালীন রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং জেলেনস্কির নেতৃত্বের ওপরও রাজনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

মঙ্গলবার প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় ফেদোরভ বলেন, ইউক্রেনকে এমন একটি আইনি, নিরাপদ ও বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যার মাধ্যমে যুদ্ধ চললেও পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়। তাঁর বক্তব্যের মূল যুক্তি হলো, ইউক্রেন যে গণতন্ত্র ও ইউরোপীয় মূল্যবোধ রক্ষার জন্য রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করছে, সেই গণতান্ত্রিক অধিকারই যুদ্ধের কারণে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্থগিত থাকতে পারে না।

ফেদোরভ সরাসরি প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে আক্রমণ না করলেও তাঁর বক্তব্যে বর্তমান শাসনব্যবস্থার সমালোচনা স্পষ্ট। তিনি ইউক্রেনে একটি ‘পদ্ধতিগত শাসন সংকট’ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন। একই সঙ্গে প্রশাসনের ভেতরের দুর্নীতি, ধীরগতির সংস্কার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অদক্ষতা যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলেও দাবি করেছেন। তাঁর মতে, পরিবর্তনকে ভয় না পেয়ে দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া পূর্ণমাত্রায় ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করার পর দেশটিতে সামরিক আইন জারি রয়েছে। সেই আইনি কাঠামোর অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। ২০২৪ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও যুদ্ধ ও সামরিক আইনের কারণে ভোট স্থগিত থাকে। একইভাবে সংসদ নির্বাচনও নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠিত হয়নি। ইউক্রেনের পার্লামেন্টের একটি বিশেষজ্ঞ কর্মদল চলতি বছরও সামরিক আইন চলাকালে নির্বাচন আয়োজনের অসম্ভবতার বিষয়ে ঐকমত্যের কথা জানিয়েছে।

এই বাস্তবতায় ফেদোরভের নির্বাচনের দাবি নিঃসন্দেহে একটি বড় রাজনৈতিক পদক্ষেপ। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইউক্রেনের কোনো গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এত সরাসরি যুদ্ধকালীন নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেননি। ফলে তাঁর বক্তব্যকে শুধু একটি ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে নয়, বরং যুদ্ধকালীন শাসনব্যবস্থা ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ বিতর্কের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

ফেদোরভের রাজনৈতিক উত্থানও ছিল দ্রুত। ডিজিটাল রূপান্তর ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনিক সংস্কারের জন্য তিনি ইউক্রেনের রাজনীতিতে পরিচিতি পান। পরবর্তীতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেন। চলতি বছরের শুরুতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হওয়ার পর তিনি সামরিক ব্যবস্থায় প্রযুক্তিনির্ভর পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নেন। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ছয় মাসের মধ্যে জুলাইয়ে তাঁকে পদ থেকে সরিয়ে দেন জেলেনস্কি।

ফেদোরভের অপসারণের পেছনে সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল বলে সে সময় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। বিশেষ করে সেনাপ্রধান ওলেক্সান্ডার সিরস্কির সঙ্গে তাঁর সংস্কার পরিকল্পনা, সামরিক ব্যবস্থাপনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে বিরোধ প্রকাশ্যে আসে। ফেদোরভের অভিযোগ ছিল, তাঁর বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগ সামরিক নেতৃত্বের একটি অংশের বাধার মুখে পড়েছিল।

তাঁকে বরখাস্ত করার পর ইউক্রেনের বিভিন্ন স্থানে তাঁর সমর্থনে বিক্ষোভ দেখা দেয়। তাঁর সমর্থকেরা পুনর্বহালের দাবি জানান এবং সেনাপ্রধান সিরস্কির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। পরবর্তী সময়ে জেলেনস্কি সিরস্কিকেও সরিয়ে দেন এবং সামরিক নেতৃত্বে পরিবর্তন আনেন। এর ফলে ফেদোরভের রাজনৈতিক প্রভাব এবং জনসমর্থন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।

প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর জেলেনস্কি তাঁকে সরকারের অন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। তবে ফেদোরভ প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবেই ফিরে আসতে চান বলে অবস্থান নেন। তিনি এর আগে জানিয়েছিলেন, যুদ্ধ চলাকালে তিনি জেলেনস্কির সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হতে চান না। কিন্তু এখন নির্বাচনের দাবি সামনে এনে তিনি সরকারের নীতির প্রকাশ্য সমালোচনার একটি নতুন অবস্থান তৈরি করেছেন।

ফেদোরভ অবশ্য নিজের কোনো নির্বাচনী পরিকল্পনার ঘোষণা দেননি। তিনি নিজেকে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবেও উপস্থাপন করেননি। তাঁর বক্তব্য মূলত নির্বাচন আয়োজনের জন্য একটি বাস্তব কাঠামো তৈরির আহ্বানকে কেন্দ্র করে। তবে ইউক্রেনের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাঁর জনপ্রিয়তা এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিরোধের কারণে তাঁর এই অবস্থান ভবিষ্যতে বড় রাজনৈতিক ভূমিকার দিকে যেতে পারে কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।

যুদ্ধের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের বাস্তবতা অবশ্য অত্যন্ত জটিল। ইউক্রেনের সামনের সারির বহু এলাকা এখনো রুশ হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। দেশটির লাখ লাখ নাগরিক বিদেশে অবস্থান করছেন এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ দেশের ভেতরেই বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। সেনাবাহিনীতে কর্মরত সদস্যদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা, সীমান্তের বাইরে থাকা নাগরিকদের ভোটের ব্যবস্থা করা, যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছি নিরাপদ ভোটকেন্দ্র তৈরি এবং নির্বাচনী ফলাফলের ওপর জনগণের আস্থা নিশ্চিত করা—সবই বড় চ্যালেঞ্জ।

এ ছাড়া রাশিয়ার হামলা চলমান থাকা অবস্থায় ভোটকেন্দ্র ও নির্বাচনী অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও কঠিন। একটি নির্বাচনের বৈধতা শুধু ভোটগ্রহণের ওপর নির্ভর করে না; প্রতিটি ভোটারের সমান সুযোগ, রাজনৈতিক প্রচারের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের পরিবেশ এবং ভোট গণনার স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করতে হয়। যুদ্ধের বাস্তবতায় এসব শর্ত পূরণ করা কতটা সম্ভব, সেটিই ফেদোরভের প্রস্তাবের সবচেয়ে বড় পরীক্ষার জায়গা।

ইউক্রেনের সরকারও নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা পুরোপুরি অস্বীকার করছে না। তবে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি আগে বলেছেন, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ও যুদ্ধবিরতির মতো প্রয়োজনীয় শর্ত তৈরি হওয়ার পর নির্বাচন আয়োজন করা উচিত। সরকারের যুক্তি হলো, এমন একটি নির্বাচন হওয়া দরকার যা দেশের জনগণ, রাজনৈতিক দল এবং আন্তর্জাতিক অংশীদার—সব পক্ষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য ও বৈধ বলে গ্রহণযোগ্য হবে।

ফেদোরভের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দুর্নীতির অভিযোগ। তিনি দাবি করেছেন, প্রশাসনের অভ্যন্তরে দুর্নীতি ও অদক্ষতা যুদ্ধ প্রচেষ্টার ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাঁর মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জনগণের আস্থা ধরে রাখতে প্রশাসনিক সংস্কার এবং রাজনৈতিক পরিবর্তন প্রয়োজন।

এদিকে যুদ্ধক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত। ইউক্রেন রাশিয়ার অভ্যন্তরে দূরপাল্লার ড্রোন হামলা বাড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে মস্কো ও রাশিয়ার বিভিন্ন স্থাপনায় বড় আকারের ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে। অন্যদিকে রুশ বাহিনীও ইউক্রেনের বিভিন্ন শহর ও অবকাঠামোয় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো নিশ্চিত সময়সূচি না থাকায় নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও জটিল হয়ে উঠছে।

এই বাস্তবতায় ফেদোরভের বক্তব্য ইউক্রেনের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অপেক্ষা করবে, নাকি যুদ্ধের মধ্যেই নিরাপদ ও আইনসম্মতভাবে নির্বাচনের পথ খুঁজে বের করা হবে? প্রথম অবস্থানের পক্ষে যুক্তি হলো, যুদ্ধকালীন নির্বাচন নিরাপত্তাহীনতা ও বৈষম্য তৈরি করতে পারে। দ্বিতীয় অবস্থানের যুক্তি হলো, দীর্ঘ যুদ্ধের কারণে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো অনির্দিষ্টকাল স্থবির থাকাও রাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

ফেদোরভের আহ্বানের ফলে এই বিতর্ক এখন ইউক্রেনের রাজনৈতিক অঙ্গনে আরও প্রকাশ্য হয়েছে। বিশেষ করে তাঁর সাম্প্রতিক বরখাস্ত, সরকারের সঙ্গে মতবিরোধ এবং জনসমর্থনের প্রেক্ষাপটে তাঁর বক্তব্য জেলেনস্কি সরকারের জন্য নতুন রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে। তবে নির্বাচন আয়োজনের আগে আইন পরিবর্তন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ভোটার তালিকা, বিদেশে থাকা নাগরিকদের ভোটাধিকার এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের অংশগ্রহণের মতো বিষয়গুলোতে সুস্পষ্ট সমাধান প্রয়োজন হবে।

সব মিলিয়ে, ফেদোরভের নির্বাচনের দাবি যুদ্ধের মধ্যেও ইউক্রেনের গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে। রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পাশাপাশি ইউক্রেন কীভাবে তার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো সচল রাখবে, সেটি এখন দেশটির ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তাঁর আহ্বান অবিলম্বে নির্বাচন আয়োজনের পথ খুলে দেবে কি না, তা অনিশ্চিত। তবে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মধ্যেও জনগণের ভোটাধিকার, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা যে ক্রমেই সামনে আসছে, ফেদোরভের বক্তব্য সেটিই স্পষ্ট করে দিয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত