কঙ্গোর স্কুলে ভয়াবহ আগুন, প্রাণ গেল ২৯ জনের

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৩ বার
কঙ্গোর স্কুলে আগুন, প্রাণ গেল ২৯ জনের

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের (ডিআর কঙ্গো) পূর্বাঞ্চলীয় শহর বুকাভুতে একটি স্কুল ও আশপাশের এলাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ২৯ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের বেশিরভাগই শিশু শিক্ষার্থী। বৃহস্পতিবার সকালে দক্ষিণ কিভু প্রদেশের রাজধানী বুকাভুর চিম্পুন্ডা এলাকায় এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। আগুনে বহু মানুষ আহত হয়েছেন এবং তাদের কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

স্থানীয় সময় সকাল ৮টার দিকে উমাজা প্রাথমিক বিদ্যালয়, ফুরাহা মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং এর আশপাশের একটি আবাসিক এলাকায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে আগুনের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় স্কুলে থাকা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। প্রাণ বাঁচাতে অনেকেই ভবন থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় ব্যাপক হুড়োহুড়ি ও পদদলনের ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

জাতিসংঘ পরিচালিত রেডিও ওকাপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগুন শুধু স্কুল ভবনেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আশপাশের এলাকায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে অগ্নিকাণ্ড। প্রাদেশিক ভাইস গভর্নর দুনিয়া মাসুম্বুকো বোয়েঙ্গের তথ্য অনুযায়ী, দুটি স্কুলের পাশাপাশি আশপাশের প্রায় তিন শতাধিক কাঠের তৈরি বাড়িঘর আগুনে পুড়ে গেছে। ফলে অগ্নিকাণ্ডটি একটি স্কুলকেন্দ্রিক দুর্ঘটনা থেকে বড় ধরনের আবাসিক বিপর্যয়ে রূপ নেয়।

ঘটনার পরপরই স্থানীয় বাসিন্দারা এবং উদ্ধারকর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণ ও আহতদের উদ্ধারে এগিয়ে আসেন। কিন্তু কাঠের তৈরি ঘরবাড়ি ও স্থাপনাগুলোতে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যাপক বেগ পেতে হয়। ধোঁয়ায় চারপাশ আচ্ছন্ন হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থী ও বাসিন্দাদের অনেকেই দিক হারিয়ে ফেলেন।

স্থানীয় কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে ১৯ জন ছাত্রী এবং পাঁচজন ছাত্র রয়েছেন। আরও কয়েকজনের পরিচয় ও মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে যাচাই চলছে। এ ছাড়া অন্তত ২৯ জন আহত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২১ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

আহতদের কয়েকজনকে কাদুতু জেনারেল হাসপাতালে এবং অন্যদের বুকাভু প্রাদেশিক জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। গুরুতর আহতদের মধ্যে অনেকের শরীরে পোড়া ক্ষত রয়েছে। আবার কেউ কেউ ধোঁয়ার কারণে মারাত্মক শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। চিকিৎসকদের জন্যও পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠেছে, কারণ একই সময়ে বিপুলসংখ্যক আহত শিক্ষার্থী ও শিক্ষককে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।

স্থানীয় একটি ক্লিনিকের নার্স ক্রিস্টোফ জিগাশানে জানিয়েছেন, আগুনের পর প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থী ও শিক্ষককে গুরুতর শ্বাসকষ্ট নিয়ে তাদের ক্লিনিকে আনা হয়েছিল। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মৃত্যু হয়। আগুনের তীব্রতা এবং ধোঁয়ার কারণে অনেকের শ্বাস নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল বলে তিনি জানান।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগুন লাগার পর স্কুলে থাকা শিশুদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে দ্রুত বের হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু একই সময়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী দরজার দিকে ছুটে যাওয়ায় হুড়োহুড়ি শুরু হয়। এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে কয়েকজন পদদলিত হয়ে মারা যান বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। আবার কেউ কেউ ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে অচেতন হয়ে পড়েন।

একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিকভাবে যে জায়গাটি শিশুদের জন্য নিরাপদ থাকার কথা, সেখানেই এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় স্থানীয় মানুষের মধ্যে শোক ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়া পরিবারগুলো কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সন্তানদের খোঁজে হাসপাতালে ছুটতে বাধ্য হন। অনেক পরিবার এখনো তাদের স্বজনদের অবস্থা জানার অপেক্ষায় রয়েছে।

অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আগুন কীভাবে শুরু হয়েছিল, তা জানতে তদন্ত শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তদন্তের মাধ্যমে আগুনের সূত্রপাত, আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণ এবং হতাহতের পেছনে অন্যান্য বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে।

মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। চিকিৎসাধীন ব্যক্তিদের শারীরিক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন চিকিৎসকেরা। উদ্ধারকাজ ও ক্ষয়ক্ষতির হিসাবও পুরোপুরি শেষ হয়নি। ফলে হতাহতের সংখ্যা এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণে পরবর্তী সময়ে পরিবর্তন আসতে পারে।

শহরটির নিয়ন্ত্রণে থাকা এএফসি/এম২৩ বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মুখপাত্র লরেন্স কানিউকা হতাহতের বিষয়ে তথ্য জানিয়েছেন। বিদ্রোহী কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করে স্থানীয় বাসিন্দাদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে অগ্নিকাণ্ডের কারণ খুঁজে বের করতে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বুকাভুর বর্তমান রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিও এই ঘটনার প্রেক্ষাপটকে আরও জটিল করে তুলেছে। খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ পূর্ব কঙ্গোর এই অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে শহরটির নিয়ন্ত্রণ এএফসি/এম২৩ বিদ্রোহী গোষ্ঠীর হাতে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিদ্রোহী গোষ্ঠীটির সঙ্গে রুয়ান্ডার সমর্থনের অভিযোগ রয়েছে, যদিও রুয়ান্ডা এ ধরনের অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন অবস্থান জানিয়েছে।

পূর্ব কঙ্গোর দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে সাধারণ মানুষের জীবন এমনিতেই নানা সংকটে রয়েছে। বাস্তুচ্যুতি, নিরাপত্তাহীনতা, দারিদ্র্য এবং মৌলিক সেবার সীমাবদ্ধতার মধ্যে বসবাস করা মানুষের জন্য নতুন এই অগ্নিকাণ্ড আরও বড় দুর্যোগ হয়ে এসেছে। বিশেষ করে শিশুদের প্রাণহানির ঘটনায় স্থানীয় জনগণের মধ্যে গভীর শোক তৈরি হয়েছে।

একটি স্কুলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এত মানুষের প্রাণহানি নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। স্কুল ভবন, আশপাশের কাঠের ঘরবাড়ি এবং জরুরি অবস্থায় বের হওয়ার পথ কতটা নিরাপদ ছিল, তা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। আগুনের সময় শিশুদের দ্রুত ও নিরাপদে বের করে আনার মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ ঘটনায় শুধু নিহত শিশুদের পরিবার নয়, পুরো এলাকার মানুষই গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। যেসব পরিবার তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই এখন হাসপাতাল ও আশপাশের এলাকায় স্বজনদের খোঁজ করছেন। অন্যদিকে আগুনে শত শত ঘরবাড়ি পুড়ে যাওয়ায় বহু পরিবার রাতারাতি আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে। তাদের জন্য জরুরি খাদ্য, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।

বর্তমানে আহতদের চিকিৎসা এবং আগুনে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তাই সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ দ্রুত নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্ঘটনা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠতে পারে। বিশেষ করে স্কুল ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।

বুকাভুর এই অগ্নিকাণ্ডে একসঙ্গে এত শিশুর মৃত্যু স্থানীয় মানুষের জন্য এক গভীর শোকের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগুনের সূত্রপাতের কারণ এবং দায়িত্ব নির্ধারণের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ। আর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন গুরুতর আহতদের সুস্থ করে তোলাই এই মুহূর্তে স্বজনদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। তদন্ত শেষ হলে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং দুর্ঘটনাটির পেছনে কোনো অব্যবস্থাপনা বা নিরাপত্তাজনিত ঘাটতি ছিল কি না, সে বিষয়ে আরও পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত