প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের শিল্পাঞ্চলে গ্যাস–সংকট আবারও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের বহু কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে অথবা সীমিত পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত নরসিংদীর শিল্পাঞ্চল। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, জেলাটিতে ছোট–বড় তিন শতাধিক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। কোথাও শ্রমিকদের দিয়ে যন্ত্রপাতি পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করানো হচ্ছে, কোথাও আবার কারখানার দরজা বন্ধ রেখে অপেক্ষা করা ছাড়া মালিকদের সামনে কার্যকর কোনো বিকল্প নেই।
শিল্পমালিকেরা বলছেন, গ্যাসের চাপের এই পরিস্থিতি কয়েক দিনের মধ্যে তৈরি হয়নি। বেশ কিছুদিন ধরেই শিল্পাঞ্চলগুলোতে সরবরাহ কম ছিল। তবে গত এক সপ্তাহে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেক কারখানায় বিকল্প ব্যবস্থা ব্যবহার করেও উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা, প্রতিষ্ঠানের আয়, উৎপাদন ব্যয় এবং সময়মতো ক্রেতাদের পণ্য সরবরাহের ওপর।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুটের বিপরীতে স্বাভাবিক সময়েও সরবরাহ ঘাটতি থাকে। আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ প্রায় ২ হাজার ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুটের আশপাশে ছিল, যেখানে চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, পরিবহন ও আবাসিক গ্রাহক—সব খাতেই সংকটের চাপ ছড়িয়ে পড়ে।
নরসিংদীতে পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে বস্ত্র ও সংশ্লিষ্ট শিল্পকে। জেলার শিল্পাঞ্চলগুলোতে টেক্সটাইল, স্পিনিং, ডাইং, সাইজিং ও ক্যালেন্ডারিং মিলের বড় একটি অংশ গ্যাসনির্ভর। শিল্পমালিকদের ভাষ্য, একসময় অল্প চাপের গ্যাস পেলেও উৎপাদনের কিছু অংশ চালু রাখা যেত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কোথাও কোথাও চাপ এত নিচে নেমে গেছে যে, মেশিন চালু করাই সম্ভব হচ্ছে না।
নরসিংদী শহর, মাধবদী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে বেশ কয়েকটি সাইজিং, ডাইং ও টেক্সটাইল কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। শিল্পমালিকেরা বলছেন, এভাবে দীর্ঘদিন চললে শুধু উৎপাদন বন্ধ থাকবে না, শ্রমিকদের মজুরি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিল, ব্যাংকঋণের কিস্তি এবং ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তি—সবকিছুর ওপর চাপ তৈরি হবে। একই সঙ্গে রপ্তানিমুখী ও স্থানীয় বাজারনির্ভর কারখানাগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।
কারখানায় কাজ বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের অনেককে পুরোপুরি ছুটি দেওয়া হচ্ছে না। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে তাঁদের দিয়ে যন্ত্রপাতি পরিষ্কার, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য প্রস্তুতিমূলক কাজ করানো হচ্ছে। এতে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান আপাতত ধরে রাখার চেষ্টা করা হলেও মালিকদের ওপর বাড়ছে আর্থিক চাপ। দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকলে এই ব্যবস্থা কতদিন চালু রাখা সম্ভব হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলেও। ফতুল্লা ও আশপাশের এলাকায় কিছু কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছে। আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান জেনারেটর ব্যবহার করে সীমিতভাবে উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করছে। এতে জ্বালানি ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। ফলে উৎপাদন চালু থাকলেও পণ্যের খরচ বাড়ছে এবং ব্যবসায়িকভাবে তা টেকসই রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
রূপগঞ্জের শিল্প এলাকাতেও গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সমস্যায় পড়েছে। কারখানা চালানোর জন্য যে পরিমাণ চাপ প্রয়োজন, তার তুলনায় পাইপলাইনে চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে একসঙ্গে একাধিক ইউনিট বন্ধ করতে হয়। এতে শুধু ওই দিনের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; পরবর্তী দিনের উৎপাদন পরিকল্পনাও এলোমেলো হয়ে যায়। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাতকরণ, বয়লার বা তাপভিত্তিক উৎপাদনব্যবস্থা গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, তাদের ক্ষতি বেশি।
গাজীপুরেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। জেলার পোশাক কারখানাগুলোর ডাইং ও গ্যাসনির্ভর বিভিন্ন বিভাগে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর আগে চলতি মাসের শুরুতেও গাজীপুরের দুই শতাধিক ছোট ও সাবকন্ট্রাক্টিং পোশাক কারখানা গ্যাসের চাপ কম থাকায় কয়েক দিনের জন্য ছুটি ঘোষণা করেছিল।
গ্যাস–সংকটের প্রভাব শুধু শিল্পকারখানার ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই। অনেক এলাকায় বাসাবাড়িতে চুলা জ্বলছে না বা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কম চাপ পাওয়া যাচ্ছে। সিএনজি স্টেশনগুলোতেও সরবরাহ কমে যাওয়ায় যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে। শিল্প উৎপাদন কমে গেলে এর প্রভাব ধীরে ধীরে পরিবহন, শ্রমবাজার, সরবরাহব্যবস্থা এবং ভোক্তা পর্যায়েও পৌঁছাতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন খাতে গ্যাস সংকটের এমন বহুমুখী প্রভাবের কথা উঠে এসেছে।
বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বর্তমান সংকটের পেছনে দেশীয় গ্যাস উৎপাদনের দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতির পাশাপাশি আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা বড় বিষয় হয়ে উঠেছে। মহেশখালীতে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের যেকোনো একটিতে সমস্যা দেখা দিলে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগে। জুলাইয়ের অগ্নিকাণ্ডে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর এই ঝুঁকি আরও স্পষ্ট হয়। টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু হলেও পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে সময় লাগছে।
এরপর সামিটের টার্মিনালেও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সরবরাহ ব্যাহত হয়েছিল। ফলে জাতীয় গ্যাসব্যবস্থায় একের পর এক ধাক্কা তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও শিল্পাঞ্চলগুলোতে তার সুফল পুরোপুরি পৌঁছেনি। কারণ সীমিত সরবরাহের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে গ্যাসের চাহিদা মেটাতে হচ্ছে।
এ অবস্থায় শিল্পমালিকদের প্রধান দাবি, সংকট নিরসনে একটি সুস্পষ্ট সময়সীমা ও বাস্তবসম্মত সরবরাহ পরিকল্পনা জানানো হোক। তাঁদের মতে, উৎপাদন বন্ধ রেখে অনিশ্চয়তার মধ্যে ব্যবসা পরিচালনা করা সম্ভব নয়। একটি কারখানা এক বা দুই দিন বন্ধ থাকলে যে ক্ষতি হয়, কয়েক সপ্তাহ বন্ধ থাকলে তা বহুগুণে বেড়ে যায়। বিশেষ করে শ্রমিকদের মজুরি, কাঁচামালের খরচ, ঋণের দায় এবং ক্রেতাদের সময়সীমা—সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ দ্রুত বাড়তে থাকে।
জ্বালানি খাতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বলছে, এলএনজি টার্মিনাল সচল রাখা ও নতুন কার্গো নিশ্চিত করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো জরুরি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আমদানিনির্ভর সরবরাহব্যবস্থায় শুধু নতুন টার্মিনাল যোগ করলেই ঝুঁকি পুরোপুরি কমবে না; দেশীয় উৎপাদন, জ্বালানি বৈচিত্র্য, দক্ষ ব্যবহার এবং দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ নিরাপত্তাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে।
নরসিংদীর কারখানাগুলোতে এখন সেই দীর্ঘমেয়াদি নীতির অপেক্ষা করার সুযোগ নেই। মেশিন বন্ধ, শ্রমিক অপেক্ষায়, আর মালিকেরা প্রতিদিনের ক্ষতির হিসাব করছেন। গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক না হলে উৎপাদন ব্যবস্থা কত দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। শিল্পাঞ্চলে কর্মচাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনতে দ্রুত, স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করাই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে জরুরি বিষয়।