প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশে শিশু নিখোঁজের ঘটনা নিয়ে জাতীয় সংসদে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে, অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত, দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার তথ্য তুলে ধরে তিনি নিখোঁজ শিশুদের দ্রুত উদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
রোববার জাতীয় সংসদে আলোচনায় অংশ নিয়ে রুমিন ফারহানা বলেন, নিখোঁজ শিশুদের একটি বড় অংশকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও এখনো দুই হাজারের বেশি শিশুর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তিনি বিষয়টিকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে নয়, বরং পরিবার ও সমাজের জন্য গভীর মানবিক সংকট হিসেবে দেখার আহ্বান জানান।
তবে পুলিশ সদর দপ্তরের পরবর্তী যাচাই করা তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত নিখোঁজ হিসেবে সাধারণ ডায়েরি হওয়া ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বা তারা পরিবারের কাছে ফিরে গেছে। এখনো হদিস মেলেনি ২ হাজার ৩৮ জনের। মোট নিখোঁজের প্রায় ১৩ শতাংশ শিশু এখনো অজ্ঞাত অবস্থায় রয়েছে। ফলে সামগ্রিক চিত্রে যেমন বিপুলসংখ্যক শিশুকে উদ্ধার করার তথ্য রয়েছে, তেমনি হাজারো শিশুর এখনো সন্ধান না পাওয়ার বিষয়টিও উদ্বেগের কারণ হয়ে আছে।
পুলিশের তথ্য বলছে, নিখোঁজ শিশুদের বয়সভিত্তিক চিত্রে বড় পার্থক্য রয়েছে। শূন্য থেকে নয় বছর বয়সী শিশুদের নিখোঁজের ঘটনায় জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৪৭৪টি সাধারণ ডায়েরি করা হয়। এর মধ্যে ৪০৬ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে, এখনো ৬৮ জনের সন্ধান পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের নিখোঁজের ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি হয়েছে ১৫ হাজার ২৪৩টি। এই বয়সসীমার ১৩ হাজার ২৭৩ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে বা তারা পরিবারের কাছে ফিরে গেছে, কিন্তু ১ হাজার ৯৭০ জন এখনো নিখোঁজ।
এই পরিসংখ্যানের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, নিখোঁজ শিশুদের বড় অংশই কিশোর-কিশোরী। পুলিশ বলছে, এ বয়সী শিশুদের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে পারিবারিক বিরোধ, অভিমান বা ক্ষোভ, পড়াশোনার চাপ, স্বাধীনভাবে থাকার আকাঙ্ক্ষা, বন্ধু বা সহপাঠীদের প্রভাবসহ বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার পর ভয় বা লজ্জা থেকেও শিশুরা বাড়ি ছেড়ে যেতে পারে। আবার পরিবারের কাছ থেকে অর্থ বা অন্য কোনো সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা থেকেও কিছু শিশু বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। পুলিশ জানিয়েছে, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অপরিচিত স্থানে যাওয়ার সময় পথ হারানো, নিজের নাম-ঠিকানা বা পরিবারের পরিচয় বলতে না পারা কিংবা একা কোথাও যাওয়ার সময় পথভ্রষ্ট হওয়ার মতো ঘটনাও শিশু নিখোঁজের কারণ হতে পারে। ফলে শিশু নিখোঁজের প্রতিটি ঘটনাকে একই ধরনের অপরাধ হিসেবে না দেখে বয়স, পারিবারিক পরিবেশ এবং নিখোঁজ হওয়ার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন।
জাতীয় সংসদে রুমিন ফারহানা নিখোঁজ শিশুদের পরিবারগুলোর দুর্ভোগের বিষয়টিও তুলে ধরেন। একটি শিশু হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে গেলে পরিবারের ওপর যে মানসিক চাপ তৈরি হয়, তা সহজে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। দিনের পর দিন সন্তানকে খুঁজতে পরিবারকে থানা, হাসপাতাল, বিভিন্ন প্রশাসনিক দপ্তর কিংবা সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে ছুটতে হয়। সন্তান জীবিত আছে কি না, কোথায় আছে, কী অবস্থায় আছে—এই অনিশ্চয়তা পরিবারগুলোর জন্য এক ধরনের দীর্ঘস্থায়ী মানসিক যন্ত্রণায় পরিণত হয়।
রুমিন ফারহানা সংসদে বলেন, সন্তান হারানো পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের ফিরে পাওয়ার জন্য আকুল আবেদন জানাচ্ছে। রাষ্ট্রের কাছে তাদের মূল প্রত্যাশা একটাই—নিখোঁজ শিশুদের খুঁজে বের করে নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া। তাঁর বক্তব্যে শিশু নিখোঁজের ঘটনাকে মানবিক ও সামাজিক নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান উঠে আসে।
তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সঙ্গে শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। কোনো শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর দ্রুততম সময়ে তার অবস্থান শনাক্ত করা গেলে অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকি কমানো সম্ভব। তাই নিখোঁজের অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত শুরু করতে অযথা বিলম্ব না করা এবং বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
শিশু নিখোঁজের ঘটনায় মানব পাচারের আশঙ্কাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যদিও প্রতিটি নিখোঁজের ঘটনাকে পাচারের সঙ্গে যুক্ত করার মতো তথ্য নেই, তবু দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ থাকা শিশুদের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সব কারণ খতিয়ে দেখা জরুরি। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী অঞ্চল, বড় শহর, বাস ও রেলস্টেশন এবং জনবহুল পরিবহনকেন্দ্রগুলোতে শিশুদের নিরাপত্তা ও নজরদারি আরও জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তর অবশ্য সাম্প্রতিক ব্যাখ্যায় জানিয়েছে, শিশু নিখোঁজের সংখ্যা নিয়ে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদনে উদ্ধার হওয়া বা পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়া শিশুদের তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। এতে পুরো পরিস্থিতির একটি অসম্পূর্ণ চিত্র তৈরি হতে পারে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট থানাগুলোর মাধ্যমে তথ্য যাচাই করা হয়েছে। সেই যাচাইয়ের পরই ১৫ হাজার ৭১৭ নিখোঁজ শিশুর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার বা পরিবারের কাছে ফেরত পাওয়ার তথ্য জানানো হয়।
পুলিশ সদর দপ্তর আরও জানিয়েছে, অনলাইন সাধারণ ডায়েরি বা জিডি ব্যবস্থা চালুর পর নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে জিডির সংখ্যা বেড়েছে। পুলিশ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে ১৭ হাজার ৮০৮টি জিডি করা হয়েছিল। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ৪১৪ এবং ২০২৫ সালে বেড়ে ২২ হাজার ৫৫০টিতে দাঁড়ায়। অনলাইন জিডির কারণে মানুষ সহজে অভিযোগ জানানোর সুযোগ পাওয়ায় সংখ্যাটি বেড়ে থাকতে পারে বলেও পুলিশ জানিয়েছে।
তবে অভিযোগের সংখ্যা বাড়া বা কমার হিসাবের বাইরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যেসব শিশু এখনো পরিবারের কাছে ফেরেনি তাদের সন্ধান নিশ্চিত করা। ২ হাজার ৩৮ শিশুর নিখোঁজ থাকার তথ্য কোনোভাবেই উপেক্ষা করার মতো নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একজন মা-বাবা এবং একটি শিশুর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। সে কারণে নিখোঁজ শিশুদের তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ, আন্তঃজেলা সমন্বয়, সীমান্ত এলাকায় নজরদারি এবং দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত থাকা ঘটনাগুলোর পুনঃতদন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।
শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর অনুসন্ধানের পাশাপাশি নিখোঁজ হওয়ার ঝুঁকি কমাতেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। পারিবারিক অস্থিরতা, শিক্ষাজনিত চাপ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কিংবা অপরাধী চক্রের প্রভাব—যে কারণেই কোনো শিশু ঝুঁকির মধ্যে পড়ুক না কেন, তার আগেই পরিস্থিতি শনাক্ত করার ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
সংসদে রুমিন ফারহানার বক্তব্য সেই বৃহত্তর প্রশ্নটিকেই সামনে এনেছে—নিখোঁজ প্রতিটি শিশুকে কত দ্রুত শনাক্ত ও নিরাপদে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। পুলিশের হিসাবে অধিকাংশ শিশুকে ইতোমধ্যে উদ্ধার করা গেলেও এখনো যে ২ হাজার ৩৮ শিশুর সন্ধান মেলেনি, তাদের প্রত্যেকের পরিবারের অপেক্ষা শেষ করার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের ওপরই বর্তায়। একটি শিশুর নিরাপদ প্রত্যাবর্তন শুধু একটি পরিবারের স্বস্তি নয়, বরং রাষ্ট্রের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতারও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।