রাষ্ট্রপতির হাতে ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন যাত্রা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২ বার
রাষ্ট্রপতির হাতে ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন যাত্রা

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার পর উত্তরাঞ্চলের উচ্চশিক্ষার পরিসরে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সোমবার বেলা ১১টা ২০ মিনিটের দিকে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার জামালপুর এলাকায় ঠাকুরগাঁও-পীরগঞ্জ সড়কের পাশে প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত স্থানে তিনি এ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর নিজ জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে এটিই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রথম সরকারি সফর। দুই দিনের এই সফরের দ্বিতীয় দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের কর্মসূচি ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ছিল বিশেষ আগ্রহ। দীর্ঘদিন ধরে জেলার শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর যে প্রত্যাশা ছিল, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মাণের আনুষ্ঠানিক সূচনাকে সেই প্রত্যাশা পূরণের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের স্থানটি ঠাকুরগাঁও শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে জামালপুর এলাকায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস গড়ে তোলার জন্য এ এলাকায় প্রয়োজনীয় কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জমি নির্বাচন ও অবকাঠামো পরিকল্পনা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একটি আধুনিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটিকে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।

ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অধ্যাপক ড. ইসরাফিল শাহীন। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির একাডেমিক কার্যক্রম পুরোপুরি চালু হওয়ার আগে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়নকে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

উত্তরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন এই বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। ঠাকুরগাঁও ও আশপাশের জেলার অনেক শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষার জন্য দীর্ঘ দূরত্ব পাড়ি দিয়ে অন্য জেলায় যেতে হয়। বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে দূরের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সঙ্গে আবাসন, যাতায়াত ও জীবনযাত্রার অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হয়। স্থানীয় পর্যায়ে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে এসব শিক্ষার্থীর একটি বড় অংশ নিজ অঞ্চলের কাছাকাছি থেকে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেতে পারে।

শুধু শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি নয়, একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে একটি অঞ্চলের সামগ্রিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও পরিবর্তন আসতে পারে। নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য কর্মসংস্থানের পাশাপাশি আবাসন, পরিবহন, খাবার, বইপত্র, প্রযুক্তি ও বিভিন্ন সেবার চাহিদা তৈরি হয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক একটি নতুন অর্থনৈতিক বলয় গড়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে। ঠাকুরগাঁওয়ের মতো তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলের জন্য এই পরিবর্তন স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ অবশ্য একেবারে নতুন নয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য আইন প্রণয়নের পর বেশ কিছু সময় ধরে এর কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার অপেক্ষা ছিল। ২০২৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়-সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করা হয়। পরবর্তী সময়ে প্রথম উপাচার্য নিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি আসে। চলতি বছরের মে মাসে অধ্যাপক ড. ইসরাফিল শাহীনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর প্রশাসনিক কাঠামো ও প্রাথমিক কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হয়।

রাষ্ট্রপতির ঠাকুরগাঁও সফরকে কেন্দ্র করে জেলা শহর ও আশপাশের এলাকায়ও ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়। সফরের প্রথম দিনে তিনি ঠাকুরগাঁওয়ে পৌঁছে রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। পরে তিনি সেউনা কবরস্থানে গিয়ে বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করেন এবং দোয়া করেন। এরপর নিজ বাসভবনে যান। বিকেলে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের বড় মাঠে তার সম্মানে নাগরিক সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তি, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষ এতে অংশ নেন।

রাষ্ট্রপতির সফরকে কেন্দ্র করে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নিরাপত্তা ও আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি জোরদার করা হয়। শহরের বিভিন্ন সড়ক, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও জনসমাগমের স্থান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। রাষ্ট্রপতির নিজ জেলায় প্রথম সরকারি সফর হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও এ সফর নিয়ে বাড়তি আগ্রহ দেখা যায়।

রাষ্ট্রপতির সফরের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ কর্মসূচি ছিল ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন। কারণ এটি কেবল একটি স্থাপনার নির্মাণ শুরুর আনুষ্ঠানিকতা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি অঞ্চলের দীর্ঘদিনের উচ্চশিক্ষার প্রত্যাশা। বিশেষ করে জেলার তরুণ প্রজন্মের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়টি ভবিষ্যতে শিক্ষা, গবেষণা ও দক্ষতা উন্নয়নের নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর সামনে এখন আরও বড় কাজ। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য শুধু ভবন নির্মাণের ওপর নির্ভর করে না। মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ, আধুনিক পাঠক্রম, গবেষণার পরিবেশ, শিক্ষার্থীবান্ধব আবাসিক ও একাডেমিক সুবিধা, গ্রন্থাগার, ল্যাবরেটরি, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এবং স্বচ্ছ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিভাগ ও বিষয় নির্ধারণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশাও তাই বহুমাত্রিক। কেউ চান সন্তানদের জন্য নিজ জেলায় ভালো উচ্চশিক্ষার সুযোগ, কেউ দেখতে চান নতুন কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সম্ভাবনা, আবার কেউ চান বিশ্ববিদ্যালয়টি উত্তরাঞ্চলের শিক্ষা ও গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হোক। এই প্রত্যাশাগুলো পূরণ করতে হলে নির্মাণকাজের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন জরুরি।

বিশ্ববিদ্যালয়টির স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে সেই দীর্ঘ পথচলার আনুষ্ঠানিক দৃশ্যমান সূচনা হলো। এখন স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা, পরিকল্পনা যেন দ্রুত বাস্তবায়নের পর্যায়ে যায় এবং একটি পূর্ণাঙ্গ, মানসম্মত ও আধুনিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয় দেশের উচ্চশিক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। উত্তরাঞ্চলের তরুণদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়ার যে স্বপ্নকে সামনে রেখে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা, তার বাস্তব রূপ এখন নির্ভর করবে ধারাবাহিক পরিকল্পনা, যথাযথ অর্থায়ন ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত