দুই দশক পর ইরাক ছাড়ছে মার্কিন সেনারা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩ বার
দুই দশক পর ইরাক ছাড়ছে মার্কিন সেনারা

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দুই দশকেরও বেশি সময়ের সামরিক উপস্থিতির পর ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের শেষ ধাপ সম্পন্ন করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশটিতে থাকা মার্কিন ও আন্তর্জাতিক জোটের সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটানোর প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযান শুরুর পর যে দীর্ঘ সামরিক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, এই প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব শেষ হতে যাচ্ছে।

ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘটনাকে ঘিরে দেশটির রাজনীতি, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইরানঘনিষ্ঠ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী এই প্রত্যাহারকে নিজেদের দীর্ঘদিনের অবস্থানের সাফল্য হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে ইরাকের কিছু রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা মহলে মার্কিন সেনা চলে যাওয়ার পর দেশটির নিরাপত্তা কাঠামো, সন্ত্রাসবিরোধী সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক প্রভাবের ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে।

ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের বর্তমান পরিকল্পনার ভিত্তি তৈরি হয় ২০২৪ সালে। সে সময় ওয়াশিংটন ও বাগদাদ ইসলামিক স্টেট বা আইএসবিরোধী মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানের পরবর্তী ধাপ নির্ধারণে একটি সমঝোতায় পৌঁছায়। এর আওতায় ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে বেশির ভাগ মার্কিন সেনা বিভিন্ন ঘাঁটি থেকে সরে গেলেও ইরাকের উত্তরাঞ্চল, বিশেষ করে কুর্দি অঞ্চলে, সীমিত উপস্থিতি বজায় ছিল। এখন সেই অবশিষ্ট উপস্থিতিও শেষ করার প্রক্রিয়া চলছে।

২০০৩ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রশাসনের সময়ে ইরাকে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। ওই অভিযানের প্রধান লক্ষ্য ছিল তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের সরকারকে উৎখাত করা। পরবর্তী সময়ে ইরাকে ব্যাপক সংঘাত, বিদ্রোহ, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। কয়েক বছর পর মার্কিন বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করলেও ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেটের উত্থানের পর আবারও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক সামরিক জোট ইরাকে সক্রিয় হয়।

এই দীর্ঘ সময়ের যুদ্ধে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রেরও হাজার হাজার সামরিক সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। মার্কিন সামরিক উপস্থিতি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরাকের সাধারণ মানুষের জন্যও দুই দশকের যুদ্ধ ও বিদেশি সামরিক উপস্থিতির একটি দীর্ঘ অধ্যায় নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। তবে সেনা প্রত্যাহার মানেই ইরাকের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের সম্পর্ক শেষ হয়ে যাওয়া নয়। বরং সামরিক অভিযানের পরিবর্তে দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার নতুন কাঠামো গড়ে তোলার কথা বলা হচ্ছে।

মার্কিন প্রশাসনের দৃষ্টিতে ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীর সক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। ইরাকি সেনাবাহিনী ও কুর্দি পেশমার্গা বাহিনীকে দীর্ঘদিন ধরে প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা সহায়তা ও সামরিক সহযোগিতা দিয়ে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের অবস্থান হলো, এখন ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনীকে নিজেদের দেশের নিরাপত্তার দায়িত্ব আরও বড় পরিসরে গ্রহণ করতে হবে। মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সঙ্গে আইএসবিরোধী অভিযানের দায়িত্বও আরও বেশি ইরাকি বাহিনীর ওপর চলে যাচ্ছে।

তবে এই পরিবর্তনের মধ্যেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভবিষ্যৎ ভূমিকা। ইরাকের কিছু শক্তিশালী মিলিশিয়া গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে দেশটিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির বিরোধিতা করে আসছে। এসব গোষ্ঠীর কয়েকটি এখনো অস্ত্র সমর্পণে অনিচ্ছুক। ফলে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর দেশটির নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সরকারের নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সময়সীমাকে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অঙ্গীকার হিসেবে তুলে ধরেছেন। ইরাকি সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ৩০ সেপ্টেম্বরের পর দেশটির নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বিদেশি সামরিক উপস্থিতির পরিবর্তে ইরাকি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা আরও স্পষ্ট হবে। ইরাকি সামরিক কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের সামরিক মিশন শেষ করার প্রস্তুতি চলছে এবং পরবর্তী সময়ে সম্পর্কের ধরন আরও বেশি দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার দিকে যাবে।

ইরানঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কাছে অবশ্য এই প্রত্যাহারের রাজনৈতিক তাৎপর্য আরও বেশি। তাদের নেতারা দীর্ঘদিন ধরে ইরাকের মাটিতে বিদেশি সেনা উপস্থিতির বিরোধিতা করে আসছেন। ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাকের পক্ষ থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে ঐতিহাসিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরাকের সার্বভৌমত্ব বিদেশি সামরিক উপস্থিতির মাধ্যমে নয়, বরং দেশের জনগণ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া উচিত।

তবে প্রত্যাহারকে ঘিরে সব মহলের অবস্থান এক নয়। ইরাকের কুর্দি অঞ্চলসহ কিছু রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা মহল মনে করছে, মার্কিন সামরিক উপস্থিতি হঠাৎ কমে গেলে নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে আইএসের সক্রিয়তা পুরোপুরি শেষ হয়নি এবং দেশটির বিভিন্ন এলাকায় তাদের গোপন নেটওয়ার্ক বা স্লিপার সেল থাকার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে ইরানঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর শক্তি বৃদ্ধিও নিরাপত্তা ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে বলে উদ্বেগ রয়েছে।

মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সময়টি মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। ইরাক ভৌগোলিকভাবে ইরান, সিরিয়া, তুরস্ক ও উপসাগরীয় অঞ্চলের মাঝামাঝি একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। ফলে দেশটির নিরাপত্তা কাঠামোয় বড় পরিবর্তন হলে তার প্রভাব শুধু ইরাকের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। ইরানঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব, আইএসবিরোধী অভিযান এবং ইরাকের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা সম্পর্ক—সবকিছুই নতুন বাস্তবতার মধ্যে পড়বে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি শেষ হলেও ওয়াশিংটন ও বাগদাদের সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন হচ্ছে না। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সামরিক জোটের নির্দিষ্ট মিশন শেষ হওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা সম্পর্ক বজায় রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ ইরাক থেকে সেনা প্রত্যাহারকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরাকের সম্পর্কের সম্পূর্ণ সমাপ্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং সম্পর্কের ধরনে পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইরাকের জন্য এখন মূল চ্যালেঞ্জ হবে বিদেশি সামরিক সহায়তা কমে যাওয়ার পর নিজস্ব নিরাপত্তা কাঠামোকে আরও কার্যকর করা। একই সঙ্গে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, আইএসের অবশিষ্ট হুমকি মোকাবিলা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর এসব ক্ষেত্রে ইরাকি সরকারের সক্ষমতার ওপরই আন্তর্জাতিক মহলের নজর থাকবে।

দুই দশকেরও বেশি সময় পর ইরাক থেকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি শেষ হওয়ার ঘটনা তাই কেবল একটি সেনা প্রত্যাহারের ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে যুদ্ধের দীর্ঘ ইতিহাস, ইরাকের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তনশীল নিরাপত্তা বাস্তবতা। ৩০ সেপ্টেম্বরের নির্ধারিত সময়সীমা সামনে রেখে ইরাক এখন এমন এক পর্যায়ে প্রবেশ করছে, যেখানে দেশের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভারসাম্যের দায়িত্ব আরও সরাসরি দেশটির নিজস্ব প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বর্তাবে। এই পরিবর্তন কতটা স্থিতিশীলভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেটিই আগামী দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত