লংমার্চ নিয়ে প্রশ্ন তুললেন ফয়জুল করীম

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৫ বার
লংমার্চ নিয়ে প্রশ্ন তুললেন ফয়জুল করীম

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত লংমার্চ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম। তিনি জানতে চেয়েছেন, সরকারকে নিয়ে বিরোধী দলের বক্তব্যে যদি ইতিবাচকতার ইঙ্গিত থাকে, তাহলে সরকারের বিরুদ্ধে লংমার্চ আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা কোথায়। একই সঙ্গে এ ধরনের কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি এবং বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ব্যয়ের বিষয়টিও সামনে আনেন তিনি।

বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর পুরানা পল্টনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন ফয়জুল করীম। ‘হেবা আইনের বিতর্কিত সংশোধন প্রসঙ্গে শরিয়াহ ও আমাদের অবস্থান’ শীর্ষক ওই সংবাদ সম্মেলনে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

বিরোধী দলের লংমার্চ প্রসঙ্গে ফয়জুল করীম বলেন, তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তারা কী করছে এবং কী বলছে, সেটি অনেক সময় স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একদিকে সরকারের বিরুদ্ধে লংমার্চ করা হচ্ছে, অন্যদিকে সংসদে বলা হচ্ছে যে বর্তমান পরিস্থিতি সরকারের সৃষ্টি নয় এবং সরকার বিষয়টি নিয়ে আন্তরিক। এই দুই ধরনের অবস্থানের মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি সরকার আন্তরিক হয় এবং বিষয়টি সরকারের তৈরি না হয়ে থাকে, তাহলে সরকারের বিরুদ্ধে লংমার্চ করার প্রয়োজন কেন হলো। একই সঙ্গে তিনি বলেন, একটি লংমার্চের কারণে মানুষের স্বাভাবিক চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হতে পারে, যানজট ও জনভোগান্তি বাড়তে পারে। এর পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ব্যয় হয়। তাই কর্মসূচির রাজনৈতিক ও বাস্তব সার্থকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে ফয়জুল করীম তাঁর দলের রাজনৈতিক অবস্থানও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত এমন কোনো কর্মসূচি দেয়নি, যার কারণে সরকার চাপে পড়তে বাধ্য হয়েছে। এর পেছনে কারণ হিসেবে তিনি সরকারকে কিছুটা সময় দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে সময় প্রয়োজন হতে পারে। তাই একদিকে সরকারকে বক্তব্যের মাধ্যমে চাপের মধ্যে রাখা হচ্ছে, অন্যদিকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় সময়ও দেওয়া হচ্ছে।

ফয়জুল করীম বলেন, সরকারকে তারা বিভিন্ন বক্তব্যের মাধ্যমে চাপের মধ্যে রাখবেন এবং সমস্যাগুলোর সমাধানের জন্য সময় দেবেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকার যদি প্রত্যাশিতভাবে সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে। তাঁর ভাষায়, এমন কর্মসূচি দেওয়া হবে যাতে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হতে হয়।

বর্তমান সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে ইসলামী আন্দোলনের এই নেতা বলেন, সরকারের মেয়াদ ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই সরকারের বিরুদ্ধে লংমার্চের মতো কর্মসূচি হয়েছে। একই সময়ে দেশে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের পরিস্থিতি এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। যানজটের মতো দীর্ঘদিনের নাগরিক সমস্যারও কার্যকর সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ফয়জুল করীমের বক্তব্যে সরকারের প্রতি মূলত অর্থনীতি, জনজীবন ও নাগরিক সেবার দিকে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান উঠে আসে। তাঁর মতে, এসব সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরিবর্তে সরকার হঠাৎ করে শরিয়াহবিরোধী হিসেবে বিবেচিত একটি আইন প্রণয়নের দিকে এগিয়েছে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করলে সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে আসতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষ নতুন ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা করেছিল বলেও মন্তব্য করেন ফয়জুল করীম। তিনি বলেন, তাঁরা আশা করেছিলেন ইসলাম অনুযায়ী দেশ পরিচালনার বিষয়ে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। সরকার যদি সেই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়, তাহলে ভবিষ্যতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আবারও রাজপথে কর্মসূচি দিতে পারে।

সংবাদ সম্মেলনের বড় একটি অংশজুড়ে ছিল হেবা-সংক্রান্ত আইন নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের আপত্তি। ফয়জুল করীম দাবি করেন, সম্পত্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত সংশোধিত আইনের বিষয়ে দেশের আলেমরা আগেই ভিন্নমত জানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, শরিয়াহসংক্রান্ত একটি বিষয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে খ্রিষ্টান পণ্ডিতদের মতামত বা রেফারেন্স ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁর মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ দেশের ওলামায়ে কেরাম, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও নিজস্ব জ্ঞানচর্চার প্রতি উপেক্ষার প্রকাশ।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার কুরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন করবে না বলে একাধিকবার অঙ্গীকার করেছে। কিন্তু সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস না পেরোতেই এমন একটি আইন পাস করা হয়েছে, যা ইসলামী আন্দোলনের দৃষ্টিতে শরিয়াহবিরোধী। দলটি এ আইনের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে এবং অবিলম্বে আইনটি বাতিলের দাবি করছে।

এ দাবিকে সামনে রেখে শুক্রবার দেশের সব বিভাগীয় শহরে সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করেন ফয়জুল করীম। তিনি ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) আইন-২০২৬’ আরও পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আইনটির বিভিন্ন দিক নতুন করে বিবেচনা করা এবং সংশ্লিষ্টদের মতামত গ্রহণ করা প্রয়োজন।

সংবাদ সম্মেলনে নারী সাংবাদিকদের অংশগ্রহণ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। অনুষ্ঠানে এক নারী সংবাদকর্মীকে সামনের সারি থেকে সরিয়ে পেছনে বসানোর অভিযোগের পর একজন সাংবাদিক জানতে চান, ইসলামী আন্দোলনের অনুষ্ঠানে নারী সাংবাদিকদের সামনে বসার সুযোগ থাকবে কি না।

জবাবে ফয়জুল করীম বলেন, নারী সাংবাদিকদের পর্দা মেনে অনুষ্ঠানে আসতে হবে। এ সময় সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে দলের নেতাদের টেলিভিশন টকশোতে নারীদের সঙ্গে অংশগ্রহণের প্রসঙ্গ তোলা হয়। ফয়জুল করীম দাবি করেন, শরিয়াহবিরোধী কোনো পরিবেশ বা কর্মকাণ্ড হলে তাঁরা সেটির বিরোধিতা করবেন।

তিনি বলেন, কোনো নারী সাংবাদিকতা করলে তাঁরা তাঁকে সাংবাদিকতা থেকে বাধা দিচ্ছেন না। তবে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই নারীকে ইসলামী বিধান বা শরিয়াহসম্মতভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। শরিয়াহ মানার সুযোগ করে দেওয়ার বিষয়টিও তিনি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেন।

সংবাদ সম্মেলনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব গাজী আতাউর রহমানসহ দলের বেশ কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিলেন। রাজনৈতিক কর্মসূচি, সরকারের কার্যক্রম এবং হেবা-সংক্রান্ত আইন নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি ফয়জুল করীমের বক্তব্যে সরকারের প্রতি একদিকে সময় দেওয়ার এবং অন্যদিকে নির্দিষ্ট বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার চাপ—দুই ধরনের বার্তাই উঠে এসেছে।

বিরোধী দলের লংমার্চ নিয়ে তাঁর প্রশ্ন রাজনৈতিক অঙ্গনে কর্মসূচির কার্যকারিতা, জনভোগান্তি এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের সামঞ্জস্য নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে হেবা আইনের সংশোধন নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের আপত্তি এবং শুক্রবারের বিভাগীয় পর্যায়ের কর্মসূচি ঘিরে পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেদিকেও নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট মহলের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত