নওগাঁয় ধান-চালের দাম কমেছে, হতাশ কৃষক

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩৪ বার
নওগাঁয় ধান-চালের দাম কমেছে, হতাশ কৃষক

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নওগাঁয় দেশের অন্যতম বড় ধান ও চালের মোকামে আবারও কমেছে ধান ও চালের দাম। পাইকারি বাজারে চালের দর কমে যাওয়ায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে ভোক্তাদের মধ্যে। তবে বিপরীত চিত্র ধানের বাজারে। ধানের দাম ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ তুলতে না পারার আশঙ্কায় হতাশ হয়ে পড়েছেন কৃষকেরা। বিশেষ করে আউশ ধানের দাম এক সপ্তাহের ব্যবধানে মণপ্রতি সর্বোচ্চ ৫০ টাকা কমে যাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, নওগাঁর মোকামে বর্তমানে চালের পাইকারি বেচাকেনা আগের তুলনায় কমেছে। ফলে বিভিন্ন গুদামে চালের মজুত বাড়ছে। স্থানীয় বাজারে চাহিদা কম থাকায় ব্যবসায়ীদের ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রামের ক্রেতাদের কাছেও অনুরোধের ভিত্তিতে চাল বিক্রি করতে হচ্ছে। বিক্রি বাড়াতে অনেক ব্যবসায়ী আগের তুলনায় কিছুটা কম দামেও চাল ছাড়ছেন। এর প্রভাব পড়েছে ধানের বাজারেও। চালের চাহিদা কম থাকায় মিলমালিকেরা ধান কেনার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন, যার কারণে কৃষকদের উৎপাদিত ধান বাজারে এনে আশানুরূপ দাম পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার জানান, গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি চাল আমদানি করা হয়েছিল। এর ফলে দেশে বর্তমানে চালের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। বাজারে সেই মজুতের প্রভাব পড়ায় মোকামে নতুন করে চাল কেনাবেচার চাহিদা কমেছে। একই কারণে মিলমালিকদের ধান কেনার আগ্রহও কমে গেছে।

তিনি বলেন, গত তিন থেকে চার বছরের তুলনায় চলতি বছর ধান ও চালের দাম সবচেয়ে নিচের দিকে রয়েছে। চালের চাহিদা না থাকায় মিলমালিকেরা কম পরিমাণে ধান কিনছেন। এতে আউশ ধানের দামও কমে গেছে। কৃষকেরা যাতে উৎপাদিত ধানের ন্যায্য মূল্য পান, সে জন্য আউশ মৌসুমেও সরকারের পক্ষ থেকে ধান ও চাল কেনার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তার মতে, সরকারের কার্যকর ও সময়োপযোগী উদ্যোগই কৃষক এবং চাল ব্যবসায়ী—উভয় পক্ষকে এই পরিস্থিতি থেকে বের করে আনতে পারে।

স্থানীয় ধান-চাল ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে নওগাঁর বাজারে আউশ ধানের মধ্যে পারিজা ও ব্রি ধান-৪৮ প্রতি মণ ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। মাত্র এক সপ্তাহ আগেও এসব ধানের দাম ছিল ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা। অর্থাৎ এক সপ্তাহের ব্যবধানে মণপ্রতি দাম সর্বোচ্চ ৫০ টাকা কমেছে। এক বছর আগে একই সময়ে এই ধানের দাম ছিল ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০ টাকা। ফলে গত বছরের তুলনায় এবার আউশ ধানের দাম অনেকটাই কম।

গত ইরি-বোরো মৌসুমে উৎপাদিত কাটারি ধানের দামও কমেছে। বর্তমানে প্রতি মণ কাটারি ধান ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছরের একই সময়ে এই ধানের দাম ছিল ১ হাজার ৮০০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মণপ্রতি দাম কমেছে প্রায় ২০০ টাকা।

জিরা ধানের বাজার পরিস্থিতি আরও খারাপ। বর্তমানে প্রতি মণ জিরা ধান বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা দরে। গত বছরের একই সময়ে এই ধানের দাম ছিল ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এবার জিরা ধানের দাম মণপ্রতি সর্বোচ্চ ৪০০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। ধানের এমন দরপতনে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন যেসব কৃষক উৎপাদনের পরপরই ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

ধানের পাশাপাশি নওগাঁর মোকামে কমেছে বিভিন্ন ধরনের চালের দামও। বর্তমানে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি জিরা চাল ৫৬ থেকে ৬১ টাকা এবং কাটারি চাল ৭৩ থেকে ৭৪ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, এক সপ্তাহের ব্যবধানে এসব চালের দাম কেজিতে প্রায় দুই টাকা কমেছে। এক মাসের হিসাব করলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দাম কমেছে তিন থেকে পাঁচ টাকা পর্যন্ত।

মোটা চাল হিসেবে পরিচিত স্বর্ণা চালের দামও কমেছে। বর্তমানে নওগাঁর পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি স্বর্ণা চাল ৪২ থেকে ৪৪ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগে একই চালের দাম ছিল ৪৬ থেকে ৪৮ টাকা। অর্থাৎ মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে প্রতি কেজি স্বর্ণা চালের দাম প্রায় চার টাকা পর্যন্ত কমেছে।

চালের দাম কমে যাওয়ায় সাধারণ ভোক্তাদের জন্য কিছুটা স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হলেও কৃষকদের জন্য পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক নয়। কারণ চালের বাজারে দাম কমার সঙ্গে সঙ্গে ধানের দামও কমছে। অথচ কৃষকের উৎপাদন ব্যয় একই হারে কমেনি। জমি প্রস্তুত, বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের মজুরিসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় করার পর বাজারে ধান বিক্রি করে সেই অর্থ তুলতে না পারলে কৃষকের ওপর আর্থিক চাপ আরও বাড়বে।

এদিকে ধান ও চালের বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং খাদ্যশস্যের মান নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসনও তৎপর হয়েছে। বৃহস্পতিবার নওগাঁ জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে জেলার চালকল মালিকদের নিয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. ফরহাদ খোন্দকারসহ স্থানীয় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় চালের মজুত, বাজার পরিস্থিতি এবং চালের মান ও নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

সভায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম চালের মান নিয়ে মিলমালিকদের সতর্ক করেন। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে চালে কৃত্রিমভাবে সুগন্ধি মেশানো হয়। এ ধরনের কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে তিনি স্পষ্ট করে দেন। একই সঙ্গে চালকে অতিরিক্ত সাদা করার জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক ‘হাইড্রোজ’ ব্যবহার না করার জন্যও মিলমালিকদের নির্দেশ দেওয়া হয়।

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. ফরহাদ খোন্দকার বলেন, দেশে বর্তমানে চালের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। ফলে আগামী তিন মাসে চালের দাম বাড়ার আশঙ্কা নেই। তবে কোনো ব্যবসায়ী অবৈধভাবে চাল মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরির মাধ্যমে বাজারে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, চালের বাজার মোটামুটি স্থিতিশীল থাকলেও ধানের দাম কমে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকেরা কীভাবে তাঁদের উৎপাদন ব্যয় তুলবেন, সেটি নিয়ে চিন্তা করা হচ্ছে। কৃষকের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে আউশ মৌসুমে সরকারি উদ্যোগে চাল কেনার পাশাপাশি ধান থেকে বায়োফুয়েল উৎপাদনের সম্ভাবনাও বিবেচনা করা যেতে পারে বলে ব্যবসায়ীদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

নওগাঁ দেশের গুরুত্বপূর্ণ ধান ও চাল উৎপাদন এবং বিপণনকেন্দ্র হওয়ায় এখানকার বাজারদরের পরিবর্তনের প্রভাব দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারেও পড়ে। ফলে বর্তমান দরপতন শুধু স্থানীয় কৃষক বা ব্যবসায়ীদের বিষয় নয়; এর সঙ্গে ভোক্তা, মিলমালিক, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতাসহ পুরো খাদ্যশস্য বাজারব্যবস্থা জড়িত। চালের দাম কমে সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তি এলেও উৎপাদনের মূল পর্যায়ে কৃষক যদি ন্যায্য দাম না পান, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে ধান উৎপাদনে অনাগ্রহ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কৃষকেরা মনে করছেন, উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধানের দাম নিশ্চিত করা না গেলে তাঁদের লোকসান আরও বাড়বে। বিশেষ করে আউশ ধানের বর্তমান দর উৎপাদন খরচের তুলনায় কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা, সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রম জোরদার করা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানোর মাধ্যমে কৃষকের হাতে ন্যায্য মূল্য পৌঁছে দেওয়া এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

চালের বাজার স্থিতিশীল রাখা যেমন জরুরি, তেমনি ধান উৎপাদনকারী কৃষকের স্বার্থ রক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কৃষক ন্যায্য মূল্য না পেলে বাজারে চালের দাম কম থাকার সুফল দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। তাই ভোক্তার স্বস্তি এবং কৃষকের ন্যায্য আয়ের মধ্যে ভারসাম্য রেখে ধান-চালের বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত