সর্বশেষ :

আগামীকাল নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলন শুরু

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪৫ বার
আগামীকাল নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলন শুরু

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জোট ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন আগামীকাল শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শুরু হচ্ছে। দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলন চলবে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। সম্মেলনকে ঘিরে ইতোমধ্যে নয়াদিল্লিতে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থা। বিশ্ব রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন নেতা রাজধানীতে পৌঁছানোয় শহরের কূটনৈতিক এলাকা, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও ভিভিআইপি চলাচলের পথে নেওয়া হয়েছে বাড়তি সতর্কতা।

ভারতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এবারের সম্মেলনটি এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতি একাধিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিম এশিয়ার চলমান সামরিক সংঘাত, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক বাণিজ্যে চাপ, বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় ডলারের আধিপত্য কমানোর আলোচনা—সব মিলিয়ে এবারের বৈঠককে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সম্মেলনে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক ও আর্থিক সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক নানা সংকট নিয়েও মতবিনিময়ের সম্ভাবনা রয়েছে।

ভারত সরকার জানিয়েছে, ২০২৬ সালে দেশটির ব্রিকস সভাপতিত্বের মূল ভাবনা হলো স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়নকে সামনে রেখে জোটের কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ, মানুষের কল্যাণ এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের ভূমিকা আরও জোরালো করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ভারত এ বছর ব্রিকসের চতুর্থবারের মতো সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে। ২০২৬ সালেই ব্রিকস প্রতিষ্ঠার ২০ বছর পূর্ণ হচ্ছে।

নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে অনুষ্ঠেয় শীর্ষ সম্মেলনে ব্রিকসের ১১ সদস্য দেশের নেতাদের পাশাপাশি অংশীদার ও আমন্ত্রিত দেশগুলোর প্রতিনিধিরাও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। বর্তমানে জোটটির সদস্য ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া ও সৌদি আরব। এই দেশগুলো সম্মিলিতভাবে বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি বড় অংশের প্রতিনিধিত্ব করে। ফলে ব্রিকসের সিদ্ধান্ত ও আলোচনার প্রভাব শুধু সদস্য দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও কূটনীতিতেও এর প্রতিফলন দেখা যায়।

সম্মেলনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা এবং ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোয়ো সুবিয়ান্তোসহ গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের উপস্থিতি এবারের আয়োজনকে আরও আলোচিত করে তুলেছে। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের অংশগ্রহণ বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। ভারতের আমন্ত্রণে তিনি ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও সম্মেলনে যোগ দিতে নয়াদিল্লিতে পৌঁছেছেন। তাঁর সফরকে ঘিরে ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের পাশাপাশি জ্বালানি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোও আলোচনায় আসতে পারে। একইভাবে শি জিনপিংয়ের উপস্থিতি ভারত-চীন সম্পর্কের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্ত বিরোধ ও দীর্ঘদিনের পারস্পরিক অবিশ্বাসের পর দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর যে চেষ্টা চলছে, ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় সেটি নতুন মাত্রা পেতে পারে।

তবে এবারের সম্মেলনের সবচেয়ে জটিল বিষয়গুলোর একটি হতে পারে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত। ইরান ব্রিকসের সদস্য হওয়ার পর দেশটির সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অবস্থানও আলোচনাকে জটিল করে তুলতে পারে। চলমান সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও বাণিজ্যপথে পড়েছে। বিশেষ করে তেল সরবরাহ ও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় ব্রিকসের নেতাদের আলোচনায় জ্বালানি নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে সম্মেলনের যৌথ ঘোষণায় পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত নিয়ে কী ধরনের ভাষা ব্যবহার করা হবে, সেদিকেও আন্তর্জাতিক মহলের নজর থাকবে। কারণ একই জোটে এমন দেশ রয়েছে, যাদের আঞ্চলিক ও কৌশলগত স্বার্থ এক নয়। ফলে সব সদস্যকে সন্তুষ্ট রেখে একটি অভিন্ন অবস্থান তৈরি করা ব্রিকস নেতৃত্বের জন্য সহজ হবে না। তবু কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য অবস্থান তৈরির চেষ্টা চলছে বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা।

অর্থনৈতিক সহযোগিতাও এবারের সম্মেলনের অন্যতম প্রধান আলোচ্য হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানো, অর্থনৈতিক লেনদেনে বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর বিষয়ে ব্রিকসের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। তবে সদস্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক কাঠামো, মুদ্রানীতি ও জাতীয় স্বার্থে পার্থক্য থাকায় বড় ধরনের অভিন্ন আর্থিক ব্যবস্থা বাস্তবায়ন এখনো একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। তাই তাৎক্ষণিক বড় পরিবর্তনের পরিবর্তে বাস্তবসম্মত ও ধাপে ধাপে সহযোগিতার উদ্যোগই বেশি গুরুত্ব পেতে পারে।

ব্রিকসের বিস্তারের পর জোটটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের চ্যালেঞ্জও। একদিকে চীন ও রাশিয়ার মতো বড় শক্তি পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিকল্প কাঠামো জোরদারের পক্ষে অবস্থান করছে। অন্যদিকে ভারতসহ কিছু দেশ ব্রিকসকে কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক জোটে পরিণত না করে উন্নয়ন, অর্থনীতি ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখতে চায়। এই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেই এবারের সম্মেলনে ঐকমত্য গড়ে তোলার চেষ্টা হবে।

নয়াদিল্লিতে বিশ্বনেতাদের আগমনকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তাব্যবস্থাও ব্যাপকভাবে জোরদার করা হয়েছে। কূটনৈতিক এলাকা, সম্মেলনস্থল এবং রাষ্ট্রপ্রধানদের চলাচলের পথগুলোতে বাড়তি নজরদারি রাখা হয়েছে। বিভিন্ন দেশের নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও নিজ নিজ রাষ্ট্রপ্রধানের নিরাপত্তা সমন্বয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করছেন। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা তল্লাশির কারণে স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের দৈনন্দিন চলাচলেও কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে এবারের ব্রিকস সম্মেলন কেবল একটি নিয়মিত আন্তর্জাতিক বৈঠক নয়; বরং পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় উদীয়মান শক্তিগুলোর ভবিষ্যৎ ভূমিকা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। অর্থনৈতিক সহযোগিতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, আঞ্চলিক সংঘাত এবং বহুমুখী কূটনীতির নানা প্রশ্নে নয়াদিল্লির বৈঠক থেকে কী ধরনের বার্তা আসে, তা গভীর আগ্রহ নিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে বিশ্ব। বিশেষ করে যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় বিপর্যস্ত সময়ে ব্রিকস সদস্যরা নিজেদের মধ্যে কতটা ঐক্য তৈরি করতে পারে এবং বাস্তবসম্মত কী উদ্যোগ নিতে পারে, সেটিই এবারের সম্মেলনের বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com