হৃদরোগের অবনতিতে গৃহবন্দিত্ব চান মাদুরোর স্ত্রী

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩১ বার
হৃদরোগের অবনতিতে গৃহবন্দিত্ব চান মাদুরোর স্ত্রী

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা ভেনেজুয়েলার সাবেক ফার্স্ট লেডি সিলিয়া ফ্লোরেস দে মাদুরো হৃদরোগের অবনতির কথা জানিয়ে কারাগার থেকে মুক্তি এবং বিচার শুরু হওয়া পর্যন্ত গৃহবন্দি রাখার আবেদন করেছেন। তার আইনজীবীরা নিউইয়র্কের একটি ফেডারেল আদালতের কাছে এ আবেদন জানিয়েছেন। তাদের দাবি, ভেনেজুয়েলা থেকে আটকের পর যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসার সময় থেকে ফ্লোরেসের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে এবং বর্তমানে তার হৃদ্‌যন্ত্রের চিকিৎসার জন্য বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন।

আইনজীবীদের আবেদনে বলা হয়েছে, বিচার শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত ফ্লোরেসকে ব্রুকলিনের মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারের পরিবর্তে ম্যানহাটনের একটি বাসায় গৃহবন্দি রাখার অনুমতি দেওয়া হলে তার চিকিৎসা ও সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য তুলনামূলকভাবে উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। আদালতের কাছে দেওয়া আবেদনে তারা ফ্লোরেসের হৃদ্‌যন্ত্রের বর্তমান পরিস্থিতি, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং সম্ভাব্য চিকিৎসার বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন।

শুক্রবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, এর আগে বুধবার আদালতে জমা দেওয়া আবেদনে ফ্লোরেসের আইনজীবীরা দাবি করেন, ভেনেজুয়েলা থেকে আটকের আগে তিনি শারীরিকভাবে সুস্থ ছিলেন। নিয়মিত কোনো ওষুধও তাকে নিতে হতো না। তবে তার হৃদ্‌যন্ত্রের মাইট্রাল ভালভ প্রোল্যাপস নামের একটি সমস্যা ছিল, যা নিয়ন্ত্রণে তিনি মাসে একবার একটি ইনজেকশন নিতেন। আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে আটকের পর সেই চিকিৎসার ধারাবাহিকতা আর বজায় থাকেনি।

বর্তমানে ফ্লোরেসকে চার ধরনের ওষুধ নিতে হচ্ছে বলে আদালতকে জানিয়েছেন তার আইনজীবীরা। সম্ভাব্য হৃদ্‌যন্ত্রের জটিলতা সামাল দিতে তিনি সঙ্গে নাইট্রোগ্লিসারিন রাখছেন। চিকিৎসকেরা তার হৃদ্‌যন্ত্রের আরও পরীক্ষা এবং ভবিষ্যতে অস্ত্রোপচারের সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছেন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক দাবি হিসেবে আইনজীবীরা জানিয়েছেন, গত ২৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা অবস্থায় ফ্লোরেসের ছোট ধরনের হার্ট অ্যাটাক হয়ে থাকতে পারে। বাইরের চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করার পর তারা এমন আশঙ্কা করছেন। যদিও এ বিষয়ে চূড়ান্ত চিকিৎসা-নির্ণয়ের তথ্য প্রকাশ করা হয়নি, তবে তার আইনজীবীরা মনে করছেন, মাইট্রাল ভালভ প্রোল্যাপসের মতো পূর্ববর্তী হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যার পাশাপাশি নতুন করে দেখা দেওয়া উপসর্গগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

আবেদনে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে আটকের পর থেকে ফ্লোরেস তার হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যার জন্য নিয়মিত যে মাসিক ইনজেকশন নিতেন, তা পাননি। এর পরিবর্তে তাকে বেবি অ্যাসপিরিন, স্ট্যাটিন ও ডিলটিয়াজেম দেওয়া হচ্ছে। বুকব্যথা দেখা দিলে ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়েছে নাইট্রোগ্লিসারিনও। আইনজীবীদের মতে, এই চিকিৎসা চললেও দীর্ঘমেয়াদি পরিস্থিতি বিবেচনায় তার আরও নিবিড় চিকিৎসা এবং পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন হতে পারে।

ফ্লোরেসের চিকিৎসা নিয়ে আবেদনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও উঠে এসেছে। তার আইনজীবীরা স্বীকার করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসকেরা তাকে ‘চমৎকার চিকিৎসা’ দিয়েছেন। অর্থাৎ তাদের আপত্তি চিকিৎসার মান নিয়ে নয়; বরং আটককেন্দ্রের পরিবেশে চিকিৎসার পর পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পর্যবেক্ষণ এবং সুস্থ হয়ে ওঠার সুযোগ পাওয়া কঠিন বলে তারা মনে করছেন। সম্ভাব্য অস্ত্রোপচার বা দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে একটি বাসাবাড়ির তুলনামূলক স্বাভাবিক পরিবেশ তার জন্য বেশি উপযোগী হতে পারে বলেও তারা যুক্তি দিয়েছেন।

এই পরিস্থিতিতে ফ্লোরেসকে ম্যানহাটনের একটি বাসায় স্থানান্তরের প্রস্তাব দিয়েছে তার আইনজীবী দল। তবে সেটি কোনো সাধারণ মুক্তি হবে না। আবেদনে প্রস্তাবিত ব্যবস্থার আওতায় তাকে সার্বক্ষণিক সশস্ত্র নজরদারির মধ্যে রাখা হবে। আদালত ও ফেডারেল প্রসিকিউটরদের অনুমোদন ছাড়া অন্য কেউ তার সঙ্গে দেখা করতে পারবেন না। তার অবস্থান পর্যবেক্ষণে ভিডিও নজরদারির ব্যবস্থা থাকবে এবং ফোনকল রেকর্ড করার ব্যবস্থাও রাখা হতে পারে। অর্থাৎ চিকিৎসার সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আদালতের কাছে তার অবস্থান ও চলাফেরার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার প্রস্তাবই দেওয়া হয়েছে।

তবে ফ্লোরেসের আবেদনের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেননি বিচারক অ্যালভিন কে. হেলারস্টেইন। ফলে তিনি কারাগার থেকে বাসায় স্থানান্তরের সুযোগ পাবেন কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। আদালতের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে তার পরবর্তী অবস্থান এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার ধরন।

ফ্লোরেসের বিরুদ্ধে করা মামলাটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ৬৯ বছর বয়সী ফ্লোরেস এবং তার স্বামী ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গত ৩ জানুয়ারি কারাকাসে তাদের বাড়ি থেকে মার্কিন বাহিনী আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যায় বলে তার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এরপর থেকে তারা মার্কিন হেফাজতে রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে কোকেন পাচারের ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে করা মামলায় দুজনই নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছেন।

ফ্লোরেস ২০১৩ সালে মাদুরো ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশটির ফার্স্ট লেডির দায়িত্ব পালন করেন। রাজনীতিতেও তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি ক্ষমতাসীন ইউনাইটেড সোশ্যালিস্ট পার্টির গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং চার বছরেরও বেশি সময় ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের নেতৃত্ব দিয়েছেন। ফলে তার বর্তমান আইনি অবস্থান শুধু একটি ফৌজদারি মামলার বিষয় নয়, বরং ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।

নিকোলাস মাদুরো দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিরোধে জড়িত। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে তার সরকারের সম্পর্ক ছিল তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ। মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন, সহিংসতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও বহুদিনের। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভেনেজুয়েলা থেকে মাদক পাচারের অভিযোগ তোলা হয়েছে এবং মাদুরো ও ফ্লোরেসের বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।

এদিকে ফ্লোরেসের আইনজীবীদের সর্বশেষ আবেদন মামলাটিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। একদিকে রয়েছে গুরুতর ফৌজদারি অভিযোগ এবং আদালতের বিচারপ্রক্রিয়া, অন্যদিকে রয়েছে একজন ৬৯ বছর বয়সী নারীর হৃদ্‌যন্ত্রের জটিলতা ও সম্ভাব্য অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন। ফলে আদালতের সামনে এখন শুধু তিনি জামিন বা গৃহবন্দিত্বের উপযুক্ত কি না, সেই প্রশ্নই নয়; তার চিকিৎসা, নিরাপত্তা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য রাখা যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আইনজীবীদের আবেদন মঞ্জুর হলে কঠোর নজরদারির মধ্যেই ম্যানহাটনের একটি বাসায় থেকে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ পাবেন ফ্লোরেস। আর আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে তাকে আটককেন্দ্রেই থাকতে হবে এবং সেখান থেকেই মামলার পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে হবে। বিচারকের সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত তাই সাবেক ভেনেজুয়েলীয় ফার্স্ট লেডির শারীরিক অবস্থা ও আইনি লড়াই—দুই দিকই আন্তর্জাতিক মহলের নজরে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত