স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একক প্রার্থী চায় বিএনপি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩২ বার
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একক প্রার্থী চায় বিএনপি

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দলীয় প্রতীক ও আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন না থাকলেও আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতিটি ইউনিয়নে একজন করে সমর্থিত প্রার্থী রাখার চেষ্টা করবে বিএনপি। স্থানীয় পর্যায়ে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে একক প্রার্থী নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তার ভাষ্য, নির্বাচন দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত না হলেও বিএনপি স্থানীয়ভাবে নিজেদের সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেবে।

বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। এর আগে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান এবং প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক। সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা ও বিএনপির অবস্থানের বিষয়ে কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী।

মীর শাহে আলম বলেন, আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় নির্বাচন হিসেবে অনুষ্ঠিত হবে না। ফলে নির্বাচনে কোনো দলীয় প্রতীক বা আনুষ্ঠানিক দলীয় মনোনয়নের ব্যবস্থা থাকবে না। আইন অনুযায়ী নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণকারী যেকোনো বৈধ প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন। নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাখতে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে আইনি যোগ্যতাকেই প্রধান বিবেচনা করা হবে বলে জানান তিনি।

তবে দলীয় প্রতীক না থাকার অর্থ বিএনপি নির্বাচনে নিজেদের সাংগঠনিক অবস্থান থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে থাকবে—বিষয়টি এমন নয়। প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী নির্ধারণের উদ্যোগ থাকবে। প্রতিটি ইউনিয়নে একাধিক দলীয় নেতাকর্মী বা সমর্থক প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলে স্থানীয়ভাবে আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে একজনকে সমর্থন দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।

এ ক্ষেত্রে উপজেলা বিএনপি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নে দল-সমর্থিত প্রার্থী কে হবেন, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকেও স্থানীয় বিএনপিকে প্রতিটি ইউনিয়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে একজন করে সমর্থিত প্রার্থী রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদসহ স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। রাস্তা, পানি, স্যানিটেশন, স্থানীয় অবকাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিসহ নানা নাগরিক সেবা বাস্তবায়নে এসব প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা রয়েছে। ফলে স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী নির্বাচন এবং ভোটের পরিবেশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আগামী নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকার বিষয়টি তাই রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। দলীয় প্রতীক না থাকলে প্রার্থীদের ব্যক্তিগত পরিচিতি, স্থানীয় জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং ভোটারদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে বড় রাজনৈতিক দলের স্থানীয় সমর্থনও প্রার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বিএনপি স্থানীয়ভাবে একক প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে দলটির তৃণমূল পর্যায়ে প্রার্থী বাছাই ও সমন্বয়ের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাবে। একই ইউনিয়নে দলের একাধিক নেতা প্রার্থী হতে চাইলে তাদের মধ্যে সমঝোতা তৈরি করা সহজ নাও হতে পারে। এ কারণে উপজেলা ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃত্বকে প্রার্থী নির্ধারণে সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে।

এদিকে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা দলীয় প্রতীক ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিলে বিএনপির অবস্থান কী হবে—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নেরও জবাব দেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিএনপি এ ক্ষেত্রে আলাদা কোনো অবস্থান নেবে না। সরকারের দায়িত্ব হবে নির্বাচন কমিশনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা।

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় সরকারের ভূমিকা এবং রাজনৈতিক দলের ভূমিকার মধ্যে একটি পার্থক্য স্পষ্ট করার চেষ্টা দেখা গেছে। তার মতে, বিএনপি একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে স্থানীয় পর্যায়ে নিজেদের সমর্থিত প্রার্থীকে সমর্থন করতে পারে। কিন্তু সরকার ও প্রশাসনের দায়িত্ব হবে সব বৈধ প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং নির্বাচন কমিশনকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা।

তিনি বলেন, যারা আইনানুযায়ী বৈধ প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেবেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। প্রার্থীরা যাতে নির্বিঘ্নে প্রচারণা চালাতে পারেন, সে জন্য স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় প্রশাসন নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করবে। নির্বাচনের পরিবেশ যেন কোনোভাবেই প্রভাবিত না হয়, সে বিষয়েও প্রশাসনের দায়িত্ব রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্রার্থীদের নিরাপত্তা প্রসঙ্গটিও স্থানীয় রাজনীতির বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে প্রার্থীদের মধ্যে বিরোধ, সমর্থকদের সংঘাত কিংবা স্থানীয় পর্যায়ে উত্তেজনা তৈরি হলে ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হতে পারে। তাই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং সব প্রার্থীর জন্য নিরাপদ প্রচারণার পরিবেশ নিশ্চিত করাকে নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে আবার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পাবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে মীর শাহে আলম বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সঙ্গে বিষয়টির সরাসরি সম্পর্ক তিনি দেখছেন না। তার বক্তব্য অনুযায়ী, নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টি নির্ধারিত হবে বিদ্যমান আইন ও প্রার্থীর যোগ্যতার ভিত্তিতে।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, সরকারের অবস্থান স্পষ্ট। আইন অনুযায়ী যোগ্যতা থাকা সব বৈধ প্রার্থীই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। কোনো প্রার্থীকে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে অযথা বাধা দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ রাখতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনায় নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক ও আইনগত দায়িত্ব থাকবে। সরকার ও প্রশাসন কমিশনকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে, যাতে ভোটাররা স্বাধীনভাবে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন। প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় বা স্থানীয় প্রভাবের কারণে যেন নির্বাচনী পরিবেশ বিঘ্নিত না হয়, সে বিষয়েও প্রশাসনের দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে তৃণমূল পর্যায়ে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দলীয় প্রতীক না থাকায় প্রার্থীদের প্রচারণার ধরনও আগের তুলনায় ভিন্ন হতে পারে। স্থানীয়ভাবে পরিচিতি, ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা এবং ভোটারদের সঙ্গে সম্পর্ককে সামনে রেখে প্রার্থীরা প্রচারণা চালাতে পারেন। তবে বড় রাজনৈতিক দলের সমর্থন পাওয়া প্রার্থীদের সাংগঠনিক সুবিধা থাকবে কি না, সেটিও নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে।

বিএনপির একক প্রার্থী রাখার উদ্যোগ সফল হলে স্থানীয় পর্যায়ে দলটির ভোট বিভক্তির ঝুঁকি কমতে পারে। একই সঙ্গে একাধিক প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কমিয়ে একটি নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে দলীয় সমর্থন কেন্দ্রীভূত করার সুযোগ তৈরি হবে। তবে প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ায় স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হলে সেটি সামাল দেওয়াও দলটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

সব মিলিয়ে আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশল, প্রার্থী বাছাই এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা—তিনটি বিষয়ই বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। বিএনপি দলীয় প্রতীক ছাড়া নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে একক প্রার্থীকে সমর্থনের নীতি গ্রহণ করেছে বলে প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে এসেছে। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে সব আইনসম্মত প্রার্থীর জন্য নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচন কতটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য হয়, তা নির্ভর করবে প্রার্থী ও ভোটারদের অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণ, নির্বাচন কমিশনের ব্যবস্থাপনা এবং মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকার ওপর। সাধারণ ভোটারদের প্রত্যাশা থাকবে, স্থানীয় নেতৃত্ব নির্বাচনের এই প্রক্রিয়ায় যেন ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ অবাধ থাকে এবং যোগ্য প্রার্থীরা সমানভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত