১৫ দুর্নীতি মামলায় খালাস পেলেন মির্জা আব্বাস

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫২ বার
১৫ দুর্নীতি মামলায় খালাস পেলেন মির্জা আব্বাস

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের বিচারিক প্রক্রিয়ার পর সরকারি বাড়ি বিক্রিতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের করা ১৫টি মামলায় খালাস পেয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস। বৃহস্পতিবার ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩-এর বিচারক মুহাম্মদ কামরুল হাসান খান পৃথক মামলাগুলোতে এ রায় ঘোষণা করেন। একই ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোর দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর আদালতের এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ও আইন অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

মামলাগুলো ২০০৭ সালে দায়ের করা হয়েছিল। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু ছিল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় থাকা ১৮টি সরকারি পরিত্যক্ত বাড়ি বিক্রির প্রক্রিয়া। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, এসব বাড়ি স্বাভাবিক ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে বিক্রি করা হয়েছিল। এর ফলে সরকারের প্রায় ১২৭ কোটি ৬৪ লাখ ১৯ হাজার ৫৯ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ আনা হয়। ওই অভিযোগের ভিত্তিতেই মির্জা আব্বাসসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পৃথক ১৫টি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন।

বৃহস্পতিবার রায় ঘোষণার পর দীর্ঘদিন ধরে চলা এই মামলাগুলোর বিচারিক অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্বের সমাপ্তি ঘটল। আদালতের রায়ে মির্জা আব্বাসকে এসব মামলার অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে একই সঙ্গে এসব মামলায় অন্য কয়েকজন আসামিও খালাস পেয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার সূত্র ধরে জানা যায়, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় রাজধানীর অভিজাত এলাকায় থাকা ১৮টি সরকারি পরিত্যক্ত বাড়ি বিক্রির ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ ছিল, সাজানো দরপত্রের মাধ্যমে প্রকৃত বাজারমূল্যের তুলনায় কম দামে বাড়িগুলো বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়। এতে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সুবিধা পেয়েছে এবং সরকার বিপুল অর্থের ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল।

২০০৭ সালের মার্চে এ ঘটনায় মির্জা আব্বাসসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। ওই বছরের ২০ সেপ্টেম্বর মামলাগুলোর অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। অভিযোগপত্রে সরকারি বাড়ি বিক্রির প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সরকারের আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে মামলাগুলোর বিচারিক কার্যক্রম বিভিন্ন আইনি জটিলতা ও প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছিল, সরকারি বাড়িগুলোর মূল্য নির্ধারণ ও বিক্রির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দেওয়া উচ্চমূল্যের প্রস্তাব যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। বরং কম মূল্যের দরপত্রের মাধ্যমে বাড়িগুলো বিক্রির অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে রাষ্ট্রের বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছিল। মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবৈধ প্রভাব খাটানোর অভিযোগও আনা হয়েছিল।

এই মামলাগুলো নিয়ে এর আগে উচ্চ আদালতেও আইনি লড়াই হয়েছে। ২০১৫ সালে হাইকোর্টের দেওয়া একটি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আপিল বিভাগে যায়। ২০১৬ সালে আপিল বিভাগ কয়েকটি মামলার কার্যক্রম অব্যাহত রাখার পথ তৈরি করে এবং দ্রুত বিচার শেষ করার নির্দেশ দিয়েছিল। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে চলা আইনি প্রক্রিয়ার পর মামলাগুলো আবার বিচারিক পর্যায়ে এগিয়ে যায়।

এরপর সাক্ষ্যগ্রহণ, নথিপত্র পর্যালোচনা এবং উভয় পক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্যসহ বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। শেষ পর্যন্ত বৃহস্পতিবার আদালত রায় ঘোষণা করেন। মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে দায়ের করা ১৫টি মামলাতেই তাকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

সরকারি সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা ও বিক্রির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির প্রশ্নটি এসব মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। সরকারি কোনো সম্পত্তি বিক্রির ক্ষেত্রে নির্ধারিত আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না, দরপত্র প্রক্রিয়া যথাযথ ছিল কি না এবং রাষ্ট্র আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না—এসব বিষয় নিয়েই মামলার দীর্ঘ বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।

তবে আদালতের রায়ে খালাস পাওয়ার অর্থ হলো, এসব মামলায় মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি। দীর্ঘ বিচার শেষে আদালতের সিদ্ধান্ত তার বিরুদ্ধে দায়ের করা এই ১৫টি মামলার ক্ষেত্রে আইনি অবস্থানকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

মির্জা আব্বাস বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত একটি নাম। বিএনপির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা এই নেতা বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চলা দুর্নীতির মামলাগুলোর রায় রাজনৈতিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

একই সঙ্গে এই রায় বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন সামনে এনেছে। ২০০৭ সালে দায়ের হওয়া মামলার চূড়ান্ত রায় এসেছে ২০২৬ সালে, অর্থাৎ প্রায় ১৯ বছর পর। এত দীর্ঘ সময় ধরে মামলা চলার ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থার ওপরও দীর্ঘস্থায়ী চাপ তৈরি হয়। একটি মামলার নিষ্পত্তি যত দীর্ঘ হয়, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংরক্ষণ, সাক্ষীদের উপস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের ধারাবাহিকতা বজায় রাখাও তত কঠিন হয়ে পড়ে।

তবে দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর আদালতের রায়ই শেষ পর্যন্ত মামলার আইনি পরিণতি নির্ধারণ করে। বৃহস্পতিবারের রায়েও সেই বিচারিক প্রক্রিয়ারই প্রতিফলন ঘটেছে। অভিযোগের বিষয়ে আদালতে উপস্থাপিত নথি, সাক্ষ্য ও আইনগত যুক্তি বিবেচনা করেই বিচারক সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।

সরকারি সম্পত্তি নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহু বছর ধরে আলোচিত বিষয়। বিশেষ করে সরকারি বাড়ি বা জমি বরাদ্দ, বিক্রি কিংবা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ প্রায়ই সামনে আসে। এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সম্পদ রক্ষা এবং সরকারি অর্থের সর্বোচ্চ স্বার্থ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তার ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

মির্জা আব্বাসের ক্ষেত্রে ১৫টি মামলার দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বৃহস্পতিবার যে রায় এসেছে, তা সেই দুই বাস্তবতার কথাই সামনে এনেছে। অভিযোগের বিচার হয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে, আর শেষ পর্যন্ত আদালত তাকে এসব মামলায় খালাস দিয়েছেন। ফলে প্রায় দুই দশক ধরে চলা এই মামলাগুলোর একটি বড় অধ্যায় এখন শেষ হলো।

রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতার বিরুদ্ধে দায়ের করা ১৫টি মামলার একসঙ্গে নিষ্পত্তি হওয়ায় বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই আলোচনায় থাকবে। তবে আদালতের রায়কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে আইনি সিদ্ধান্ত এবং বিচারিক প্রক্রিয়াকেই প্রধান বিবেচ্য হিসেবে দেখা হবে। কারণ অভিযোগ ও রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে একটি মামলার চূড়ান্ত অবস্থান নির্ধারিত হয় আদালতের রায়ের মাধ্যমে।

দীর্ঘ সময় পর মির্জা আব্বাসের এসব মামলায় খালাস পাওয়ার ঘটনা একই সঙ্গে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা, সরকারি সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার পরিণতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। ২০০৭ সালে যে অভিযোগকে কেন্দ্র করে আইনি লড়াই শুরু হয়েছিল, ১৯ বছর পর আদালতের রায়ে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সমাপ্তি ঘটল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com