প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মালয়েশিয়ার বিপক্ষে বড় ব্যবধানে হারের হতাশা পেছনে ফেলে ফিফা এশিয়ান কাপের দ্বিতীয় ম্যাচে সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামছে বাংলাদেশ। গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচকে সামনে রেখে একাদশে চারটি পরিবর্তন এনেছেন বাংলাদেশ দলের কোচ। দীর্ঘ সময় পর জাতীয় দলের শুরুর একাদশে ফিরেছেন অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়া। তাঁর সঙ্গে একাদশে জায়গা পেয়েছেন জিদান ইউসুফ, শুকি ইতোফুসা ও শেখ মোরসালিন।
জাকার্তার জেলোরা বুং কার্নো স্টেডিয়ামে সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ম্যাচটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচে মালয়েশিয়ার কাছে ৩-০ গোলে হেরে শুরুটা প্রত্যাশামতো হয়নি বাংলাদেশের। ফলে দ্বিতীয় ম্যাচে পয়েন্ট পাওয়ার লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামতে হচ্ছে হামজা চৌধুরী, জামাল ভূঁইয়া ও শমিত সোমদের। প্রথম ম্যাচের ভুলত্রুটি কাটিয়ে দলকে নতুনভাবে সংগঠিত করার চেষ্টা করেছে কোচিং স্টাফ।
মালয়েশিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের শুরুর একাদশে থাকা শাকিল আহাদ তপু, সোহেল রানা সিনিয়র, ফারহান আলী ওয়াহিদ ও ফাহামিদুল ইসলাম এবার শুরু থেকে মাঠে থাকছেন না। তাঁদের পরিবর্তে জিদান ইউসুফ, জামাল ভূঁইয়া, শুকি ইতোফুসা ও শেখ মোরসালিনকে একাদশে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ রক্ষণ, মাঝমাঠ এবং আক্রমণ—তিন বিভাগেই পরিবর্তনের ছাপ রয়েছে।
জামাল ভূঁইয়ার প্রত্যাবর্তনই একাদশ ঘোষণার পর সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় দলের মাঝমাঠের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় এবং অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসা জামাল দলকে মাঠে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি মাঝমাঠে অভিজ্ঞতা যোগ করতে পারেন। মালয়েশিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের মাঝমাঠ প্রত্যাশিত নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারেনি। সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে সেই জায়গায় জামালের উপস্থিতি দলের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের মাঝমাঠে জামালের সঙ্গে থাকছেন হামজা চৌধুরী ও শমিত সোম। তিনজনের দায়িত্ব হবে প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের আক্রমণভাগে বল সরবরাহ করা। বিশেষ করে হামজার গতিশীলতা ও বল দখলে রাখার সক্ষমতার সঙ্গে জামালের অভিজ্ঞতা এবং শমিতের কার্যকর উপস্থিতি বাংলাদেশের খেলার গতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
রক্ষণভাগেও পরিবর্তন এসেছে। গোলরক্ষক হিসেবে থাকছেন মেহেদী হাসান শ্রাবণ। তাঁর সামনে রক্ষণে রয়েছেন সাদ উদ্দিন, তারিক কাজী, জিদান ইউসুফ ও জায়ান আহমেদ। মালয়েশিয়ার বিপক্ষে তিন গোল হজম করার পর রক্ষণভাগের ওপর বাড়তি চাপ থাকবে। সিঙ্গাপুরের আক্রমণ সামলে শুরু থেকেই নিজেদের রক্ষণকে সংগঠিত রাখা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
জিদান ইউসুফের একাদশে অন্তর্ভুক্তিও নজর কাড়ছে। তরুণ এই ডিফেন্ডারের ওপর থাকবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। দলের রক্ষণভাগে সমন্বয় বজায় রাখার পাশাপাশি প্রতিপক্ষের আক্রমণভাগকে থামাতে তাঁকে মনোযোগী থাকতে হবে। মালয়েশিয়ার বিপক্ষে যে জায়গাগুলোতে বাংলাদেশ দুর্বলতা দেখিয়েছে, সেগুলো কাটিয়ে উঠতে রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের মধ্যে যোগাযোগ ও অবস্থানগত শৃঙ্খলা বিশেষ প্রয়োজন হবে।
আক্রমণভাগেও এসেছে পরিবর্তন। শুকি ইতোফুসা ও শেখ মোরসালিনকে শুরু থেকে খেলানোর সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ আক্রমণে নতুন গতি আনার চেষ্টা করছে। তাঁদের সঙ্গে থাকছেন রাকিব হোসেন। ফলে সামনের সারিতে গতিশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিপক্ষের রক্ষণে চাপ তৈরির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
মালয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে বাংলাদেশ আক্রমণে ধারাবাহিকতা দেখাতে পারেনি। বল দখলের সময়ও প্রতিপক্ষের ওপর পর্যাপ্ত চাপ তৈরি করা সম্ভব হয়নি। সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে সেই চিত্র বদলাতে হলে মাঝমাঠ থেকে দ্রুত আক্রমণে ওঠা এবং ফরোয়ার্ডদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি হবে। বিশেষ করে রাকিব, মোরসালিন ও শুকির মধ্যে বোঝাপড়া বাংলাদেশের আক্রমণ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচে মালয়েশিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের জন্য শুরুটা ছিল কঠিন। প্রথমার্ধেই প্রতিপক্ষ দুই গোলের ব্যবধান তৈরি করে নেয়। পরে দ্বিতীয়ার্ধে আরও একটি গোল হজম করে বাংলাদেশ। ৩-০ ব্যবধানের সেই পরাজয় দলের আত্মবিশ্বাসে ধাক্কা দিলেও টুর্নামেন্টের গ্রুপপর্বে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ এখনও রয়েছে। সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ম্যাচটি সেই অর্থে বাংলাদেশের জন্য নতুন করে নিজেদের সামর্থ্য দেখানোর একটি সুযোগ।
বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যকার আগের সাক্ষাৎগুলোও এই ম্যাচের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুই দল এর আগে চারবার মুখোমুখি হয়েছে এবং কোনো ম্যাচেই বাংলাদেশ জয় পায়নি। তিন ম্যাচে সিঙ্গাপুর জয় পেয়েছে, অন্য একটি ম্যাচ ড্র হয়েছে। ফলে অতীতের পরিসংখ্যান বাংলাদেশের জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে আগের ম্যাচের ফল সবসময় পরের ম্যাচের ফল নির্ধারণ করে না। মাঠের দিনের পারফরম্যান্সই শেষ পর্যন্ত পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
এই ম্যাচে বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় বিষয় হলো মানসিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানো। প্রথম ম্যাচে ৩-০ গোলে হারার পর খেলোয়াড়দের ওপর স্বাভাবিকভাবেই চাপ রয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে সেই হার থেকে শিক্ষা নিয়ে দ্রুত নিজেদের সংগঠিত করার সুযোগও রয়েছে। সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে শুরুতেই গোল হজম না করে নিজেদের ছন্দে খেলা এবং ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেষ্টা করতে হবে বাংলাদেশকে।
দলের অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়ার ফেরার কারণে মাঠে নেতৃত্বের দিক থেকেও পরিবর্তন আসতে পারে। দীর্ঘ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থাকা জামাল গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সতীর্থদের সংগঠিত করার পাশাপাশি মাঝমাঠে খেলোয়াড়দের অবস্থান ঠিক রাখতে ভূমিকা রাখতে পারেন। তাঁর সঙ্গে হামজা চৌধুরীর মতো অভিজ্ঞ ও শক্তিশালী মিডফিল্ডারের উপস্থিতি বাংলাদেশকে মাঝমাঠে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলতে পারে।
অন্যদিকে সিঙ্গাপুরও এই ম্যাচে জয় পেতে মরিয়া থাকবে। প্রথম ম্যাচে পরাজয়ের পর তাদেরও পয়েন্ট প্রয়োজন। ফলে দুই দলের কাছেই ম্যাচটির গুরুত্ব সমান। বাংলাদেশকে তাই শুধু নিজেদের ভুল কমালেই হবে না, সিঙ্গাপুরের আক্রমণ ও মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণের দিকেও সতর্ক থাকতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে ম্যাচের পুরো সময় একই মাত্রার মনোযোগ ধরে রাখা। মালয়েশিয়ার বিপক্ষে শুরুতেই গোল হজম করার পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ প্রতিপক্ষের হাতে চলে যায়। সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে শুরু থেকে রক্ষণভাগকে সংগঠিত রেখে মাঝমাঠে বলের দখল ধরে রাখতে পারলে বাংলাদেশ নিজেদের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারবে।
এই ম্যাচকে ঘিরে দেশের ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যেও প্রত্যাশা রয়েছে। মালয়েশিয়ার বিপক্ষে হতাশাজনক ফলের পর সমর্থকেরা এখন অন্তত লড়াইপূর্ণ একটি ম্যাচ দেখতে চান। জয় এলে সেটি শুধু তিন পয়েন্টের হিসাবেই গুরুত্বপূর্ণ হবে না, বরং টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাসও ফিরিয়ে আনতে পারে। আর পরাজয় হলে পরবর্তী ম্যাচে চাপ আরও বাড়বে।
সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে বাংলাদেশের ঘোষিত একাদশে গোলরক্ষক মেহেদী হাসান শ্রাবণের সামনে রয়েছেন সাদ উদ্দিন, তারিক কাজী, জিদান ইউসুফ ও জায়ান আহমেদ। মাঝমাঠে হামজা চৌধুরী, জামাল ভূঁইয়া ও শমিত সোম। আক্রমণভাগে শুকি ইতোফুসা, শেখ মোরসালিন ও রাকিব হোসেন। এই একাদশে অভিজ্ঞতা, তারুণ্য ও আক্রমণাত্মক পরিবর্তনের সমন্বয় দেখা যাচ্ছে।
মালয়েশিয়ার বিপক্ষে হার দিয়ে শুরু করা বাংলাদেশ এবার সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে নিজেদের নতুনভাবে প্রমাণ করতে চায়। একাদশে চার পরিবর্তন সেই পরিকল্পনারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। জামালের প্রত্যাবর্তন, নতুন খেলোয়াড়দের অন্তর্ভুক্তি এবং আক্রমণভাগে পরিবর্তনের মাধ্যমে দল কতটা কার্যকরভাবে নিজেদের পুনর্গঠন করতে পারে, তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করবে ম্যাচের চিত্র।
শেষ পর্যন্ত মাঠের লড়াইয়েই প্রমাণ হবে পরিবর্তনের এই পরিকল্পনা কতটা কাজে আসে। বাংলাদেশের সামনে এখন লক্ষ্য একটাই—মালয়েশিয়ার বিপক্ষে পাওয়া হতাশা ভুলে সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে আত্মবিশ্বাসী ফুটবল উপহার দেওয়া এবং টুর্নামেন্টে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট সংগ্রহ করা।