জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ, নতুন অধ্যায়ে তারেক রহমান

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১২ বার
আগামীকাল ফেনী সফরে প্রধানমন্ত্রী, থাকছে দিনভর নানা কর্মসূচি

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম ভাষণকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় বিকেলে বাংলায় দেওয়া এই ভাষণে তিনি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, অভিবাসন, প্রযুক্তি এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন। একই সঙ্গে জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে এটি ছিল তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম বক্তব্য।

এই ভাষণের মধ্য দিয়ে তারেক রহমান তার পরিবারের আরও দুই সদস্য—সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মঞ্চে বক্তব্য দেওয়া তৃতীয় সদস্য হলেন। এর ফলে জিয়া পরিবারের সঙ্গে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের চার দশকেরও বেশি সময়ের যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তাতে যুক্ত হলো নতুন একটি অধ্যায়। জাতিসংঘের নথি ও প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালে সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে বক্তব্য দেন। পরে ১৯৯৩ সালে ৪৮তম অধিবেশনে প্রথমবার সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেন খালেদা জিয়া।

নিজের বক্তব্যের শুরুতেই তারেক রহমান এই পারিবারিক ধারাবাহিকতার কথা স্মরণ করেন। জাতিসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, তার বাবা জিয়াউর রহমান এবং মা খালেদা জিয়াও একই বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের জনগণ ও দেশের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছিলেন। নিজের প্রথম ভাষণে সেই স্মৃতির কথা তুলে ধরে তিনি বাংলাদেশের স্বার্থ এবং শান্তিপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থার প্রত্যাশার কথা জানান। তার বক্তব্যে পারিবারিক ইতিহাসের এই প্রসঙ্গটি ব্যক্তিগত স্মৃতির পাশাপাশি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উপস্থিতির ধারাবাহিকতার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে ওঠে।

১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে জিয়াউর রহমানের বক্তব্যে তৎকালীন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্য, দারিদ্র্য, ক্ষুধা, উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব পেয়েছিল। জাতিসংঘের সরকারি নথিতে সংরক্ষিত সেই বক্তব্যে তিনি উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের মধ্যকার ব্যবধান কমানো এবং শান্তি, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছিলেন।

এর ১৩ বছর পর ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে বক্তব্য দেন খালেদা জিয়া। পরবর্তী বছরগুলোতেও জাতিসংঘের বিভিন্ন সাধারণ পরিষদীয় কার্যক্রমে তার অংশগ্রহণ ছিল। প্রকাশিত জাতিসংঘ নথির ভিত্তিতে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে তিনি সাধারণ পরিষদের কার্যক্রমে পাঁচবার বক্তব্য দেন। এর মধ্যে জাতিসংঘের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর স্মারক আয়োজন, শিশু বিষয়ক বিশেষ অধিবেশন এবং ৬০তম অধিবেশন চলাকালে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন সভাও ছিল।

এই ধারাবাহিকতার পর ২০২৬ সালে তারেক রহমানের জাতিসংঘে প্রথম ভাষণ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অবস্থান তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হয়ে আসে। তার বক্তব্যের বড় একটি অংশজুড়ে ছিল বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার প্রশ্ন। তিনি সংঘাতের সমাধানে আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন। রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মানকে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেন।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সংঘাত ও নিরাপত্তা সংকটের প্রেক্ষাপটে তিনি নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। পাশাপাশি ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থনের কথাও জানান। তার বক্তব্যে আন্তর্জাতিক শান্তিকে শুধু সামরিক নিরাপত্তার বিষয় হিসেবে না দেখে কূটনীতি, মানবতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘদিনের মানবিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ রোহিঙ্গা সংকটও ছিল তার ভাষণের অন্যতম প্রধান বিষয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এতে বাংলাদেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ তৈরি হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। বাংলাদেশের অবস্থান হিসেবে তিনি রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্ব দেন এবং সংকটের স্থায়ী সমাধানে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন।

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়েও তার বক্তব্যে বাংলাদেশের বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি উল্লেখ করেন, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান তুলনামূলকভাবে কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এ অবস্থায় জলবায়ু ন্যায়বিচার, অর্থায়ন এবং অভিযোজন সহায়তার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি। বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক জলবায়ু সহায়তা আরও কার্যকর করার আহ্বানও আসে তার বক্তব্যে।

অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রসঙ্গেও বাংলাদেশের প্রত্যাশা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় দেশগুলো পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। আঞ্চলিক বাণিজ্য, যোগাযোগ এবং অর্থবহ সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে দেশগুলো পারস্পরিক সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে উল্লেখ করে তিনি উত্তরণ প্রক্রিয়াকে টেকসই করতে অর্থায়ন, বাজারে প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির ধারাবাহিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের বিষয়টিও তার বক্তব্যে জায়গা পেয়েছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের বিকাশের সঙ্গে নতুন ধরনের বৈশ্বিক বৈষম্য তৈরি হওয়ার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে তিনি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। ডিজিটাল বিভাজন যাতে ভবিষ্যতে এআই-নির্ভর নতুন বৈষম্যে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক নীতিগত সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে। তিনি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে নিহত ও আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। একই সঙ্গে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে গণতন্ত্র, জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এসব বক্তব্য ছিল তার সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান ও দেশের বর্তমান রূপান্তর সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে একটি ব্যাখ্যা।

নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়েও তিনি বক্তব্য দেন। তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য স্টার্টআপ উদ্যোগে সরকারি সহায়তার কথা তুলে ধরে তিনি প্রযুক্তি ও উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। একই সঙ্গে নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল জনগণকেন্দ্রিক রাষ্ট্রের ধারণা। তিনি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের মাধ্যমে এমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য তুলে ধরেন, যেখানে নাগরিকরা নিরাপদে এবং সমান অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করতে পারবেন। তরুণদের ভবিষ্যৎ, নারীর আত্মনির্ভরতা এবং শিশুদের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

সব মিলিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে তারেক রহমানের প্রথম ভাষণ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক কূটনীতির নানা অগ্রাধিকারকে একসঙ্গে তুলে ধরার একটি উপলক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভাষণে পারিবারিক ইতিহাসের স্মৃতি যেমন ছিল, তেমনি ছিল শান্তি, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, প্রযুক্তি ও বাংলাদেশের উন্নয়ন-অভিযাত্রার বিভিন্ন দিক। একই পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে তার উপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।

জাতিসংঘের মতো বহুপাক্ষিক বিশ্বমঞ্চে একটি দেশের বক্তব্য কেবল সরকারের নীতিই তুলে ধরে না; এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সেই দেশের জনগণের প্রত্যাশা, সংকট ও ভবিষ্যৎ অগ্রাধিকারের কথাও পৌঁছায়। তারেক রহমানের প্রথম ভাষণে সেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়গুলোকে একই কাঠামোর মধ্যে তুলে ধরা হয়েছে। এখন এসব বক্তব্যের কতটা বাস্তব কূটনৈতিক উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও নীতিগত অগ্রাধিকারে রূপ নেয়, সেটিই সামনে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com