ফিডের দাম বাড়ায় চাপে পোলট্রি ও পশু খামারি

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৫৫ বার
ফিডের দাম বাড়ায় চাপে পোলট্রি ও পশু খামারি

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পোলট্রি ও গবাদিপশুর খাদ্যের দাম একের পর এক বাড়ায় দেশের খামারিরা নতুন করে উৎপাদন ব্যয়ের চাপে পড়েছেন। এক মাসের ব্যবধানে ফিড তৈরির অন্যতম প্রধান কাঁচামাল ভুট্টা, ডিওআরবি, রাইস ব্রান, সরিষার খৈল ও সয়াবিন মিলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এর সঙ্গে ওষুধ, ভ্যাকসিন, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অন্যান্য উৎপাদন উপকরণের ব্যয়ও বাড়ায় খামারিদের সামগ্রিক খরচ বেড়ে গেছে। কিন্তু উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডিম ও মুরগির বাজারদর না বাড়ায় অনেক খামারি লোকসানের মুখে পড়ছেন।

দিনাজপুর সদর উপজেলার পাঁচবাড়ির পোলট্রি খামারি মোমিনুল ইসলামের অভিজ্ঞতা এই পরিস্থিতির একটি চিত্র তুলে ধরে। তিনি প্রতি মাসে ব্রয়লার মুরগির জন্য প্রায় ৭০ বস্তা খাবার কিনতেন। কিন্তু দুই দফায় খাদ্যের দাম বাড়ার পর এখন সেই পরিমাণ খাবার কেনা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে তিনি প্রায় ৬০ বস্তা খাবার দিয়ে খামার পরিচালনার চেষ্টা করছেন। এতে মুরগির প্রত্যাশিত ওজন অর্জন হচ্ছে না। ফলে বিক্রির সময়ও কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া যাচ্ছে না। দীর্ঘদিন এ পরিস্থিতি চললে খামার বন্ধ করে দেওয়ার আশঙ্কা করছেন তিনি।

মোমিনুল ইসলামের মতো দেশের বিভিন্ন এলাকার ছোট ও মাঝারি খামারিরাও একই ধরনের সংকটে পড়েছেন। খামার পরিচালনায় সবচেয়ে বড় ব্যয়ের একটি অংশ চলে যায় পশু-পাখির খাদ্য কিনতে। খাদ্যের দাম বাড়লে সরাসরি বেড়ে যায় প্রতিটি মুরগি, গরু বা অন্যান্য প্রাণীর উৎপাদন ব্যয়। কিন্তু বাজারে উৎপাদিত পণ্যের দাম একই হারে না বাড়লে সেই অতিরিক্ত ব্যয় খামারির ওপরই চাপ সৃষ্টি করে। দীর্ঘ সময় ধরে এই পরিস্থিতি চললে উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া কিংবা খামার বন্ধ করে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ফিড তৈরির প্রধান উপাদানগুলোর প্রায় সবকটির দাম সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। ১৩ শতাংশ আর্দ্রতার ভুট্টার দাম এক মাস আগে প্রতি কেজি প্রায় ৩১ টাকা ৩০ পয়সা থাকলেও বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮ টাকা ৮০ পয়সায়। অর্থাৎ অল্প সময়ের মধ্যেই কাঁচামালটির দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একই সময়ে ডিওআরবির দাম প্রতি কেজি ২৬ টাকা থেকে বেড়ে ৩৩ টাকা হয়েছে। ১৬ শতাংশ তেলযুক্ত চালের কুঁড়ার দাম ৩৩ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৯ টাকা। সরিষার খৈলের দামও ৩৬ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বেড়ে ৩৯ টাকা ৭০ পয়সায় উঠেছে। অন্যদিকে সয়াবিন মিলের দাম ৮ টাকা বেড়ে প্রতি কেজি প্রায় ৬৬ টাকায় পৌঁছেছে।

ফিডের কাঁচামালের বাজারে সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি করেছে ভুট্টার মূল্যবৃদ্ধি। খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, চলতি বছরের মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসের মৌসুমে প্রতি কেজি ভুট্টা ২৮ থেকে ২৯ টাকার মধ্যে পাওয়া গেলেও জুন, জুলাই ও আগস্টে দাম বেড়ে ৩৮ থেকে ৪০ টাকায় উঠেছে। আন্তর্জাতিক বাজারেও ভুট্টার দাম বেড়েছে। প্রতি টন ২৩৫ থেকে ২৪০ ডলারের কাছাকাছি থাকা আন্তর্জাতিক বাজারদর বেড়ে প্রায় ২৯০ ডলারে পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ফিড তৈরিতে ব্যবহৃত কাঁচামালের দাম বাড়ার পেছনে শুধু স্থানীয় বাজারের পরিস্থিতিই নয়, আন্তর্জাতিক বাজার ও আমদানি ব্যয়েরও প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে ডলারের বিনিময় হারের ওঠানামা আমদানিনির্ভর কাঁচামালের ব্যয়কে প্রভাবিত করে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে পরিবহন ও আমদানি ব্যয় যুক্ত হলে দেশের বাজারে কাঁচামালের মূল্য আরও বেড়ে যেতে পারে। এসব কারণে ফিড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয়ও বাড়ছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, একটি মানসম্মত ফিড উৎপাদনের মোট খরচের প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশই কাঁচামাল কেনায় ব্যয় হয়। ফলে ভুট্টা, সয়াবিন মিল, রাইস ব্রান কিংবা ডিওআরবির মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের দাম বাড়লে ফিড উৎপাদনের খরচও দ্রুত বেড়ে যায়। তখন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে আগের দামে ফিড বাজারজাত করা কঠিন হয়ে পড়ে। স্থানীয় বাজারে কোনো কাঁচামালের সরবরাহে ঘাটতি বা কৃত্রিম সংকট তৈরি হলেও এর প্রভাব ফিডের দামে পড়তে পারে।

বগুড়া সদরের পোলট্রি খামারি হাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, গত এক সপ্তাহেই বিভিন্ন ধরনের প্রাণিজ খাদ্যের দাম প্রতি কেজিতে দুই থেকে তিন টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ৫০ কেজির এক বস্তা ফিডের দাম সর্বোচ্চ ১৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাইস ব্রান ও ভুট্টার দাম বৃদ্ধির প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। ৫০ কেজির এক বস্তা রাইস ব্রানের দাম ৫০০ টাকা বেড়ে প্রায় ১ হাজার ৮০০ টাকায় উঠেছে। একই সময়ে ভুট্টার দাম প্রতি কেজি ২৫ টাকা থেকে বেড়ে ৩৭ টাকায় পৌঁছেছে। পোলট্রি ফিডের ৫০ কেজির বস্তার দামও সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৬৭৫ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলা সদরের প্রাণিজ খাদ্য বিক্রেতা সলিম উল্যাহর মতে, খামারিদের মোট উৎপাদন ব্যয়ের বড় অংশই খাবার কিনতে চলে যায়। কোনো কোনো খামারির হিসাবে মুরগি পালনের মোট ব্যয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত খাদ্যের পেছনে ব্যয় হতে পারে। তাঁর মতে, ভুট্টার দাম বাড়ায় বিভিন্ন ধরনের প্রাণিজ খাদ্যের দামও বেড়েছে। এর পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ফিড উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থাতেও চাপ তৈরি হচ্ছে। বেশি দামে ফিড কিনে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে বলে ক্রেতার সংখ্যাও কমেছে।

ফিডের দাম এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে গত কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় খামারিরা নানা কর্মসূচি পালন করেছেন। জুনের শুরু থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজশাহী, গাজীপুর, পাবনা, কিশোরগঞ্জ, কুমিল্লা, নরসিংদী, ঢাকা, কুষ্টিয়া ও ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন এলাকায় মানববন্ধন, বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, ডিম ভেঙে প্রতিবাদ এবং স্মারকলিপি দেওয়ার মতো কর্মসূচি হয়েছে। এসব কর্মসূচিতে ফিডের দাম কমানো, কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক-কর কমানো এবং ডিম ও মুরগির ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।

খামারিদের সংগঠনের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, ফিডের দাম কমাতে হলে শুধু ফিড বিক্রির পর্যায়ে নজরদারি বাড়ালেই হবে না, বরং কাঁচামালের বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও নজর দিতে হবে। বাংলাদেশ প্রান্তিক পোলট্রি খামারি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাসেল প্রধানের মতে, দেশে উৎপাদিত ডিওআরবি ও রাইস ব্রানের মতো কাঁচামালের ক্ষেত্রে আগে অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রয়োজন হলে এসব পণ্যের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। আমদানি করা কাঁচামালের ওপর ভ্যাট, কর ও শুল্ক কমানোর পাশাপাশি বাজারে কৃত্রিম সংকট ও মজুতদারি ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানোর কথাও তিনি বলেছেন।

তবে বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করছেন, স্থানীয় কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি উৎপাদক ও শিল্পের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রাখা প্রয়োজন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানিমেল নিউট্রিশন বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. শফিকুর রহমান শিশিরের মতে, ডিওআরবি ও রাইস ব্রানের মতো স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কাঁচামালের ক্ষেত্রে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। তবে রপ্তানির সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ না করে বাজারের প্রয়োজন অনুযায়ী ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বেড়ে গেলে আমদানি পর্যায়ের কর ও শুল্ক সাময়িকভাবে সমন্বয়ের বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশে উৎপাদনযোগ্য কাঁচামালের উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে ভুট্টার মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের উৎপাদন বাড়ানো গেলে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য ওঠানামার প্রভাব কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে। পাশাপাশি উৎপাদন, সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে মৌসুমি সময়ে কাঁচামালের দামের বড় ধরনের ওঠানামাও নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হতে পারে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু জানিয়েছেন, খামারিরা যাতে কম খরচে পোলট্রি উৎপাদন করতে পারেন, সে জন্য ফিডসহ উৎপাদনের অন্যান্য উপকরণের ব্যয় কমানোর বিষয়ে সরকার কাজ করছে। নিরাপদ ও সাশ্রয়ী মূল্যে মানুষের কাছে পোলট্রি পণ্য পৌঁছে দিতে হলে উৎপাদন পর্যায়ের ব্যয় কমানো জরুরি বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। খামারি ও উদ্যোক্তাদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর সমাধানে উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

পোলট্রি ও পশুপালন খাতের বর্তমান পরিস্থিতিতে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, আমদানি ব্যয়, ডলারের বিনিময় হার, জ্বালানি সংকট এবং বাজারদরের মধ্যে ভারসাম্যের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একদিকে ফিডের দাম বাড়ায় খামারিদের ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে উৎপাদিত ডিম ও মুরগির বাজারদর সবসময় সেই অনুপাতে বাড়ছে না। ফলে উৎপাদক পর্যায়ে চাপ তৈরি হচ্ছে। ছোট খামারিদের জন্য এই চাপ তুলনামূলকভাবে আরও বেশি, কারণ তাদের পুঁজি সীমিত এবং দীর্ঘ সময় লোকসান বহন করার সক্ষমতাও কম।

দেশের পোলট্রি ও প্রাণিসম্পদ খাতের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক খামারি, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারী যুক্ত। ফলে খাদ্যের দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুধু একটি খামারের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব উৎপাদন, বাজার সরবরাহ এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়েও পৌঁছাতে পারে। তাই খামারিদের উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা, কাঁচামালের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং বাজারে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা—এই তিনটি বিষয়কে সমন্বিতভাবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com