গরমের দাপটে সিলেটে বাড়ছে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১ বার
গরমের দাপটে সিলেটে বাড়ছে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

শরতের নীল আকাশ আর হালকা বাতাসে স্বস্তি ফেরার কথা ছিল সিলেটের মানুষের জীবনে। কিন্তু বাস্তবে তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। ঋতুর হিসাবে শরৎ এলেও আবহাওয়ার আচরণ যেন গ্রীষ্মের তীব্রতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। দিনের শুরু থেকেই প্রখর রোদ, সঙ্গে বাড়তি আর্দ্রতা ও ভ্যাপসা গরমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছেন নগরবাসী। এর মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। গরমের সঙ্গে লোডশেডিংয়ের এই দ্বিমুখী চাপ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষার্থী ও পরিবারের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।

সিলেটে সোমবার মৌসুমের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ৩৭ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগের দিন রোববার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৪ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ মাত্র এক দিনের ব্যবধানে তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় তিন ডিগ্রি। শরতের এই সময়ে যেখানে ধীরে ধীরে তাপমাত্রা কমে আবহাওয়ায় স্বস্তি ফেরার কথা, সেখানে উল্টো তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় মানুষের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।

সিলেট আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ সজীব হোসাইন জানিয়েছেন, এ সময়ে সাধারণত যে তাপমাত্রা থাকার কথা, সোমবার সিলেটে তার চেয়ে বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। ৩৭ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছিল এ মৌসুমে সিলেটের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। তীব্র রোদের পাশাপাশি বাতাসে আর্দ্রতা থাকায় অনুভূত গরম আরও বেশি হচ্ছে। ফলে বাইরে বের হওয়া থেকে শুরু করে ঘরের ভেতরে থাকা—দুই ক্ষেত্রেই স্বস্তি পাচ্ছেন না মানুষ।

তবে আবহাওয়ার অস্বস্তির সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকট যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। সিলেট নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে বলে অভিযোগ করেছেন বাসিন্দারা। একদিকে দিনের তীব্র গরম, অন্যদিকে বিদ্যুৎ না থাকায় ঘরবাড়িতে ফ্যান ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চালানো যাচ্ছে না। বিশেষ করে রাতে লোডশেডিং হলে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের দুর্ভোগ বেড়ে যাচ্ছে।

নগরীর বাইরে পরিস্থিতি আরও কঠিন বলে জানিয়েছেন পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহকরা। বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে দিনে পাঁচ থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শুধু স্বাভাবিক জীবনযাত্রাই ব্যাহত হচ্ছে না, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ছোট ব্যবসা, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা এবং পারিবারিক নানা প্রয়োজনীয় কাজও।

জিন্দাবাজার এলাকার টেইলার ব্যবসায়ী মকসুদ হোসেনের অভিজ্ঞতা এই সংকটের একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দিনের বড় একটি সময় বিদ্যুৎ না থাকায় গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী পোশাক তৈরি ও সময়মতো সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। দীর্ঘ সময় দোকানে বসে থেকেও একটি প্যান্ট সেলাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বর্তমান সময়ে নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের কারণে ব্যবসায় এমনিতেই চাপ রয়েছে। তার সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকট যুক্ত হওয়ায় আয় কমে গিয়ে সংসার চালানোও কঠিন হয়ে উঠছে বলে জানান তিনি।

বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব পড়ছে পরিবারগুলোর ওপরও। মিরের ময়দান এলাকার গৃহিণী সাজনা বেগম জানান, দিনের তুলনায় রাতে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেশি অনুভূত হচ্ছে। তীব্র গরমে তাঁর সন্তানরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে এবং ঠিকমতো ঘুমাতে পারছে না। বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনা ও স্কুলের হোমওয়ার্ক করতেও সমস্যা হচ্ছে। সামনে পরীক্ষা থাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার প্রভাব শিশুদের পড়াশোনায় পড়তে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি।

গ্রামাঞ্চলের চিত্রও খুব একটা ভিন্ন নয়। জকিগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা সেলিম তাপাদার জানিয়েছেন, তাঁদের এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। পরিস্থিতি এতটাই দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে যে তিনি স্ত্রী-সন্তানদের নগরীতে আত্মীয়ের বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু সেখানেও একই ধরনের বিদ্যুৎ সমস্যার কথা জানতে পারছেন। ফলে শহর কিংবা গ্রাম—কোথাও যেন বিদ্যুৎ সংকট থেকে স্বস্তি মিলছে না।

বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সিলেটের কুমারগাঁওয়ে থাকা ২২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। গত বুধবার থেকে কেন্দ্রটির উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ফলে সিলেট অঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের সিলেট অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী ইমাম হোসেন জানিয়েছেন, কুমারগাঁও বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশে সমস্যা দেখা দিয়েছে। ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রাংশ মেরামতের জন্য বিদেশ থেকে নতুন যন্ত্রাংশ আনার প্রক্রিয়া চলছে। কেন্দ্রটির উৎপাদন বন্ধ থাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ও ভোল্টেজের ভারসাম্য বজায় রাখতে লোডশেডিং বাড়াতে হচ্ছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

বিদ্যুৎ বিভাগের দেওয়া পরিসংখ্যান পরিস্থিতির তীব্রতা আরও স্পষ্ট করে। সোমবার দুপুরে সিলেট অঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ২৫২ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে ৪২ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছে। এর আগের দিন রোববার সন্ধ্যায় ২৫৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে লোডশেডিং ছিল ৬০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদা ও সরবরাহের ঘাটতি সামাল দিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

কুমারগাঁও বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল কাদেরও জানিয়েছেন, কারিগরি ত্রুটির কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। কেন্দ্রটি দ্রুত উৎপাদনে ফেরাতে সংশ্লিষ্টরা কাজ করছেন। তবে মেরামতের কাজ শেষ করে ঠিক কখন বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।

এই পরিস্থিতিতে সিলেটের মানুষের প্রধান প্রত্যাশা দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক হওয়া। কারণ তীব্র গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে জনজীবনে তার প্রভাব কেবল সাময়িক অস্বস্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ব্যবসায় উৎপাদন কমে, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হয়, পরিবারের স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয় এবং শিশু ও বয়স্কদের জন্য শারীরিক অস্বস্তিও বাড়তে পারে।

শরতের শেষভাগে এসে তাপমাত্রার এমন ঊর্ধ্বগতি এবং একই সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের সংকট সিলেটের নাগরিক জীবনে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে, আর কুমারগাঁও কেন্দ্রের উৎপাদন কবে পুরোপুরি চালু হবে—এখন সেই প্রশ্নই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে তীব্র গরম ও দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের এই ভোগান্তি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় আরও বড় চাপ তৈরি করতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত