প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের দিকে ইয়েমেনের হুতি সশস্ত্র গোষ্ঠীর ছোড়া দুটি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। একই সময়ে দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর খামিস মুশাইতের দিকে ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও ধ্বংস করার কথা জানিয়েছে তারা। নতুন করে এসব হামলা ও পাল্টা প্রতিরোধের ঘটনায় সৌদি আরবকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের একজন মুখপাত্র শনিবার জানিয়েছেন, হুতিরা রিয়াদ এলাকার দিকে দুটি ড্রোন পাঠিয়েছিল। সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সেগুলো শনাক্ত করার পর ধ্বংস করে। একইভাবে খামিস মুশাইতের দিকে ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও মাঝপথে শনাক্ত করে ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। শহরটিতে সৌদি আরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটি রয়েছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষের এই দাবির বিষয়ে হুতিদের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে এর আগে হুতি কর্তৃপক্ষ সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে। ফলে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ইয়েমেন ও সৌদি আরবের সংঘাত আবারও আঞ্চলিক নিরাপত্তার বড় প্রশ্ন হয়ে উঠছে।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। পরিষদের সদস্যরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুতিদের অব্যাহত হামলার নিন্দা জানিয়েছেন বলে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। বিশেষ করে বেসামরিক মানুষ ও জ্বালানি অবকাঠামো হামলার ঝুঁকিতে পড়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে। নারী ও শিশুসহ বেসামরিক মানুষের আহত হওয়ার ঘটনাও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনায় এসেছে।
ইয়েমেনের সংঘাত কয়েক বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী সংকট। একদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারের সঙ্গে হুতিদের সংঘাত, অন্যদিকে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সরাসরি ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততা—সব মিলিয়ে যুদ্ধটি শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতাও এই সংঘাতকে বৃহত্তর আঞ্চলিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করেছে।
হুতিদের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তেহরান হুতিদের রাজনৈতিক ও সামরিক সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার বা সীমিত করার অবস্থান বিভিন্ন সময়ে নিয়েছে, অন্যদিকে সৌদি আরব ও তার মিত্ররা দীর্ঘদিন ধরে হুতিদের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। এই প্রেক্ষাপটে সৌদি ভূখণ্ডে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুধু সীমান্তসংলগ্ন নিরাপত্তা ঝুঁকি নয়, বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
লোহিত সাগরও এই সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকায় হুতিদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এই অঞ্চলটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের কাছাকাছি হওয়ায় সেখানে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে এর প্রভাব আঞ্চলিক সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্যেও পড়তে পারে।
জাহাজ ও ট্যাংকারে হামলা এবং সমুদ্রপথে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হওয়ার কারণে এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। লোহিত সাগর ও আশপাশের জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক উত্তেজনা চললে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা ব্যয় বাড়তে পারে, বিকল্প রুট ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে এবং এর প্রভাব পণ্য ও জ্বালানির দামের ওপরও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে হুতি বাহিনী ও ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর মধ্যে নতুন করে স্থল সংঘাত তীব্র হওয়ায় দেশটির মানবিক পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট থেকে ইয়েমেনজুড়ে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৭০ হাজার শিশু রয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে থাকা সাধারণ পরিবারগুলোই এ পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়ে উঠছে।
বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা এবং নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। যেসব পরিবার নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে, তাদের অনেকেই জানেন না কখন তাঁরা আবার নিজেদের এলাকায় ফিরতে পারবেন। শিশুদের শিক্ষা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পরিবারগুলোর জীবিকা হারানোর ঝুঁকিও বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের কারণে এই মানবিক সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলা বাড়তে থাকায় দেশটির পাশে দাঁড়িয়েছে কয়েকটি মিত্র রাষ্ট্র। গত আগস্টে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির মূল ধারণা হলো, অংশীদার কোনো একটি দেশের ওপর হামলাকে অন্য অংশীদারদের নিরাপত্তার ওপরও হামলা হিসেবে বিবেচনা করা। এই চুক্তির বাস্তব প্রয়োগ কীভাবে হবে, তা নিয়ে তিন দেশের সামরিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে।
সৌদি আরব সফরে তুরস্কের সেনাপ্রধান জেনারেল সেলসুক বায়রাকতারোগলুর উপস্থিতি এবং তিন দেশের সেনাপ্রধানদের বৈঠকের উদ্যোগ পরিস্থিতির গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করেছে। তবে চুক্তিটি তুরস্কের পার্লামেন্টে এখনো অনুমোদিত না হওয়ায় আঙ্কারার সামরিক সহায়তার পরিধি নিয়ে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে আপাতত দ্বিপক্ষীয় ও কারিগরি সহযোগিতার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে।
পাকিস্তানের সঙ্গেও সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসলামাবাদের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। তবে কোনো দেশ সরাসরি ইয়েমেনের সংঘাতে সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়বে কি না, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়। আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে এর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত প্রভাব অনেক বড় হতে পারে।
ফ্রান্সও সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তায় সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ জানিয়েছেন, লোহিত সাগরের উপকূলে গুরুত্বপূর্ণ তেল বন্দর ইয়ানবু রক্ষায় সেনাসদস্য, রাডার ও আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠানো হবে। তবে এই সামরিক উপস্থিতির উদ্দেশ্য সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়া নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
ইয়ানবু সৌদি আরবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল বন্দর। দেশটির জ্বালানি রপ্তানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে শুধু সৌদি অর্থনীতিই নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে। এর আগে সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। মক্কা, জেদ্দা ও ইয়ানবুর মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানের নিরাপত্তা নিয়ে তাই বিশেষ উদ্বেগ রয়েছে।
হুতিদের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য হেজাম আল-আসাদ অবশ্য সৌদি আরবের বিরুদ্ধে তাদের সামরিক তৎপরতাকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযান যত বড় বা প্রভাবশালীই হোক, হুতিরা এটিকে বৃহত্তর সংঘাতের প্রস্তুতি হিসেবে একটি সীমিত পরিসরের মহড়া হিসেবে দেখছে। এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, হুতিদের পক্ষ থেকে সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের পাশাপাশি প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক বার্তাও দেওয়া হচ্ছে।
তবে সংঘাত যতই সামরিক সক্ষমতার প্রদর্শন হিসেবে উপস্থাপন করা হোক, এর মানবিক মূল্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। একটি ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র আকাশে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার অর্থ কেবল একটি সামরিক লক্ষ্য ব্যর্থ হওয়া নয়; এর পেছনে রয়েছে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, শহরের স্বাভাবিক জীবন এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষার প্রশ্ন।
সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যকার সংঘাত ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। লোহিত সাগরের নৌপথ, তেল অবকাঠামো এবং আঞ্চলিক সামরিক জোটগুলো একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত যে নতুন করে বড় সংঘাত শুরু হলে এর প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক উদ্যোগের গুরুত্বও বাড়ছে। সামরিক প্রতিরক্ষা জোরদার করার পাশাপাশি সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখা জরুরি হয়ে উঠেছে। কারণ শুধু আকাশ প্রতিরক্ষা দিয়ে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানো সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের মূল কারণ দূর করা যায় না। ইয়েমেনে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য রাজনৈতিক সমঝোতার প্রয়োজনীয়তা তাই আরও স্পষ্ট হচ্ছে।
রিয়াদের আকাশে নতুন করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি সেই পুরোনো সংকটকেই সামনে এনেছে। একদিকে সৌদি আরব তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করছে, অন্যদিকে হুতিরা নিজেদের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন অব্যাহত রেখেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে তুরস্ক, পাকিস্তান, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশের সম্ভাব্য সহযোগিতা। ফলে পরিস্থিতি এখন শুধু সৌদি-হুতি সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর নিরাপত্তা কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।