প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশের নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তা ও অসৌজন্যমূলক আচরণের শিকার করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবীর রিজভী।
বুধবার দেওয়া এক বিবৃতিতে রিজভী এ ঘটনাকে অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয় হিসেবে উল্লেখ করেন। বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক মুহম্মদ মুনির হোসেনের স্বাক্ষরিত ওই বিবৃতি গণমাধ্যমে পাঠানো হয়। বিবৃতিতে রিজভী অভিযোগ করেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের একটি অংশ নিউইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দরে ড. ইউনূসের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছে।
ঘটনাটি সামনে আসার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক বিভাজন, সাম্প্রতিক বছরগুলোর উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক নেতাদের বিদেশে অবস্থান—সব মিলিয়ে এ ধরনের অভিযোগ স্বাভাবিকভাবেই জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি করছে। তবে বিমানবন্দরে ঠিক কী ঘটেছিল, কারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং তাদের আচরণের প্রকৃতি কী ছিল—এসব বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে না আসায় অভিযোগ ও প্রত্যক্ষভাবে নিশ্চিত হওয়া তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
রিজভী তার বিবৃতিতে বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণের কারণেই ড. ইউনূসকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষের বিরাগভাজন হতে হয়েছে। তার দাবি, জেএফকে বিমানবন্দরের ঘটনাটি ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার কথিত প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ।
বিএনপির এই নেতা অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দেশে গুম, খুন ও গুপ্তহত্যাসহ নানা ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সেই সময়ের সহযোগী হিসেবে বিবেচিত কিছু ব্যক্তি বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন এবং তাদের একটি অংশ ড. ইউনূসের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণে জড়িত হয়েছে।
রিজভী আরও বলেন, বিদেশের মাটিতে ড. ইউনূসকে ঘিরে এমন একটি অপ্রীতিকর ঘটনার অভিযোগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও বিভাজনের গভীরতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ক্ষমতা হারানোর পরও আওয়ামী লীগের একটি অংশের মধ্যে প্রতিহিংসাপরায়ণ ও হিংসাত্মক রাজনৈতিক মনোভাব অব্যাহত রয়েছে।
বিবৃতিতে তিনি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার রাজনীতি অব্যাহত রাখার অভিযোগও তোলেন। তার দাবি, এর অংশ হিসেবে দলের কর্মী-সমর্থকদের দেশ ও বিদেশে বিভিন্নভাবে উসকানি দেওয়া হচ্ছে এবং বাংলাদেশে নানা ধরনের সহিংস কর্মকাণ্ডে মদদ দেওয়া হচ্ছে।
রিজভী বলেন, ড. ইউনূসের মতো আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একজন বাংলাদেশির সঙ্গে বিদেশের মাটিতে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ দেশের ভাবমূর্তির সঙ্গেও সম্পর্কিত। তিনি এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন এবং ঘটনাটির নিন্দা জানান।
তার বিবৃতির শেষাংশে রিজভী বলেন, জেএফকে বিমানবন্দরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি কথিত অসৌজন্যমূলক আচরণের ঘটনায় তিনি ধিক্কার ও তীব্র নিন্দা জানাচ্ছেন।
ড. ইউনূস বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সামাজিক উদ্যোগের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একটি নাম। গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমকে বিশ্বব্যাপী আলোচনায় নিয়ে আসার পাশাপাশি তিনি ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেই সময় থেকে দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন তিনি।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ ও তাদের নেতৃত্বকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তীব্র বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। শেখ হাসিনার সরকারের সময়কার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড, জুলাই-আগস্টের আন্দোলন, পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং ক্ষমতাচ্যুত দলের নেতাকর্মীদের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ব্যাপক মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে ড. ইউনূসকে ঘিরে বিদেশের মাটিতে কোনো বিতর্ক বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতির অভিযোগও দ্রুত রাজনৈতিক আলোচনার অংশ হয়ে উঠছে।
জেএফকে বিমানবন্দর বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। সেখানে বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক নেতা, কূটনীতিক, ব্যবসায়ী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। এমন স্থানে কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে রাজনৈতিক স্লোগান, প্রতিবাদ বা অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ উঠলে তা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বা শিষ্টাচারের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না; সংশ্লিষ্ট দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির বিষয়টিও সামনে আসে।
তবে এ ঘটনায় রিজভীর বিবৃতি মূলত বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থানকে তুলে ধরেছে। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অন্য পক্ষের বক্তব্য, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা কিংবা মার্কিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার বক্তব্য প্রকাশিত হলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হতে পারে। তাই রাজনৈতিক অভিযোগকে যাচাই করা তথ্য থেকে আলাদা করে দেখা জরুরি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পারস্পরিক সহনশীলতা ও শান্তিপূর্ণ মতপ্রকাশের বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকলেও ব্যক্তিগত আক্রমণ, হেনস্তা কিংবা অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য ইতিবাচক বার্তা দেয় না। দেশের বাইরে এমন কোনো ঘটনা ঘটলে সেটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পাশাপাশি বাংলাদেশের সামগ্রিক ভাবমূর্তিকেও প্রভাবিত করতে পারে।
জেএফকে বিমানবন্দরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রিজভীর নিন্দা তাই শুধু একটি নির্দিষ্ট ঘটনার প্রতিক্রিয়া নয়, বরং বর্তমান বাংলাদেশের তীব্র রাজনৈতিক বিভাজনেরও একটি প্রতিফলন। ড. ইউনূসকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক যেমন অব্যাহত রয়েছে, তেমনি ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়েও দেশে-বিদেশে নানা আলোচনা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ ও রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনার প্রকৃত চিত্র সামনে আসাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ঘটনাটি নিয়ে আরও তথ্য প্রকাশিত হলে জেএফকে বিমানবন্দরে আসলে কী ঘটেছিল এবং কারা এতে জড়িত ছিলেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে। আপাতত রিজভী তার বিবৃতির মাধ্যমে ঘটনাটির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে রাজনৈতিকভাবে এর দায় আওয়ামী লীগের একটি অংশের ওপর চাপিয়েছেন।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত