রেকর্ড উৎপাদনের পথে চা, দাম নিয়ে শঙ্কা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩১ বার
রেকর্ড উৎপাদনের পথে চা, দাম নিয়ে শঙ্কা

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভোরের আলো ফুটতেই মৌলভীবাজারের চা বাগানগুলোতে শুরু হয় কর্মচাঞ্চল্য। সারি সারি সবুজ চা-গাছের মাঝখানে ঝুড়ি হাতে ছুটে চলেন শ্রমিকরা। কেউ কচি পাতা তুলছেন, কেউ সংগৃহীত পাতা নিয়ে যাচ্ছেন ওজনকেন্দ্রে। কারখানাগুলোতেও তখন ব্যস্ততা—বাগান থেকে আসা সবুজ পাতা দ্রুত প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করা হচ্ছে চা। অনুকূল আবহাওয়া ও আগাম বৃষ্টিতে এবার দেশের চা বাগানগুলোতে পাতার ফলন ভালো হওয়ায় সেই ব্যস্ততা বেড়েছে আরও কয়েক গুণ।

চলতি মৌসুমে দেশের চা শিল্পে তৈরি হয়েছে নতুন আশার সম্ভাবনা। উৎপাদনের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে রেকর্ড পরিমাণ চা উৎপাদন হতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে উৎপাদনের এই ইতিবাচক চিত্রের মধ্যেও বাগান মালিকদের বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে উৎপাদন খরচের তুলনায় নিলামে চায়ের কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়া। অন্যদিকে শ্রমিকদের পক্ষ থেকেও উৎপাদন বাড়ার সুফল ন্যায্যভাবে পাওয়ার দাবি উঠেছে।

চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত দেশে মোট ৪ কোটি ২৭ লাখ ৪১ হাজার কেজি চা উৎপাদন হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে উৎপাদন হয়েছিল ৩ কোটি ৫৯ লাখ ৮ হাজার কেজি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জুলাই পর্যন্ত উৎপাদন বেড়েছে ৬৮ লাখ ৩৩ হাজার কেজি। ২০২৬ সালে দেশে মোট ১০ কোটি ৪০ লাখ কেজি চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। উৎপাদনের বর্তমান গতি ধরে রাখা গেলে সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পাশাপাশি নতুন রেকর্ডও হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।

দেশে বর্তমানে ১৭৩টি চা বাগান রয়েছে। এর মধ্যে শুধু মৌলভীবাজারেই রয়েছে ৯২টি বাগান। আগাম বৃষ্টিপাত, অনুকূল তাপমাত্রা ও পর্যাপ্ত আর্দ্রতার কারণে এসব বাগানে এবার শুরু থেকেই চা পাতার বৃদ্ধি তুলনামূলক ভালো হয়েছে। একই সঙ্গে আধুনিক ব্যবস্থাপনা, উন্নত জাতের চারা, বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম এবং বাংলাদেশ চা বোর্ডের নিয়মিত তদারকিও উৎপাদন বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।

ভালো ফলনের কারণে চা শ্রমিকদের কর্মব্যস্ততাও বেড়েছে। নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে অতিরিক্ত পাতা সংগ্রহ করতে পারছেন অনেক শ্রমিক। বাগানভেদে কেউ প্রতিদিন ৪০ থেকে ১০০ কেজি পর্যন্ত অতিরিক্ত কাঁচা পাতা তুলতে পারছেন। অতিরিক্ত পাতার জন্য কেজিপ্রতি চার থেকে পাঁচ টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায়। ফলে দৈনিক হাজিরার পাশাপাশি অতিরিক্ত পাতার মাধ্যমে কিছু বাড়তি আয় করার সুযোগ তৈরি হয়েছে শ্রমিকদের।

চা শ্রমিক বিনা বাউরী, স্বপ্না দোসাদ ও স্বপ্না মুন্ডার ভাষ্য, আগাম বৃষ্টির কারণে এবার মৌসুমের শুরু থেকেই বাগানে ভালো পাতা এসেছে। প্রতিদিন নির্ধারিত পরিমাণ পাতা সংগ্রহের পরও তারা ৭০ থেকে ৮০ কেজি পর্যন্ত অতিরিক্ত পাতা তুলতে পারছেন। এতে তাদের আয় কিছুটা বাড়ছে। শ্রমিক পরিবারের জন্য এই অতিরিক্ত আয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দামের সময়ে।

উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি চায়ের নিলাম বাজারেও বিক্রির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য। আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত চট্টগ্রাম নিলাম কেন্দ্রে ৩ কোটি ২৭ লাখ ৮১৩ কেজি চা বিক্রি হয়েছে। এসব চায়ের গড় মূল্য ছিল কেজিপ্রতি ২৭৫ টাকা। একই সময়ে শ্রীমঙ্গল নিলাম কেন্দ্রে ৬ লাখ ৭৮ হাজার ২১৩ কেজি চা বিক্রি হয়েছে, যার গড় মূল্য ছিল ২৬০ টাকা। পঞ্চগড় নিলাম কেন্দ্রে বিক্রি হয়েছে ২ লাখ ৫৩ হাজার ৪৫০ কেজি চা, গড় মূল্য ছিল প্রায় ২৫২ টাকা।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত দেশের নিলামগুলোতে মোট ৯ কোটি ৬ লাখ ৭২ হাজার কেজি চা বিক্রি হয়েছে। এসব চায়ের গড় মূল্য ছিল কেজিপ্রতি ২৪৫ টাকা। ফলে উৎপাদন ও বিক্রির দিক থেকে চা শিল্পে সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

রপ্তানির ক্ষেত্রেও সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা আশাব্যঞ্জক চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৩ লাখ ৫০ হাজার কেজি চা রপ্তানি করে আয় হয়েছিল ৩৬ কোটি ১০ লাখ টাকা। পরের অর্থবছর ২০২৪-২৫ সালে রপ্তানির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১৯ লাখ ৮০ হাজার কেজি এবং আয় হয় ৪৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছে ৬ লাখ ৮০ হাজার কেজি চা, বিপরীতে আয় হয়েছে ১৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৫ লাখ ৯০ হাজার কেজি চা রপ্তানি হয়েছে, যার বিপরীতে আয় হয়েছে ১৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা।

তবে উৎপাদন ও বিক্রি বাড়লেও চা শিল্পের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে উৎপাদন খরচ। বাগান মালিকদের দাবি, বিদ্যুৎ, সার, জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি লোডশেডিংয়ের কারণে চা উৎপাদনে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু নিলাম বাজারে সেই বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দাম সব সময় পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে উৎপাদন বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত লাভ থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেক বাগান মালিক।

বাংলাদেশীয় চা সংসদ, ধলই ব্রাঞ্চের চেয়ারম্যান ও পাত্রখলা চা বাগানের ব্যবস্থাপক ইউসুফ খান বলেন, উৎপাদন খরচের তুলনায় চায়ের দাম যথেষ্ট নয়। বিদ্যুৎ, সার, তেল ও গ্যাসের বাড়তি খরচের সঙ্গে লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়েছে। কিন্তু প্রকৃত খরচ বিবেচনায় নিলামে চায়ের মূল্য না বাড়লে বাগান মালিকদের ওপর চাপ তৈরি হবে।

শ্রমিকদের মধ্যেও রয়েছে ভিন্ন ধরনের উদ্বেগ। উৎপাদন ও বিক্রি বাড়লেও সেই আয়ের সুফল শ্রমিকদের জীবনে কতটা পৌঁছাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শ্রমিক নেতারা। শমসেরনগর চা বাগান পঞ্চায়েত নেতা গোপাল কানু বলেন, বাগানের লাভ-ক্ষতির হিসাব শ্রমিকদের জানানো হয় না। অনেক শ্রমিকের বকেয়া পাওনা রয়েছে, আবার বেশ কিছু বাগান বন্ধও রয়েছে। নিলামে ভালো দাম পাওয়া গেলে শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধের পাশাপাশি বন্ধ বাগানগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

চা শ্রমিক সর্দার লক্ষন মাদ্রাজী, শ্যামল ভৌমিক ও আব্দুল আহাদও জানান, বর্তমানে বাগানে পাতা ভালো হওয়ায় অতিরিক্ত পাতা সংগ্রহ করে শ্রমিকরা বাড়তি আয় করতে পারছেন। তবে শুধু অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ নয়, শ্রমিকদের অন্যান্য ন্যায্য পাওনা ও সুযোগ-সুবিধাও নিশ্চিত করা জরুরি।

চা শিল্পের উৎপাদন বৃদ্ধির পেছনে আবহাওয়ার পাশাপাশি সমন্বিত ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশীয় চা সংসদ, সিলেট অঞ্চলের চেয়ারম্যান গোলাম মাওলা শিবলী বলেন, অনুকূল আবহাওয়ার সঙ্গে চা বোর্ডের নিয়মিত তদারকি, উন্নয়নমূলক কার্যক্রম এবং বাগান মালিকদের দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনার কারণে উৎপাদন বাড়ছে।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের উন্নয়ন ইউনিটের পরিচালক ড. একেএম রফিকুল হক বলেন, চা শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করায় উৎপাদন, নিলাম ও রপ্তানিতে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে। এই ধারা ধরে রাখতে বাগান ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি শ্রমিকদেরও উৎসাহিত করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ জানান, উৎপাদন বাড়াতে বাগানগুলোতে নিয়মিত তদারকি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, উন্নত জাতের চারা রোপণ এবং ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তার মতে, বর্তমানে দেশ চা উৎপাদনে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ এগিয়ে রয়েছে।

তিনি বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি চা রপ্তানি বাড়াতে সরকার ও চা বোর্ড কাজ করছে। চায়ের গুণগত মান ধরে রাখতে পারলে দেশীয় বাজারে ভালো দাম পাওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের চায়ের চাহিদা বাড়ানো সম্ভব।

বাংলাদেশের চা শিল্পের সামনে তাই একদিকে রয়েছে উৎপাদন বৃদ্ধির বড় সম্ভাবনা, অন্যদিকে রয়েছে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ। ভালো আবহাওয়া ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার ফলে বাগানে সবুজ পাতার সমারোহ যেমন আশার আলো দেখাচ্ছে, তেমনি উৎপাদন ব্যয়ের চাপ ও শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা নিয়ে প্রশ্নও সামনে আসছে। উৎপাদনের এই সাফল্যকে টেকসই করতে হলে বাগান মালিক, শ্রমিক, নিলাম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জরুরি। একই সঙ্গে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা গেলে দেশের চা শিল্প শুধু রেকর্ড উৎপাদনের মাইলফলকই ছুঁবে না, বরং শ্রমিক ও উৎপাদক—উভয়ের জন্যই আরও স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ তৈরি করতে পারবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত