ব্রিকস সম্মেলনে পুতিন, যাচ্ছেন না তারেক রহমান

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১১ বার
ব্রিকস সম্মেলনে পুতিন, যাচ্ছেন না তারেক রহমান

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নয়াদিল্লিতে আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। বিশ্বের উদীয়মান অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই জোটের সম্মেলনকে ঘিরে ইতোমধ্যে ভারতের রাজধানীতে শুরু হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি ও কূটনৈতিক তৎপরতা। সম্মেলনে যোগ দিতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দিল্লিতে পৌঁছেছেন। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংসহ আরও কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানেরও এতে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। তবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তারেক রহমানের ব্রিকস সম্মেলনে অংশ না নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। বরং বর্তমান বিমসটেক (বঙ্গোপসাগরীয় বহুমাত্রিক কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা উদ্যোগ) চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁকে সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

ভারতের পক্ষ থেকেও এর আগে বিষয়টি পরিষ্কার করা হয়েছিল। আগস্টে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ সেশনে অংশ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরের জন্য একটি পৃথক দ্বিপক্ষীয় আমন্ত্রণও দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ ব্রিকসের আমন্ত্রণটি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়মিত সদস্য রাষ্ট্রের আমন্ত্রণের মতো নয়; এটি ছিল আঞ্চলিক জোটের চেয়ারম্যান হিসেবে আউটরিচ বৈঠকে অংশগ্রহণের সুযোগ।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের বক্তব্যে বাংলাদেশের অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বাংলাদেশ সরকারের কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে কি না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। ফলে সম্মেলনে তাঁর অংশগ্রহণের সম্ভাবনাও আর থাকছে না।

এদিকে সম্মেলন সামনে রেখে দিল্লিতে পৌঁছে গেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) ভোরে তাঁর বিমান দিল্লির পালাম বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করে। তিন দিনের ভারত সফরে থাকা পুতিন ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। শুক্রবার বিকেলে নির্ধারিত এই বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও গভীর করার বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, বৈশ্বিক বাণিজ্য, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তনের মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর মধ্যে এবারের ব্রিকস সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ফলে শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেই নয়, বৈশ্বিক কূটনীতির দিক থেকেও দিল্লির এই সম্মেলন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। সম্প্রসারিত ব্রিকস এখন বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি বড় অংশকে প্রতিনিধিত্ব করছে।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতে আসছেন। তাঁর সফরকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে, কারণ দীর্ঘ কয়েক বছর পর ভারত সফর করছেন তিনি। সম্মেলনের ফাঁকে নরেন্দ্র মোদি ও শি জিনপিংয়ের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের আয়োজনের বিষয়েও আলোচনা চলছে। ভারত ও চীনের সীমান্ত, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিভিন্ন বিষয় বৈঠকে গুরুত্ব পেতে পারে।

এবারের সম্মেলনে ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন অংশীদার ও আমন্ত্রিত দেশের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ব্রিকসের পরিধি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার পাশাপাশি মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব এবং ইন্দোনেশিয়া এখন জোটটির সদস্য। সম্প্রসারণের ফলে জোটটি আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে।

ব্রিকসের অন্যতম লক্ষ্য হলো সদস্য ও অংশীদার দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা এবং বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির ভূমিকা জোরদার করা। জোটের দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য ও বিকল্প আন্তঃসীমান্ত অর্থপ্রদানের ব্যবস্থার বিষয়ে আলোচনা করে আসছে।

এবারের সম্মেলনেও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়টি বড় জায়গা পেতে পারে। বিশেষ করে আন্তঃসীমান্ত লেনদেন সহজ করা, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভারত ব্রিকস দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রার মধ্যে সংযোগ স্থাপনের বিষয়েও আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে সদস্য দেশগুলোর ভিন্ন অর্থনৈতিক কাঠামো ও ভূরাজনৈতিক অবস্থানের কারণে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্যও ব্রিকস সম্মেলনটি কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে যে আমন্ত্রণ পৌঁছেছিল, তা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতার সঙ্গে ব্রিকসের যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। যদিও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবারের সম্মেলনে যাচ্ছেন না, তবু বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং বিমসটেকের ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের ক্ষেত্রে এই আমন্ত্রণের আলাদা তাৎপর্য রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রিকস এখন আর শুধু পাঁচটি দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম নয়; এর সম্প্রসারণের ফলে এটি বৈশ্বিক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে পরিণত হয়েছে। তবে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে স্বার্থ ও পররাষ্ট্রনীতির পার্থক্যও রয়েছে। চীন-ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর বিরোধ, ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যনীতির পরিবর্তন—সব মিলিয়ে জোটটির সামনে যেমন সুযোগ রয়েছে, তেমনি রয়েছে নানা জটিলতাও।

নয়াদিল্লির এবারের আয়োজন তাই একদিকে যেমন অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন দিক উন্মোচনের সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে তেমনি বিশ্বের প্রভাবশালী ও উদীয়মান শক্তিগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের বড় মঞ্চ হয়ে উঠছে। পুতিনের আগাম দিল্লি পৌঁছে যাওয়া, শি জিনপিংয়ের সফর এবং মোদি-পুতিন ও মোদি-জিনপিং বৈঠকের সম্ভাবনা সম্মেলনের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্তও এই প্রেক্ষাপটে আলাদা গুরুত্ব বহন করছে। বিমসটেক চেয়ারম্যান হিসেবে আমন্ত্রণ পেলেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সেটিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ব্রিকস সম্মেলনের আমন্ত্রণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। ফলে এবারের সম্মেলনে বাংলাদেশের সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব না থাকলেও আঞ্চলিক সহযোগিতা ও ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ব্রিকসের এই আয়োজন ঢাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে থাকছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত