৫০ হাজার ফুট উঁচুতে ছাই, ইন্দোনেশিয়ায় বন্ধ ৮ বিমানবন্দর

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪ বার
৫০ হাজার ফুট উঁচুতে ছাই, ইন্দোনেশিয়ায় বন্ধ ৮ বিমানবন্দর

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইন্দোনেশিয়ার সক্রিয় আগ্নেয়গিরি আনাক ক্রাকাতোয়ার অগ্ন্যুৎপাত নতুন করে বড় ধরনের বিপর্যয় তৈরি করেছে দেশটির আকাশপথে। আগ্নেয়গিরি থেকে ছড়িয়ে পড়া ছাই ২০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার ফুট পর্যন্ত উঠে যাওয়ায় নিরাপত্তার কারণে রাজধানী জাকার্তাসহ পশ্চিমাঞ্চলের আটটি বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিতে হয়েছে। এতে বিপুলসংখ্যক ফ্লাইট বাতিল ও বিলম্বিত হয়েছে এবং হাজার হাজার যাত্রী বিমানবন্দরে আটকা পড়েছেন।

জাভা ও সুমাত্রা দ্বীপের মাঝামাঝি সুন্দা প্রণালিতে অবস্থিত আনাক ক্রাকাতোয়া গত শুক্রবার রাত থেকে অগ্ন্যুৎপাত শুরু করার পর পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। পরবর্তী সময়ে একাধিকবার অগ্ন্যুৎপাতের ফলে আগ্নেয় ছাইয়ের বিশাল মেঘ তৈরি হয়। সেই ছাই বাতাসের প্রবাহে জাকার্তা, বানটেন, ল্যাম্পুংসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। আকাশে ছাইয়ের উপস্থিতি বিমান চলাচলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় কর্তৃপক্ষ একের পর এক বিমানবন্দর বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়।

ইন্দোনেশিয়ার পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে আটটি বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ হওয়ায় প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার যাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং ১ হাজার ৫৫৮টি ফ্লাইট বিলম্বিত বা বাতিল হয়। পরে পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হওয়ায় ফ্লাইট বিপর্যয়ের পরিমাণ আরও বেড়েছে। রাজধানী জাকার্তার প্রধান বিমানবন্দর সুকর্ণ-হাত্তা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিমানবন্দরটির শত শত ফ্লাইটের সময়সূচি পরিবর্তন করতে হয়েছে।

রোববার সকালে সবার আগে সুকর্ণ-হাত্তা বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। এরপর পরিস্থিতি বিবেচনায় আরও কয়েকটি বিমানবন্দর বন্ধ করা হয়। সোমবারও বিমানবন্দরগুলোর কিছু অংশে কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়নি। সুকর্ণ-হাত্তার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ছাই ও আবহাওয়াজনিত ঝুঁকি বিবেচনায় বিমান চলাচল পুনরায় শুরু করার সিদ্ধান্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে নেওয়া হবে।

আগ্নেয় ছাই বিমানের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। ইঞ্জিনে ছাই ঢুকে গেলে তা ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে, এমনকি গুরুতর যান্ত্রিক সমস্যাও তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে ছাইয়ের কারণে পাইলটদের দৃশ্যমানতা কমে যায় এবং বিমানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে আকাশে ছাইয়ের ঘনত্ব বেশি থাকলে বিমান চলাচল বন্ধ রাখা আন্তর্জাতিকভাবেই প্রচলিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া, জলবায়ু ও ভূকম্পনবিষয়ক সংস্থা বিএমকেজির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, আগ্নেয়গিরির ছাই জাভার দিকে প্রায় ২০ হাজার ফুট এবং সুমাত্রার দিকে ৫০ হাজার ফুট বা প্রায় ১৫ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত পৌঁছেছে। বানটেন প্রদেশের কিছু এলাকাতেও ছাইয়ের মেঘ দেখা গেছে। বাতাসের গতিপথ ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে ছাই কোন দিকে কতটা ছড়িয়ে পড়বে, তা নিয়ে কর্তৃপক্ষকে সতর্ক অবস্থানে থাকতে হচ্ছে।

ইন্দোনেশিয়ার পরিবহনমন্ত্রী দুদি পুরওয়াগান্ধী বলেছেন, আবহাওয়া দ্রুত পরিবর্তনশীল হওয়ায় পরিস্থিতি কখন পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। ফলে বিমানবন্দর ও আকাশপথের কার্যক্রম স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে যাত্রীদের সুবিধার চেয়ে নিরাপত্তাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

বিমানবন্দরে আটকা পড়া যাত্রীদের দুর্ভোগের চিত্রও সামনে এসেছে। অনেক যাত্রী দীর্ঘ সময় ধরে ফ্লাইটের অপেক্ষায় টার্মিনালে অবস্থান করেছেন। কেউ কেউ বসার জায়গা না পেয়ে বিমানবন্দরের মেঝেতেই বিশ্রাম নিয়েছেন। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় বিদেশি পর্যটক ও ট্রানজিট যাত্রীদের মধ্যেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সিঙ্গাপুরগামী ও সিঙ্গাপুর থেকে আসা ফ্লাইটগুলো বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি দোহা, সিডনি ও কুয়ালালামপুরসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রুটেও এর প্রভাব পড়েছে।

এয়ারলাইনগুলোকে যাত্রী পুনর্বিন্যাস, ফ্লাইট পুনঃনির্ধারণ এবং বিকল্প রুটের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষও আটকে পড়া যাত্রীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে অগ্ন্যুৎপাত ও আবহাওয়ার পরিস্থিতি অনিশ্চিত থাকায় কখন সব ফ্লাইট স্বাভাবিক সময়সূচিতে ফিরবে, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত ঘোষণা পাওয়া যায়নি।

শুধু বিমান চলাচল নয়, অগ্ন্যুৎপাতের প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও। আগ্নেয় ছাই শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। চোখ ও ত্বকেও জ্বালাপোড়া হতে পারে। এ কারণে ইন্দোনেশিয়ার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ছাইপ্রবণ এলাকায় বাইরে বের হলে মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী মানুষকে ঘরের বাইরে কম বের হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

ছাইয়ের কারণে জাকার্তা ও ল্যাম্পুংয়ের শিক্ষা কার্যক্রমেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে কয়েকটি এলাকায় স্কুলের ক্লাস সাময়িকভাবে অনলাইনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের আগ্নেয় ছাইয়ের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখা এবং স্থানীয় পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

আনাক ক্রাকাতোয়ার আশপাশেও সতর্কতা জোরদার করা হয়েছে। আগ্নেয়গিরিটির চারপাশে নির্দিষ্ট নিরাপত্তা অঞ্চল বজায় রেখে মানুষ ও নৌযান চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, অগ্ন্যুৎপাত অব্যাহত থাকলে ছাই, গরম পাথর, আগ্নেয়গ্যাস ও লাভার মতো ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তবে সর্বশেষ পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক বড় ধরনের সুনামির আশঙ্কা নেই বলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

আগ্নেয়গিরি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, আনাক ক্রাকাতোয়া থেকে সর্বশেষ অগ্ন্যুৎপাতও রেকর্ড করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ মনে করছে, আগ্নেয়গিরিটির ভেতরে ম্যাগমা ও গ্যাসের কার্যক্রম এখনো সক্রিয় রয়েছে। ফলে সামনে আরও অগ্ন্যুৎপাত হতে পারে কি না, সে বিষয়ে সতর্ক নজর রাখা হচ্ছে। আগ্নেয়গিরির কার্যক্রমের মাত্রা নির্ধারণে ভূকম্পন, গ্যাস, ছাইয়ের উচ্চতা এবং অন্যান্য পর্যবেক্ষণ তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

আনাক ক্রাকাতোয়া নামের অর্থ ‘ক্রাকাতোয়ার সন্তান’। ১৮৮৩ সালের ভয়াবহ ক্রাকাতোয়া অগ্ন্যুৎপাতের পর সৃষ্ট বিশাল আগ্নেয়গিরির গর্ত বা ক্যালডেরার এলাকায় পরবর্তী সময়ে সমুদ্র থেকে নতুন আগ্নেয় দ্বীপ হিসেবে আনাক ক্রাকাতোয়ার উত্থান ঘটে। পুরোনো ক্রাকাতোয়ার সেই ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাত ইতিহাসের অন্যতম প্রাণঘাতী আগ্নেয় দুর্যোগ হিসেবে বিবেচিত। ওই অগ্ন্যুৎপাতের পর সৃষ্ট সুনামিতে ৩৬ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল।

আনাক ক্রাকাতোয়ার ইতিহাসও কম উদ্বেগের নয়। ২০১৮ সালে এই আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের সঙ্গে যুক্ত একটি ভূস্খলনের কারণে ভয়াবহ সুনামি সৃষ্টি হয়েছিল। জাভা ও সুমাত্রার উপকূলে আঘাত হানা সেই সুনামিতে চার শতাধিক মানুষ নিহত হন। ফলে বর্তমান অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনায় ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষ অতীতের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে।

ইন্দোনেশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’-এর ওপর অবস্থিত হওয়ায় দেশটিতে ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত নিয়মিত ঘটনা। দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকায় শতাধিক আগ্নেয়গিরি রয়েছে, যার কয়েকটি সক্রিয়। আনাক ক্রাকাতোয়ার সাম্প্রতিক অগ্ন্যুৎপাত আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, একটি আগ্নেয়গিরির কার্যক্রম কীভাবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিমান চলাচল, শিক্ষা, পর্যটন ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করা এবং একই সঙ্গে বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আকাশে ছাইয়ের উপস্থিতি যতক্ষণ ঝুঁকি তৈরি করবে, ততক্ষণ বিমানবন্দর চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হবে। ফলে আটকে পড়া যাত্রীদের দুর্ভোগ কত দ্রুত কাটবে এবং আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের স্বাভাবিক সময়সূচি কবে ফিরবে, তা নির্ভর করছে আনাক ক্রাকাতোয়ার অগ্ন্যুৎপাত ও বাতাসের গতিপথের ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত