দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক স্বনির্ভরতার ডাক

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪ বার
দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক স্বনির্ভরতার ডাক

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া কমানোর সিদ্ধান্তের পর নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং। তাঁর মতে, উত্তর কোরিয়ার সামরিক হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের শক্তিশালী সামরিক জোট বজায় রাখার পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়াকে নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ওপরও আরও বেশি নির্ভরশীল হতে হবে।

মঙ্গলবার দেওয়া বক্তব্যে লি জে মিয়ং বিশেষভাবে যুদ্ধকালীন অপারেশনাল নিয়ন্ত্রণ বা ওপকন দক্ষিণ কোরিয়ার হাতে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন। তাঁর এই অবস্থান এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন ওয়াশিংটন ও সিউলের দীর্ঘদিনের যৌথ সামরিক মহড়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক মহড়া উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে দুই দেশের সামরিক প্রস্তুতি, উত্তর কোরিয়ার প্রতিরোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা কাঠামো নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক জোট কয়েক দশকের পুরোনো। কোরীয় যুদ্ধের পর থেকে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই জোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশটিতে বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনা অবস্থান করছে এবং নিয়মিত যৌথ মহড়ার মাধ্যমে দুই দেশের বাহিনী সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সমন্বিতভাবে কাজ করার প্রস্তুতি নেয়।

তবে লি জে মিয়ংয়ের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—দক্ষিণ কোরিয়া শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভর করে থাকতে চায় না। তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোটকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি নিজেদের সামরিক সক্ষমতাও এমন পর্যায়ে নিতে হবে, যাতে প্রয়োজন হলে দক্ষিণ কোরিয়া নিজস্ব শক্তিতে প্রতিরক্ষা পরিচালনা করতে পারে।

এই অবস্থানের কেন্দ্রে রয়েছে যুদ্ধকালীন অপারেশনাল নিয়ন্ত্রণ। বর্তমানে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বাহিনীর কমান্ড কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনৈতিক ও সামরিক মহলে যুদ্ধকালীন কমান্ড বা অপারেশনাল নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি রয়েছে। লি জে মিয়ং সেই লক্ষ্যকে তাঁর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছেন।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া কমানোর সিদ্ধান্ত সিউলের জন্য এক ধরনের কৌশলগত বার্তা তৈরি করেছে। কারণ, নিয়মিত সামরিক মহড়া দুই দেশের সেনাদের শুধু যুদ্ধের প্রস্তুতিই দেয় না, বরং যোগাযোগ, কমান্ড কাঠামো, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও যাচাই করে।

প্রতি বছর অনুষ্ঠিত ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ মহড়া এ ধরনের প্রস্তুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এবারের মহড়ায় প্রায় ১৮ হাজার দক্ষিণ কোরীয় সেনাসদস্যের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ কমান্ডের সদস্যদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। মহড়ার মাধ্যমে সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দুই দেশের বাহিনীর সমন্বিত প্রতিক্রিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়ার নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা যাচাই করা হয়।

ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে এই মহড়ার পরিধি বা মাত্রা কমে গেলে যৌথ সামরিক প্রস্তুতির ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে উত্তর কোরিয়া নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা এবং সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ায় সিউলের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় কোনো ধরনের দুর্বলতা তৈরি হোক, তা চায় না দেশটির সরকার।

তবে লি জে মিয়ংয়ের অবস্থানকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক থেকে সরে যাওয়ার উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং তিনি জোটের পাশাপাশি আত্মনির্ভর প্রতিরক্ষার একটি সমন্বিত কাঠামোর কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শক্তিশালী সামরিক সম্পর্ক এবং নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি—দুটি বিষয় পরস্পরবিরোধী নয়।

দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য এই ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে দেশটির নিরাপত্তা কাঠামোর বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার সঙ্গে সমন্বিত। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া গত কয়েক দশকে নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পকে উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করেছে। যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ, সাঁজোয়া যান, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং বিভিন্ন ধরনের সামরিক প্রযুক্তি উৎপাদনে দেশটি এখন আন্তর্জাতিক বাজারেও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে।

নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পের এই অগ্রগতি দক্ষিণ কোরিয়াকে সামরিক স্বনির্ভরতার পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছে। দেশটির সরকার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশে দক্ষিণ কোরিয়ার তৈরি সামরিক সরঞ্জামের রপ্তানিও বেড়েছে। ফলে সামরিক সক্ষমতা শুধু জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় নয়, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেছে।

তবে উত্তর কোরিয়ার হুমকি দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য অন্য অনেক দেশের তুলনায় আলাদা। দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সীমান্ত রয়েছে এবং রাজধানী সিউল উত্তর কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতার তুলনামূলক কাছাকাছি। উত্তর কোরিয়ার কাছে বিপুলসংখ্যক প্রচলিত অস্ত্রের পাশাপাশি পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা রয়েছে। ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় কোনো ধরনের ভুল বা দুর্বলতার সুযোগ সীমিত।

এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সিউলের জন্য এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ওয়াশিংটনের নীতিতে পরিবর্তন এলে দক্ষিণ কোরিয়াকে দ্রুত নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। ট্রাম্পের যৌথ মহড়া কমানোর সিদ্ধান্ত সেই সম্ভাব্য পরিবর্তনের কথাই নতুন করে সামনে এনেছে।

ট্রাম্প এর আগে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা তুলে ধরে সিউল ও ওয়াশিংটনের সামরিক মহড়াকে উসকানিমূলক হিসেবে দেখার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাঁর প্রশাসনের এই অবস্থান উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সিউলের জন্য বিষয়টি শুধু কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তা ও যুদ্ধ প্রস্তুতির বিষয় জড়িত।

দক্ষিণ কোরিয়ার জনগণের কাছেও এই বিতর্কের একটি মানবিক দিক রয়েছে। উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে সীমান্তবর্তী অঞ্চল ও বড় শহরগুলোর সাধারণ মানুষ। সম্ভাব্য সংঘাত ঠেকাতে শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা যেমন প্রয়োজন, তেমনি কূটনৈতিক যোগাযোগ ও উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণও জরুরি।

লি জে মিয়ংয়ের বক্তব্য তাই শুধু সামরিক ব্যয় বাড়ানো বা অস্ত্র সংগ্রহের আহ্বান হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি ধরা পড়বে না। এর মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা কাঠামোকে আরও স্বাধীন, কার্যকর ও টেকসই করার পরিকল্পনা। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রেখে নিজেদের কৌশলগত সক্ষমতা বাড়ানোর একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানও এতে ফুটে উঠেছে।

আগামী দিনগুলোতে দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এই দুই লক্ষ্যকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক জোটকে দুর্বল না করে কীভাবে নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো যায়, সেটিই হবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। পাশাপাশি যুদ্ধকালীন অপারেশনাল নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক, প্রযুক্তিগত ও সাংগঠনিক সক্ষমতা কত দ্রুত তৈরি করা সম্ভব হবে, সেটিও নজরে থাকবে।

ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের ফলে সিউল ও ওয়াশিংটনের সামরিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হলেও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের বার্তা পরিষ্কার। দেশটি তার নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল সম্পর্ক বজায় রাখবে, কিন্তু একই সঙ্গে নিজের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকেও এমন পর্যায়ে নিতে চায়, যাতে জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে আরও বেশি কৌশলগত স্বাধীনতা অর্জন করা যায়।

উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তনশীল নীতি এবং পূর্ব এশিয়ার ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার এই সামরিক স্বনির্ভরতার উদ্যোগ আগামী দিনে অঞ্চলটির নিরাপত্তা কাঠামোতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত