জাতিসংঘের বিদায়ে লেবাননে ইউরোপীয় বাহিনীর ভাবনা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৭ বার
জাতিসংঘের বিদায়ে লেবাননে ইউরোপীয় বাহিনীর ভাবনা

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দক্ষিণ লেবাননে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী ইউএনআইএফআইএলের (ইউনাইটেড নেশনস ইন্টারিম ফোর্স ইন লেবানন) দীর্ঘদিনের উপস্থিতি শেষ হওয়ার পথে। আগামী ৩১ ডিসেম্বর এর বর্তমান ম্যান্ডেটের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর ধাপে ধাপে বাহিনীটির প্রত্যাহার শুরু হলে দক্ষিণ লেবাননে সম্ভাব্য নিরাপত্তাশূন্যতা কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একটি নতুন সামরিক ও বেসামরিক মিশন গঠনের প্রস্তাব সামনে এসেছে। ইইউর কূটনৈতিক সংস্থা ইউরোপিয়ান এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিসের পক্ষ থেকে তিন বছরের একটি মিশনের ধারণা নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রস্তাবিত মিশনের মূল লক্ষ্য হবে লেবাননের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা এবং দেশটির সশস্ত্র বাহিনী ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া।

প্রস্তাবিত উদ্যোগের আওতায় সীমান্ত নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার বিষয়ও গুরুত্ব পেতে পারে। তবে ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই মিশনের উদ্দেশ্য সরাসরি ইউএনআইএফআইএলের জায়গা নেওয়া নয়। বরং লেবাননের নিজস্ব নিরাপত্তা কাঠামোকে কার্যকর করে তোলাই এর প্রধান লক্ষ্য।

দক্ষিণ লেবাননের বর্তমান বাস্তবতা অবশ্য পরিস্থিতিকে অত্যন্ত জটিল করে তুলেছে। অঞ্চলটিতে ইসরাইলি সামরিক হামলা অব্যাহত রয়েছে এবং লেবাননের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ এখনো ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণ বা সামরিক উপস্থিতির প্রভাবের মধ্যে রয়েছে। সংঘাতের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফলে ইউএনআইএফআইএল প্রত্যাহারের সময় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো ধরনের শূন্যতা তৈরি হলে তার প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ইউএনআইএফআইএলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা অবশ্য নতুন নয়। ১৯৭৮ সালের মার্চে দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি সামরিক অভিযানের পর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তে বাহিনীটি গঠিত হয়। পরে ২০০৬ সালে ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে যুদ্ধের পর এর দায়িত্ব ও কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা হয়।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১৭০১ নম্বর প্রস্তাবের আওতায় ইউএনআইএফআইএলের অন্যতম দায়িত্ব ছিল যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ করা এবং দক্ষিণ লেবাননে লেবাননের সশস্ত্র বাহিনীর মোতায়েনে সহায়তা করা। তবে বাহিনীটির কার্যক্রমের ওপর শুরু থেকেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা ছিল। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, তথ্য সংগ্রহ, প্রতিবেদন তৈরি এবং লেবাননের কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করতে পারলেও ইসরাইলি বাহিনীকে জোর করে প্রত্যাহার করানো কিংবা কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণভাবে নিরস্ত্র করার ক্ষমতা তাদের ছিল না।

ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, ইউএনআইএফআইএল ইসরাইল-লেবানন সীমান্ত এলাকায় হিজবুল্লাহর সামরিক তৎপরতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিকে কার্যকরভাবে ঠেকাতে পারেনি। অন্যদিকে লেবাননের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময়ে ইসরাইলের সামরিক অভিযান ও সীমান্ত লঙ্ঘনের বিষয়ে জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ফলে শান্তিরক্ষী বাহিনীটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্ক ক্রমেই তীব্র হয়েছে।

ইইউর পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস এর আগে জানিয়েছিলেন, লেবাননের সশস্ত্র বাহিনীকে সহায়তার জন্য ইউরোপীয় একটি মিশন গঠনের প্রস্তুতি নেওয়া যেতে পারে। তবে ইউএনআইএফআইএলের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নতুন কোনো ইউরোপীয় বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়ে তিনি সতর্ক অবস্থান নিয়েছিলেন।

প্রস্তাবিত ইউরোপীয় মিশনের কার্যক্রম কতটা বিস্তৃত হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। ইউএনআইএফআইএলে দায়িত্ব পালন করা এবং ইউনিভার্সিটি অব গ্যালওয়ের আইরিশ সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটসের অধ্যাপক রেমন্ড মারফির মতে, নতুন ইউরোপীয় বাহিনীকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার নিশ্চিত করা কিংবা হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার মতো সরাসরি দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা কম।

তার মতে, ইউরোপীয় মিশনের মূল কাজ হতে পারে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং লেবাননের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহযোগিতা করা। তবে দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালন করতে হলে বাহিনীটির নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত সামরিক সক্ষমতা থাকতে হবে। একই সঙ্গে তাদের দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় চলাচলের স্বাধীনতা এবং অস্ত্রের অবৈধ চলাচল ঠেকানোর সক্ষমতাও প্রয়োজন হতে পারে।

তবে ইউএনআইএফআইএল প্রত্যাহারের পর লেবাননে কী ধরনের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা থাকবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। জাতিসংঘও এ বিষয়ে বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে কাজ করছে। একটি সম্ভাব্য ব্যবস্থায় জাতিসংঘের ট্রুস সুপারভিশন অর্গানাইজেশনকে সীমিত দায়িত্ব দেওয়ার বিষয় বিবেচনা করা হচ্ছে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস জুনে নিরাপত্তা পরিষদের সামনে ইউএনআইএফআইএলের ভবিষ্যৎ নিয়ে একাধিক বিকল্প তুলে ধরেছিলেন। এসব প্রস্তাবের কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৯০০ থেকে ৩ হাজার পর্যন্ত সেনা রাখার ধারণা রয়েছে। তুলনায় জুনে ইউএনআইএফআইএলে প্রায় ৭ হাজার সেনা দায়িত্ব পালন করছিলেন। ফলে বর্তমান বাহিনী প্রত্যাহারের পর আন্তর্জাতিক উপস্থিতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

লেবাননের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইমাদ সালামেয়ির মতে, ইউএনআইএফআইএল চলে গেলে একটি সাময়িক নিরাপত্তাশূন্যতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা যথেষ্ট গুরুতর। তার মতে, এমন পরিস্থিতি ইসরাইলের জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে।

আন্তর্জাতিক কোনো বাহিনী দক্ষিণ লেবাননে না থাকলে ইসরাইল এমন একটি নিরাপত্তা কাঠামোর পক্ষে অবস্থান নিতে পারে, যেখানে লেবাননের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে ইসরাইলি বাহিনীর সরাসরি সমন্বয় বাড়বে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যস্থতাকারী বা নিশ্চয়তাদাতা হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এমন ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানের পরিবর্তে দুই দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বিপক্ষীয় সমন্বয়ের দিকে পরিস্থিতিকে নিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

সালামেয়ির মতে, ইউএনআইএফআইএল প্রত্যাহারের পর যে বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে উঠবে, সেটি দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী রূপ পেতে পারে। তখন ভবিষ্যতে নতুন কোনো আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী দক্ষিণ লেবাননে মোতায়েন করা আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় কয়েক মাস ধরে আলোচনা চলছে। তবে সমালোচকদের অভিযোগ, এসব আলোচনা এখন পর্যন্ত ইসরাইলি হামলা বন্ধ করা কিংবা লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরাইলি সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আনতে পারেনি।

এদিকে জুনের শেষ দিকে ইসরাইল ও লেবানন একটি কাঠামোগত ব্যবস্থার বিষয়ে সম্মত হয়েছিল। এর আওতায় দক্ষিণ লেবাননে কিছু ‘পাইলট জোন’ গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব এলাকা থেকে ইসরাইলি বাহিনী সরে যাবে এবং সেখানে লেবাননের সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন হয়ে নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে। একই সঙ্গে হিজবুল্লাহর পুনরায় ওই এলাকাগুলোতে সামরিকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠা ঠেকানোর বিষয়টিও পরিকল্পনার অংশ।

আগস্টের শুরুতে রোমে এ বিষয়ে আরও আলোচনা অনুষ্ঠিত হলেও ‘পাইলট জোন’ সম্প্রসারণ নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। ফলে কাগজে-কলমে কোনো নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি হলেও বাস্তবে সেটি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউএনআইএফআইএলের পরিবর্তে ইউরোপীয় কোনো মিশন পাঠানো হলেও শুধু বাহিনীর সংখ্যা বা দেশের পরিচয় দিয়ে দক্ষিণ লেবাননের নিরাপত্তা সংকটের সমাধান হবে না। এর সাফল্য অনেক বেশি নির্ভর করবে ইসরাইল, লেবানন এবং সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র পক্ষগুলোর মধ্যে একটি কার্যকর রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর।

কারণ আন্তর্জাতিক বাহিনীকে যদি এমন একটি এলাকায় দায়িত্ব পালন করতে হয়, যেখানে একদিকে ইসরাইলি বাহিনীর সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং অন্যদিকে হিজবুল্লাহ বিদ্যমান নিরাপত্তা কাঠামো প্রত্যাখ্যান করবে, তাহলে ইউরোপীয় বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। একই সঙ্গে তাদের ওপর রাজনৈতিক ও সামরিক চাপ বাড়ার আশঙ্কাও থাকবে।

ফলে দক্ষিণ লেবাননের সামনে এখন শুধু একটি শান্তিরক্ষী বাহিনীর বিদায় নয়, বরং নতুন একটি নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। ইউএনআইএফআইএলের কয়েক দশকের উপস্থিতির পর সেখানে যে শূন্যতা তৈরি হতে পারে, তা কীভাবে পূরণ করা হবে—তার উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন কোনো বাহিনী মোতায়েন করলেই দীর্ঘস্থায়ী শান্তি নিশ্চিত হবে না। ইসরাইলের সামরিক অবস্থান, লেবাননের সার্বভৌমত্ব, হিজবুল্লাহর অস্ত্র ও রাজনৈতিক ভূমিকা এবং লেবাননের রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সক্ষমতা—সবগুলো বিষয়কে একই কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। পারস্পরিক অঙ্গীকার, স্পষ্ট নিয়ম এবং বাস্তবসম্মত প্রয়োগব্যবস্থা ছাড়া শুধু ইউএনআইএফআইএলের পরিবর্তে ইউরোপীয় বাহিনী মোতায়েন করা হলে পুরোনো সংকট নতুন নামে ফিরে আসার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত